এরা কি পুঁজিবাদীও হতে পারবে না ?

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:৫৩ |

বাংলাদেশে গার্মেন্টস ‘শিল্পে’র গোড়াপত্তন প্রায় আটাশ বছর আগে। এই আটাশ বছরে গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। প্রায় কুড়ি লাখ শ্রমিক এই বিশাল সেক্টরে শ্রম দিচ্ছে। সব সরকারই বেশ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এই সেক্টরের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খতিয়ান দিয়ে কৃতিত্ব জাহির করেছে এবং করছে। পরিসংখ্যান দিয়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ চললেও বাংলাদেশ চলে না। পরিসংখ্যান ব্যাপারটা এখানে অচল। মিটার, সেন্টিমিটার, ন্যানো মিটারের যুগে এখনো এখানে হাত দিয়ে মাপামাপিতে কাজ চলে! যে দেশের জনসংখ্যার অথবা ভোটারের কোনো গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান নেই সেখানে এই পোশাক শিল্পের আয় দেশের জাতীয় বাজেটের ‘কত অংশ, দেশের কী কী উপকার করছে, দেশের অর্থনীতিতে কতো পার্সেন্ট অবদান রাখছে- ব্যাপারগুলো অর্থহীন। ওটা বানরের পিঠা ভাগ করার মতো চালাকি বিশেষ।

প্রসঙ্গ সেটা নয়, এখনকার প্রসঙ্গ হচ্ছে এই গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে দেশে যে সর্বশেষ পাতানো খেলাটা হয়ে গেলো সেটা। এতো বড়ো একটা সেক্টরে শ্রমিক অসন্তোষ থাকবে, মারামারি-কাটাকাটি থাকবে, চুরি-চামারি থাকবে, ধাপ্পাবাজি-ফেরেপবাজি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। এই গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কী হয়নি? শ্রমিকের রক্ত চুষে নেওয়া, নারী শ্রমিককে ভোগ করা, ধর্ষণ করা, খুন করা, পুড়িয়ে মারা, পায়ে দলে মারা, পিষে মারা, ছাঁটাই করে মারা, জেলে ভরা, হাত-পা গুঁড়ো করে দেওয়া, এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়া, ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলা- কী হয়নি? এবং এসবই হয়েছে ওই তথাকথিত বৈদেশিক মুদ্রা আর তথাকথিত অর্থনীতির চাকা চরার ধাপ্পা দিয়ে।

হয়তো অনেকেই জানেন যে বাংলাদেশে লগ্নি করার আগে বেনিয়ারা গার্মেন্টস সেক্টর দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে ছেয়ে ফেলেছিল। বাংলাদেশের দেড় গুণ কারখানা চলতো শ্রীলঙ্কায়। প্রায় দুযুগের গৃহযুদ্ধের কারণে বেনিয়া পুঁজি ট্রান্সফার হয়ে বঙ্গোপসাগরের এপারে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে এই তথাকথিত শিল্প যদি অভিমানী কবুতরের মতো একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায় তাহলে এই দেশের হাজার হাজার মানুষ যদি না খেয়ে মরতে — তাহলে নিশ্চয়ই শ্রীলঙ্কায় লাখ লাখ মানুষ গার্মেন্টস বিহনে প্রাণ ত্যাগ করেছে।! এ প্রসঙ্গও থাক।

কদিন আগে ‘হঠাৎ’ করে গার্মেন্টস সেক্টরে নাকি এক মহা অশান্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। হঠাৎ শব্দটাকে কোট-আনকোট করা হলো এজন্য যে, সরকার বা মিডিয়া যেটাকে হঠাৎ বলছে সেটাকে আদৌ হঠাৎ কোনো কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে শ্রমিকদের বুকের ভেতর জমতে থাকা ক্ষোভ অমন লাভাস্রোতের মতো বেরিয়ে এসেছে। আগামীতেও আসবে। শ্রমিকদের নায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য তারা রাজপথে নামলে, মিছিল করলে, ঘেরাও করলে পুলিশ তাদের গুলি করে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করবে আর শ্রমিকরা মুখে আঙ্গুল পুড়ে চুষবে এবং গলায় পৈতে দিয়ে নামাবলি গাইবে? মামাবাড়ির আবদার?

সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো একটি শাখাও তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে বলতে পারবে না ঠিক কতোগুলো বা কতো রকম মধ্যযুগীয় কায়দায় শ্রম শোষণ করা হয়? এদেশের কারখানা মালিকদের অধিকাংশই সামন্তবাদী জমিদার-জোতদার-তরফদার গোত্রের এবং এদের আচার-আচরণ সামন্ত্রবাদী তথা জমিদার-জোতদারদের মতো। এখানে সম্পর্কটা শ্রমিক-মালিকের উৎপাদনমুখী সহযোগিতার বা সহমর্মিতার নয়। এখানে সম্পর্কটা মনিব-চাকরের। পশু-মানুষের। মালিক-দাসের। দাস যুগের মতো এখনো এখানে শ্রমিক কেনা-বেচা হয়। কতো প্রকার কায়দায় এই সামন্ত প্রভু তথা ফড়িয়া ব্যাপারী মালিক এবং মালিক গোষ্ঠির চামচারা শ্রম শোষণ করে সে ফিরিস্তি এখানে দিচ্ছি না।

সেটা অন্যদিন। আজকের বিষয়টি হলো গার্মেন্টস মালিকদের মামাবাড়ির আবদার এবং তাদের ‘গডফাদার’ সরকারের শ্রমিক হত্যার নীতি নিয়ে। পুলিশ গুলি করে শ্রমিক হত্যা করলো। শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকটি কারখানা ভাঙচুর করলো। মার খেলো। জেলে গেলো। আহত হলো। আর ওমনি মালিকরা রাজপথে নেমে মহড়া দিয়ে সরকারের কাছে হুতো দিয়ে বললো প্রটেকশন দিন! নইলে কারখানা বন্ধ করে দেবো! বাহ! এটা দেখুন কী ভয়াবহ একটা হুমকি। কী মতলববাজি একটা দর কষাকষি! কী চমৎকার!
সরকার গত কুড়ি মাস ধরে একে তাকে হুমকি দিয়েছে, দিচ্ছে। আর এবার কতোগুলো কাঁচা টাকার মালিক জমিদার-জোতদার সরকারকে হুমকি দিচ্ছে! আর ওমনি সরকার সুড় সুড় করে বিডিআর, পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, আনসার দিয়ে শ্রমিক ঠেঙ্গিয়ে ঠাণ্ডা করে মারিকদের আশ্বস্ত করছে! কী অদ্ভুত রপ্তানিমুখী গণতন্ত্র! গার্মেন্টস মালিকদের পুঁজিটা কার? ব্যাংকের। ব্যাংকের ক্যাপিটাল কার? সাধারণ জনগণের। সাধারণ জনগণকে শোষণ করে ছিবড়ে বানাচ্ছে কে? মালিক। সেই মালিককে ছিবড়ে বানাতে মানাতে সাহায্য করছে কে? সরকার। সরকারের ট্যাক্স, শুল্ক, ভ্যাট, আবগারি, অগ্রিম বিক্রয় ভ্য্ট,ফাকি দিচ্ছে কে? মালিকরা। গার্মেন্টস নামক গরুটার গায়ে বসে রক্ত চুষে মোটাতাজা হয়েছে কে? ব্যাংকার, কাস্টমস, ইন্ডেন্টর, সিএন্ডএফ এজেন্ট, ট্রান্সপোর্ট মালিক, ট্যাক্সের কর্তা আর মধ্যস্বত্বভোগী এক বিশাল চামচা শ্রেণী।
অথচ গুলি খাচ্ছে কে? শ্রমিক। মরছে কে? ওই শ্রমিক, আবার ওদের আরো ভালো করে চোষার জন্য, মারার জন্য সেনা আর র‌্যাবের প্রটেকশন চাইছে কে? মালিকরা! কী অদ্ভুত তুঘলকি কাণ্ড! কী ভয়ানক আবদার! আমরা ওদের গুলি করে মারবো এবং ওরা আমাদের জানালার কাচ ভাঙতে পারবে না। ভাঙলে আবার গুলি, আবার হত্যা, আবার জেল! কী জন্য? না, ওনারা দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রেকেছে! এদের এই চরম মিথ্যে কথাটা চরম ধাপ্পাবাজিটা করতে এতোটুকু লাজ শরম হলো না! পুকুরের জল ঘটি ভরে তুলে আবার পুকুরে ঢালাটাকে এই বেআক্কেল ‘বেজন্মা’গুলো বলছে অর্থনীতি চাঙ্গা করণ?! বেশ বেশ। এবার আমরা সরকারের কাছে এই ফাঁকে ছোট্ট একটা প্রশ্নের উত্তর চাইছি। মোটর বাইকে চেপে গুলি করে আগুন দিয়ে দালান ভেঙে যারা ফিল্মি হিরোর মতো চলে গেলো ওরা কারা? শ্রমিক? সরকারের বোঝা উচিত এ ধরনের পাতানো খেলার মূল উদ্দেশ্য এখন বাচ্চা ছেলেও বোঝে। দৃষ্টি সরানো গেলা কী?আর এই রকম দমন-পীড়ন করে কয়টা বিদ্রোহ-বিস্ফোরণ ঠেকাবেন? ইন্ডষ্ট্রিয়াল পুলিশ বানিয়ে এবার তাহলে প্রতিটি ফ্যাক্টরীর সামনে বসিয়ে দিন,কারণ সামনে ঈদের আগে আরো একটা আগুনের আলামত দেখা যাচ্ছে।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): গার্মেন্ট শ্রমিককলামবিদ্রোহগার্মেন্ট শ্রমিককলামবিদ্রোহ ;
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১০ রাত ১২:৪৬ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর…

 

 

২৩৫ বার পঠিত

 

৬টি মন্তব্য

১. ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর ৪:০৩

কমেন্টবাজ বলেছেন: এগুলান সব সেটাপ কাজ।

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:০২

লেখক বলেছেন: ঠিক কথা।ক্যামনে বুঝলেন ভাই ?

২. ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:১৮

জুবেরী বলেছেন: আমি নিজেও এই সেক্টরের সুবিধাভূগী

সমস্যা আর দূ:খ একটাই ।

এরা পুঁজিবাদীও হতে পারলো না ।

৩. ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৫৯

বিবিধ বলেছেন: মনজুর ভাইয়ের জ্ঞতার্থে বলছি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ বানানো হয়ে গেছে।

৪. ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ২:০৪

শফিউল আলম ইমন বলেছেন: হুমম। কথা ঠিকাছে কিন্তু ভাই আমাদের মতো চুনোপুঁটিরা এসব ভেবে কবে লাভ হয়েছে কিংবা হবে?
শোষণ করেছে এবং আরো করবে। নতুন নতুন অভিনব কায়দা আসবে।

৫. ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ২:১১

আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন: অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশে এইরকমটাই কি হওয়ার কথা না!

যেটা হচ্ছে সেটা অমানবিক শোষণ কিন্তু অস্বাভাবিক নয়, ইতিহাসের পর্যবেক্ষন তাই বলে।

তৃতীয় বিশ্বের পুজিপতিরা “লু্ম্পেন বুর্জোয়া” পরিচয়ের উর্দ্ধ কি কখনো উঠতে পারে?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s