গার্মেন্টে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং বিজিএমইএ-র শিল্প ধ্বংসের জুজুর ভয়!

10577005_10204520128826970_3452775480467256004_n

গত কয়েক বছর ধরে দেশের গার্মেন্ট সেক্টরে এক ধরণের অশনি সংকেতের আশঙ্কা করছিলেন বোদ্ধামহল। এই মহলটির পক্ষে যেমন অনেকেই মতমত দিয়েছেন, তেমনি অনেকেই আশঙ্কাটিকে নেহায়েত অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছন। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দল এবং ক্ষমতাবর্হিভূত বিএনপি’র মধ্যে শুরু হয়েছিল চাপান-উতোর। ক্ষমতাসীন মহাজোট বলেছিল বাংলাদেশের কতিপয় ‘দেশদ্রোহী’ এবং বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নকারী বিএনপি জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য দূতিয়ালী করেছে। তারা চায় বাংলাদেশ আবার যেন সেই ‘তলাহীন ঝুড়ি’র দেশে পরিণত হয়। আবার যেন তাকে বিশ্বের দরবরে হাত পেতে সাহায্য নিয়ে বাঁচতে হয়। আবার বিএনপি বলে আসছিল তাদের আমলেই এই গার্মেন্ট শিল্প বিকোশিত হয়েছে। তারাই এই শিল্পকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসন পেতে সাহায্য করেছে। এ পর্যন্ত এসে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাবর্হিভূত উভয়পক্ষই গার্মেন্ট শিল্পকে দেশের অন্যতম বিদেশি মুদ্রা আয়ের উপায় মনে করেন এবং সেই শিল্পে নিজ নিজ দলের ‘এ্যাচিভমেন্ট’ উপভোগ করেন। এই একই ‘ইদুর-বেড়াল’ খেলা শুরু হয়েছিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে সাড়ে এগারশ মানুষের বিভৎস মৃত্যু ঘটার পর। সে সময় বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থা এতটাই সঙ্গিণ ছিল যে যে কোনো সময় দলে দলে সকল গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা জেগেছিল। যদিও রানা প্লাজা কেলেঙ্কারির পর বিদেশি ক্রেতা এবং তাদের দেশসমূহ থেকে এই শিল্পে আমূল সংস্কারের যে প্রসেক্রিপশন দেয়া হয়েছিল তার সিকিভাগও বাস্তবায়ন হয়নি। বলা ভালো সরকার করেনি। সে কারণে হোক বা গার্মেন্ট সেক্টরের সেই শুরু থেকে আজ অব্দি যে শত শত অনিয়ম, অবিচার, অন্যায়, শোষণ-নির্যাতন, ফাকিবাজী-ধান্ধাবাজী, পরিবেশ দুষণ, অমানবিক পরিবেশে কাজে বাধ্য করা, শ্রম চুরি, শ্রম শোষণ, বেতন-বোনাস মেরে দেয়া থেকে অনেক জঘণ্য জঘণ্য যে অপরাধসমূহ চলে আসছে বা প্রায় নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে সে কারণে হোক এদেশ থেকে ধীরে ধীরে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্তত এই খবরটি যেন তারই অশনি সংকেত।

 

‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি আর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক হানাহানির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পোশাকশিল্প খাতে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানিতে গার্মেন্টশিল্পে যে উল্কার গতি ছিল, তা থমকে গেছে অর্থবছরের শেষ ভাগে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর কমপ্লায়েন্সসহ নানা ইস্যুতে অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে অনেক নামি বায়ার। আবার জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক অনেক ব্র্যান্ড অন্য দেশে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।

 

বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত পোশাক খাতে গড় প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথমার্ধে এটা ছিল ২০ দশমিক ৪১ শতাংশ। কিন্তু জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৯ শতাংশে এসে ঠেকেছে। আগে থেকে অর্ডার থাকার পরও অর্থবছরের শেষদিকে প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। এর ওপর আন্তর্জাতিক কিছু ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে অন্যত্র ব্যবসা সরিয়ে নিতে শুরু করায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন গার্মেন্ট মালিকরা। নতুন মৌসুমের অর্ডার নিয়েও তাঁরা চিন্তিত।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পোলো রাল্ফ লরেন। বাংলাদেশের অনেক অর্ডার তারা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। পোলো-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক নিয়েছে। সেখানে চলতি বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র জানায়, পোলো ঢাকায় পাঁচটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করত। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে গত এপ্রিলে সর্বশেষ অর্ডারের শিপমেন্ট হয়ে গেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর নতুন করে কোনো অর্ডার দেওয়া হচ্ছে না। এর মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের একটি প্রতিষ্ঠানও আছে। অন্য তিনটি ফ্যাক্টরিতেও কাজ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করত ইয়াংওয়ান গ্রুপের সঙ্গে। গত বছরও শুধু ইয়াংওয়ানে ৪০ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার ছিল তাদের। কিন্তু এবার তা ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। সামনের বসন্তে অর্ডার আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কম্পানি-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পোলোর ভাইস প্রেসিডেন্টের গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে তিনবার বাংলাদেশে আসার তারিখ নির্ধারিত হলেও হরতাল-অবরোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে তিনি তা বাতিল করেন। এ সময় পোলোর একাধিক শিপমেন্ট যথাসময়ে না পৌঁছায় এবার তারা অন্য দেশে ব্যবসা সরিয়ে নিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্ডারের একটি বড় অংশই গেছে ভারতে। এ ছাড়া ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও জর্ডানেও কিছু অর্ডার দেওয়া হয়েছে।

 

অপর একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ার কসটকো বাংলাদেশে অর্ডার দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করত- এমন অনেক গার্মেন্ট কারখানায় এবার নতুন অর্ডার দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহৎ এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ চেইনশপটি। মাসিস, গ্যাপ, সিয়ারসের মতো ব্র্যান্ডগুলোও এবার অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়। অর্ডার কমানোর প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাভিত্তিক একর্ডভুক্ত বায়ারদের মধ্যেই বেশি।

অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেক বায়িং হাউসে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে কাজ করা অন্যতম বৃহৎ হংকংভিত্তিক বায়িং হাউস ‘লি অ্যান্ড ফাঙ’ এ বছর কমপক্ষে দেড় শ মার্চেন্ডাইজারকে ছাঁটাই করেছে।

 

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এবং ইস্টার্ন অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অর্ডার কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে দেশে প্রায় ৩০০ গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়েছে ৮০ হাজারের বেশি শ্রমিক। ডিসেম্বর নাগাদ বন্ধ গার্মেন্টের সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যাবে (কালের কণ্ঠ, ২১.০৬.২০১৪)

 

এই দুঃসংবাদটি মাথায় রেখেও সরকারেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশের ক্রমাগত দাবীর প্রতি নমনীয় হয়ে বা দায় ঠেকে হলেও গার্মেন্ট শিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন নিয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রি এবং এই শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বৈঠক করেছেন এবং নীতিগতভাবে সীমিত আকারে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর আগে এই বিষয়ে একেবারে ধর্নুভঙ্গ পণ করে বিরোধিতা করলেও এবার অনেকটা নিমরাজিঢঙে মেনে নিয়েছে। বলা যেতে পারে রানা প্লাজা কেলেঙ্কারির পর তাদের আর ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে তীব্র বিরোধীতা করার অবস্থান নেই, কারণ এমনিতেই তারা মালিকদের সংগঠন হিসেবে রানা প্লাজার সাড়ে এগারশ মানুষের মৃত্যুর পর তেমন কিছুই করেনি, যেটা অন্য কোনো দেশ হলে কোনোভাবেও সম্ভব ছিলনা। সে কারণেই হয়ত এরা ট্রেড ইউনিয়ন গড়তে দেয়ার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ জানায়নি। তবে কি তাকে স্বাগত জানিয়েছে? মোটেই নয়। বরং তারা বলেছেন-‘ট্রেড ইউনিয়ন পোশাক শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ফেলবে।‘

 

তাদের আশঙ্কাটি তারা এভাবে প্রকাশ করেছেন- ‘তৈরি পোশাক শিল্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে বিদেশে অভিযোগ করা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম। পোশাকশিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ এ শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘কারখানায় আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি রাজনীতি শিল্পের উৎপাদন এবং শৃঙ্খলা বিনষ্ট করবে।’ ট্রেড ইউনিয়নের অনুমতি দেওয়ার আগে শ্রমিকদের এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এ ছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকার দুই ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সের সমালোচনা করে আতিকুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি আদেশ প্রত্যাহার না করার প্রতিশ্রুতি তারা রক্ষা করছে না (কালের কণ্ঠ, ১০.০৭.২০১৪)

এই বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতির একটি লাইন স্মর্তব্য! তিনি বলেছেন-‘কারখানায় আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি রাজনীতি শিল্পের উৎপাদন এবং শৃঙ্খলা বিনষ্ট করবে।’ এই যদি ২০ থেকে ৩০ হাজার মালিক আর প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিকের ‘ভাগ্যবিধাতা’ প্রতিষ্ঠানের উক্তি হয় তাহলে বুঝে নিতে কষ্ট হয়না তিনি শ্রমিকদের কী চোখে দেখেন এবং ট্রেড ইউনিয়ন বলতে কী বোঝেন! ট্রেড ইউনিয়ন যে শ্রমিকদের নায্য দাবী-দাওয়া আদায়ের বার্গেনিং এজেন্ট গোছের সংগঠন এবং সেই সংগঠনটি সরকারী খাতায় রেজিস্ট্রিভুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ আইন-কানুন মেনেই দাবী-দাওয়া নিয়ে বার্গেনিং করতে দায়বদ্ধ সেটি এই বিজ্ঞজনের মগজে আসেনি! তিনি একে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র রাজনৈতিক কোন্দল হিসেবে চিহ্নিত করলেন। হতে পারে তার জানা-বোঝার দৌড় এ পর্যন্তই। হতেই পারে তিনি এদেশের আর সকল প্রতিষ্ঠানের ট্রেড ইউনিয়নের যে দলাদলির ঘৃণ্য চিত্র সেটিতে অভ্যস্ত হয়ে আছেন। আর এটাও হতে পারে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দুটি দলের দলাদলি বলে ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়টিকে প্রথমেই এই শিল্পের ধ্বংসের কারণ বলে প্রতিভাত করতে চান এবং তাদের অযোগ্যতা, বেশুমার মুনাফার চাবুক, অমানবিক অত্যাচার-নিপীড়নের কারণে এই শিল্প ধ্বংস হলে তার দায় যেন ওই আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র উপর গিয়ে পড়ে। উপরেই যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেই শ্রম শোষণ, অমানবিক পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা, তাজরীনের আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া, রানা প্লাজার ভবনধ্বসে সাড়ে এগারশ শ্রমিকের করুণ মৃত্যু, লাগাতার হরতাল-অবরোধের কারণে উৎপাদন ব্যহত হওয়ার মত ঘটনার জন্য যে গার্মেন্ট শিল্প ধ্বংস হতে পারে, এবং হচ্ছেও সেটিকে আড়াল করতেই যে এই মহাপণ্ডিত সভাপতি ট্রেড ইউনিয়নের জুজু আবিষ্কার করেছেন সেটা বুঝতে রকেট সায়েন্স পড়া লাগেনা।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কি এদের ভাষ্যমতে দলাদলির আশঙ্কায় অঙ্কুরেই ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার অধিকার বাতিল করবে, নাকি ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আরো মজবুত করে শ্রমিকদের শোষিত হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তির জন্য শ্রমিকদের একটুখানি ব্রিদিং স্পেস দেবে? কিন্তু সরকারের দায়বদ্ধতা বা বিজিএমইএ-র সদিচ্ছার প্যারামিটার কি সেটা বোধ করি হালে ঘটে চলা তাজরীন গার্মেন্ট এর মালিক দেলোয়ার হোসেনের তোবা গ্রুপে তেন মাসের বেতন না পাওয়া শ্রমিকদের আমরণ অনশন থেকেই বোঝা যাবে।

ঈদের আরো আগে থেকে তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের বেতন দেয়া হচ্ছেনা। দেলোয়ার হোসেনের ফ্যাক্টরি দেখাশোনা করেন তার শাশুড়ি। তিনি এবং অন্যান্য পরিচালকরা গার্মেন্টে প্রডাকশন চালু রাখার জন্য শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়েছে একথা বলে যে শিপমেন্ট ঠিকঠাক হলে তারা বেতন পাবে। সব হয়েছে। শিপমেন্ট হয়েছে, ডকুমেন্টস সাবমিট হয়েছে, সিএম এসেছে। এবং ব্যাংক থেকে সেই সিএম বা প্রডাকশন মজুরির ডলার তুলেও নেয়া হয়েছে। সাব কন্ট্রাক্ট করত যারা তাদের পাওনা দেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে ইলেকট্রিক বিল, ওয়াসা বিল, টিলিফোন বিল, ব্যাংকের কমিশন, এজেন্সিগুলোর কমিশনসহ সরকার বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সকলের পাওনা শোধ করা হয়েছে, বাকি রয়েছে কেবল শ্রমিকের বেতন! বলা হয়েছিল ঈদের আগে তিন মাসের বেতন একসঙ্গে দেয়া হবে। না, শেষ পর্যন্ত সেই বেতন দেয়া হয়নি। আর দেয়া হয়নি বলে তাজরীন গার্মেন্টসে শতাধিক শ্রমিককে পুড়িয়ে মারার অভিযোগে মালিক দেলোয়ার হোসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্য তোবা গার্মেন্টসের ১ হাজার ৫শর উপর শ্রমিককে জিম্মি করে রাখা হয়েছে ৩ মাস যাবত। ৩ মাস যাবত বেতন পান না তারা, এ নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেও কোন লাভ হয়নি, বেতনের প্রতিশ্রুতি এসেছিলো কিন্তু বেতন আসেনি। মালিকপক্ষ সরকারের মধ্যস্থতায় চুক্তিও সই করেছিল, তার পরও বেতন হয়নি। তারা চুক্তির বরখেলাপ করেছে। এ কারণে শ্রমিকরা অনশন কর্মসূচী দিতে বাধ্য হয়নি বরং তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে দেলোয়ার হোসেনের মুক্তির জন্য এই ‘লেভারেজ’ সৃষ্টি করতে। এতোকিছুর পরেও যথারীতি আমাদের সরকার বাহাদুর নিশ্চুপ, বলছেন-খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে! আর বিজিএমইএ শুধুমাত্র ‘দূঃখিত’!

মালিক আটক থাকলে ফ্যাক্টরি চলে, শিপমেন্ট হয়, লিখিত অঙ্গীকার করতে পারে, ভাঙ্গতেও পারে , একই গ্রুপের অন্য ফ্যাক্টরি ব্যাংক থেকে টাকা ট্রান্সফার করতে পারে। শুধু বেতন দিতে গেলেই মালিকের মুক্তি লাগবে! এবং শেষ পর্যন্ত ‘বেতন দেয়ার পরিস্থিতি’ সৃষ্টির জন্য দেলোয়ার হোসনেকে জামিনে মুক্তিও দিতে হয়েছে। এটা এদেশে এক নতুন জিম্মিদশার জন্ম দিল। এখন থেকে কোনো গার্মেন্ট মালিক কোনো অপরাধে গ্রেপ্তার হলেও এই ‘পদ্ধতি’ এ্যাপ্লাই হতে পারে। বেশ তো!


মনজুরুল হক

০৩.০৮.২০১৪

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s