সিরিয়ায় রাশিয়ান হামলায় বিশ্ব পরিসরে তোড়পাড় এবং পক্ষ-বিপক্ষ আর লাভ-ক্ষতি নিয়ে একটি সরল বিশ্লেষণ

Sukhoi Su-34 (Russian Сухой Су-34) (export Su-32, NATO Fullback) Russian twin-seat fighter-bomber India China Iran Syria

বিশ্বের এযাবতকালের ভয়ঙ্করতম সশস্ত্র সংগঠন আইএস সম্পর্কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার আবশ্যকতা নেই। তথাকথিত রাসায়নিক অস্ত্র মজুদের অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামের ক্ষমতাসীন বাথ পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাক দখল করে নেয়ার পর একে একে লিবিয়া, মিশর, তিউনিসিয়ায় ক্ষমতার পট বদল ঘটানো শেষে আমেরিকান ওয়ার পলিসি মোটামুটি একটা ‘শেপ’ এ এসেছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। আমেরিকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে নতুন একটা ‘আমেরিকাঅকুপাইড মিডলইস্ট’ তৈরির নীলনক্সা সার-জল পেয়ে বেড়ে উঠেছিল। তারা পরিকল্পনা মতই তারা এগুচ্ছিল। কোনো দেশ দখল করার অন্যতম হাতিয়ার উগ্র জতীয়তাবাদকে উষ্কে দেয়া।ধর্মীয় মজহাবকেন্দ্রীক ভেদাভেদ আর উগ্র জাতীয়তাবাদ একে অপরের হাত ধরেই চলে। সুতরাং আমেরিকা কেবলমাত্র ওই দুটি স্ফূলিঙ্গ উষ্কে দিতেই বাকি ঘটনাপ্রবাহ তার অনুকুলে আসতে শুরু করে। এইসব দেশগুলোতে সরকার পতন হয়ে পুডল সরকার গঠিত হলে এবার আমেরিকা ওই অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ আর হানাহানী করার জন্য সরকার বদলের সময় ‘বঞ্চিত’ এবং ‘অবহেলিত’ শক্তিগুলোকে বেশুমার মারনাস্ত্র আর সামরিক সহায়তা দিয়ে মাঠে নামিয়ে দেয়। এবার এই সব সন্ত্রাসী শক্তিগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সরকারগুলোর গণবিচ্ছিন্নতাকে পুঁজি করে টর্নেডো গতিতে সংগঠন বৃদ্ধি করতে পারে। এবং সেই ফর্মূলা মতেই চাবী দেয়া পুতুলের মত সিরিয়ার ‘স্বৈরাচারী’ আসাদ সরকারকে হঠাতে আক্রমণ শুরু করে। এই হামলাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় রাজা-বাদশাহ শাসিত মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবের সসৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন। সেই সাথে কাছাখোলা সমর্থন দেয় এশিয়ার একমাত্র ন্যাটো সদস্য তুরস্ক আর মধ্যপ্রাচ্যের ডার্কহর্স ইসরায়েল।

এদেরই অন্যতম শক্তি ‘আল নুসরা ফ্রন্ট’ নামে শুরু করে অল্প দিনেই বিরাট সাফল্য নিয়ে (মূলতঃ সিরিয়ায় আসাদবিরোধী যুদ্ধে কোটি কোটি আমেরিকান ডলার আর সিরিয়া-ইরাকের তেলক্ষেত্রের দখল নিয়ে কালোবাজারে তেল বিক্রির টাকায় শক্তিশালী হয়ে) তারা একের পর এক সিরিয়া-ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করতে থাকে। তাদের দখলিস্বত্ত এতটাই দ্রুত গতিতে হতে থাকে যে ইরাক বা সিরিয়ার পুরোপুরি পতন যেন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরাকের সংযোগস্থলকে মনে হয় যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাইখস্ট্যাগ! এবার তারা আল নুসরা ফ্রন্ট নাম বদলে নাম নেয় ‘আইএসআইএস’ অর্থাৎ ইসলামী স্টেট, সংক্ষেপে আইএস। ঠিক এভাবেই মাত্রারিক্তি দ্রুততায় তালেবানরা কাবুল দখল করে নিয়েছিল। তখনও বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে ভাবত- কিভাবে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ একটি সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারে? সেই আফগানিস্তানের মতই সিরিয়া-ইরাকেও আইএস রকেটের গতিতে একর পর এক অঞ্চল দখল করেছে। আর সেটা যে আমেরিকার ‘অবাধ্য ছেলে’ সিআইএ কর্তৃক নির্ধারিত, পরিকল্পিত, বাস্তবায়ীত সেটা এখন আর হিডেন রাখা যাচ্ছেনা, বিশেষ করে রাশিয়ান হামলায় আইএস পর্যুদস্তু হবার পর।

গত বছর আইএস এর অগ্রযাত্রায় ইরাক সিরিয়ার একের পর এক অঞ্চল হাতছাড়া হলে ইরাকের পুতুল সরকার সরাসরি আমেরিকার সাহায্য চেয়ে বসে। আমেরিকাও ‘বন্ধুত্বপূর্ণ উদার মানসিকতার’ পরিচয় দিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠায়। তার পরও মালিকী সরকারের পায়ের তলাকার মাটি শক্ত হয় না।তাতেও আমেরিকার কোনো সমস্যা ছিলনা, কিন্তু আইএস এর নৃশংসতা এবং মানুষ হত্যা করার ভয়াবহতায় পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হলে দেশের মানুষের চাপে এবং বিশ্বচাপে আমেরিকা আর তার ইউরোপীয় মিত্ররা বাধ্য হয় আইএস থামানোর নাটক দেখাতে, (যদিও এই পুরো ঘটনাতে ট্রান্স ইউরোপীয় পাইপলাইন অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এখনো করছে।) গত বছর তারা ঘোষণা দিয়ে আমেরিকা, ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যের মোট ১২টি দেশের কোয়ালিশন আইএস দমনের ‘বিশ্বনাটক’ এর মহড়া শুরু করে। মজার ব্যাপার হল যে সৌদি আরব, কাতার আর তুরস্ক আসাদ সরকারকে হঠানোর জন্য অফুরন্ত অস্ত্র,গোলাবারুদ আর অর্থ সহায়তা দিয়েছে তারাই আমেরিকার গড়া কোয়ালিশনে যোগ দিয়ে নাটকের প্রাত্র হয়ে ওঠে! ওদিকে আইএস মুচকি হাসে। কারণ তারা জানে এই আমেরিকান বিমান হামলা আসলে তাদের উপর নয়, করা হচ্ছে, হবে তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়্যেব এরদোগান বিরোধী পিপিপি. পেশমার্গ এবং আসাদপন্থী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। কার্যত আমেরিকা তথা যৌথবাহিনীর এক বছরের আক্রমণে লোক দেখানো কিছু আইএস যোদ্ধার মৃত্যু ছাড়া আর কোনো কাজ হয়নি। ইরাক-সিরিয়ার এক ইঞ্চি জমিও পুনর্দখল হয়নি।এরই মধ্যে আইএস তার অভীষ্ট লক্ষে দ্রুত গতিতেই এগোতে থাকে। একের পর এক বিদেশি সাংবাদিক, এনজিও কর্মীসহ নির্বিচারে ধরে ধরে বিভৎস কায়দায় হত্যা করতে থাকে এবং সেই সব হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ছেড়ে দেয় উন্মুক্ত ইন্টারনেটে। ক্রমান্বয়ে শক্তি বাড়াতে বাড়াতে এক সময় তারা ইসলামী খেলাফতের বাইরেও শক্তিমত্তার প্রদর্শন করে। একের পর এক বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মারাত্মক সব হামলা হতে থাকে। মারা যায় অজস্র মানুষ। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে ইউরোপ-এশিয়া এমনকি পুরো ভারতবর্ষ দখল করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসলে নড়ে-চড়ে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো। রাশিয়ার চেচনিয়াতে হামলা হবে হুমকি আসতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে রাশিয়া (যদিও এ অঞ্চলে রাশিয়ার স্বার্থ আরও অনেক ঘটনার উপর নির্ভশীল এবং ক্রিয়াশীল)।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ বিষয়ে টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে বলেছেন, তাঁর দেশের এ প্রতিরোধমূলক হামলার লক্ষ্য আইএসের আক্রমণ ঠেকানো। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জঙ্গিরা রাশিয়ায় আঘাত হানার আগেই মস্কো তাদের ওপর হামলা করবে।

পুতিন বলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর একমাত্র যথার্থ উপায় হচ্ছে আগে থেকে সক্রিয় হওয়া, কাছে আসার জন্য অপেক্ষা না করে সন্ত্রাসীদের ইতিমধ্যে দখল করা ভূখণ্ডেই লড়াই করে তাদের ধ্বংস করা।

পুতিনের এ ঘোষণার কিছুক্ষণ আগে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, রাশিয়া সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে বলে তাঁরা ইঙ্গিত পেয়েছেন। রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁদের বলেছিল, তারা সেখানে হামলা চালাতে যাচ্ছে।

রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চ পরিষদ ফেডারেশন কাউন্সিল গতকালই সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টি অনুমোদন করে। আর তার পর পরই রাশিয়া পূর্ণ উদ্যোমে বিমান আক্রমণ শুরু করে।

এই অবস্থায় ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। আর সেটা এতটাই দ্রুত যে কেউ আর কোনো ভাবেও সত্য গোপন করতে পারেনা। যার যার থলের বেড়াল বেমক্কা বেরিয়ে আসতে থাকে। রাশিয়া বিমান হামলা শুরু করার সাথে সাথে ভোজবাজীর মত ভোল পাল্টাতে থাকে আমেরিকা আর তার ইউরোপ-এশিয়ার স্যাঙ্গাতরা।

[১] সিরিয়া নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একেবারে বিপরীতমুখী। সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশারের বড় সমর্থক রাশিয়া। উল্টো দিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো ঘোর বাশারবিরোধী। এক  সম্মেলনে বাশারবিরোধী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বারাক ওবামা বলেন, ‘আইএসকে হারাতে গেলে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। আইএসকে হারাতে সিরিয়ার দরকার নতুন নেতা।’

[২] সৌদি আরব বলেছে বাশার আল-আসাদকে নিজে ক্ষমতা ছাড়তে হবে অথবা তাঁকে ক্ষমতা থেকে হটাতে হবে। গত মঙ্গলবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-জুবায়ের এ কথা বলেন। এই একই অভিলাস সৌদি মিত্র কাতার এবং আমিরাতের।

[৩] নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সঙ্গে গত ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সিরিয়া সংকট রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে।

[৪] ইরান বরাবরই সিরিয়ার বন্ধুদেশ। বাশারকে রক্ষা করাকে ইরান নৈতিক দায়িত্ব মনে করে। তেমনই মনোভাব ইরাকেরও।

এর সাথে বিশ্বের আরও ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি, ঘটনাপ্রবাহ আর অনুসঙ্গ যোগ হয়ে পুরো অবস্থাটা নিশ্চিতভাবেই মহাযুদ্ধের রূপ পাচ্ছে।

রাশিয়া বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে সেখানে কী কী ঘটছে বা ঘটেছে তার বিশদে না গিয়ে সারাংশ দেখে নেয়া যাকঃ

{১} সিরিয়ায় ১৫০০ রাশিয়ান মেরিন, ৫০০০ সাধারণ সৈন্য অগুনতি স্পেশাল স্পেটজ্নাজ কমান্ডো বাহিনী (চেচেন স্পেশাল ফোর্স, যাদেরকে বলা হয় পাথরের স্নায়ু দিয়ে তৈরি) পৌছেছে লাটাকিয়াতে। এখন পর্যন্ত ৭ দিনের হামলায় আইএস শক্তির অনেকটাই ণিঃশেষ হয়েছে বলে মতামত দিয়েছে ব্রিটেনের ডেইলি এক্সপ্রেস।

{২} মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার শক্তিশালি মিলিটারি নেভাল বেইজ ভূমধ্যসাগরীয় পোর্ট টারটাস-এ । এই রুশ নৌঘাটিতে রাশিয়া বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন ছিল। এর সাথে যোগ হয়েছে আরও নতুন নতুন যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ ।এখান থেকে লাটাকিয়া সহ সমগ্র সিরিয়া এমনকি ইরাকেও এয়ার কভার দিতে পারবে রাশিয়া।

{৩} চীন তার যুদ্ধজাহাকে সিরিয়া অুভমুখে রওনা করে দিয়েছে। সেই সব যুদ্ধজাহাজ যোগ দেবে পোর্ট টারটাসে রাশিয়ার নৌ ঘাটিতে।

{৪} ইরান আগেই সিরিয়ায় ৫ হাজারের মত সৈন্য পাঠিয়ে রেখেছে। ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহও তাদের সমর শক্তি নিয়ে সিরিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও ইরানের সামরিক বিশেষজ্ঞগ্রুপ সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে।

{৫} ইরাক এবং জর্ডান তাদের ‘কৌশলগত মিত্র’ আমেরিকার সঙ্গ ছেড়ে আইএসবিরোধী রাশিয়ান কোয়ালিশনে যোগ দিতে চেয়েছে, এবং ইতিমধ্যে ইরাক তার দেশে রাশিয়ান সামরিক ঘাটি করার অনুমতিও দিয়ে রেখেছে। তবে তাদের শর্ত ইরাকের আইসকেও নিশ্চিহ্ন করতে হবে।

{৬} আইএস দখলকৃত রাক্কাতে আক্রমণ করে ১৬০ জন আইসিস জঙ্গি মেরেছে রুশ এয়ার ফোর্স সেই প্রথম দিনেই। এর পর রপরই সিরিয়া তুরস্ক বর্ডারে আল কায়েদার শাখা, আল নুসরা ফ্রন্ট, আহরার আল শামস ও সিআইএ আততায়ীদের নিয়ন্ত্রিত (সিরিয়ার আসাদবিরোধী গ্রুপ) এলাকা আইএসমুক্ত করেছে তারা ।

{৭} ব্রিটেনের ডেইলি এক্সপ্রেস খবর দিচ্ছে- স্থল অভিযান চালানোর জন্য রাশিয়া ১৫,০০০ সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আশা করা যায়-সে অভিযানে সব সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হবে আর সিরিয়ায় আগের শান্তি ফিরে আসবে। কাউকে শরণার্থী হয়ে ইউরোপে আশ্রয় নিতে গিয়ে লাশ হতে হবে না সাগরে ডুবে।

{৮} রাশিয়ান বিমান হামলার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।তারা বলেছেন, রুশ হামলার কারণে আইএস শক্তিশালী হবে। এ দুই প্রেসিডেন্ট এখনো বলে চলেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে।

এদিকে ওবামা এবং ওলাঁদের বক্তব্যের জবাব রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ওবামা এবং ওলাঁদ সিরিয়ার নাগরিক নন। তাদের চাওয়ায় কিছু যায় আসে না। ওবামা এবং ওলাঁদ সিরিয়া কিংবা আসাদের ভাগ্য নির্ধারণের কেউ নন। সিরিয়ার জনগণই দেশটির ভবিষ্যত ও প্রেসিডেন্ট আসাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

{৯} আমেরিকা নিজেদের তৈরি করা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কথিত ‘ভালো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ বেছে নিয়েছে আর আরব রাজা-বাদশাহরা সে পথ মাড়াননি। তারা চোখ বন্ধ করে সবাইকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন প্রশিক্ষণ নেয়া ‘ভালো সন্ত্রাসীদেরকেও’ সমর্থন দিচ্ছেন আবার কথিত খেলাফত কায়েম করেছে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস তাদেরকেও সমর্থন দিচ্ছেন। এই গোষ্ঠী হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, পুড়িয়ে মারা, ডুবিয়ে মারা, গলা কেটে হত্যা -হেন কোনো অপরাধ নেই যা করে নি। তবুও তাদেরকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন আরাব রাজা-বাদশাহরা। এখন পর্যন্ত আইএস এর হাতে সব চেয়ে বেশি অস্ত্র আর টাকা-পয়সা তুলে দিয়েছে কাতার। আর সে কারণে তার দেশের একটি টিভি চ্যানেলও লাগাতার মিথ্যাচার করে চলেছে।

একই দশা ইসরাইলেরও। তা হলো বাশার আসাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হবে। এখানে মোটা দাগে আমেরিকা তথা পশ্চিমাদের স্বার্থ হচ্ছে তাদের পরিকল্পনা মতো ‘নিউ মিডিলইস্ট’ বা ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা হচ্ছে ইরান ও সিরিয়া। আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত না করতে পারলে সেটা সম্ভব হবে কি করে?

{১০} এই প্রেক্ষাপটে গ্যাঁড়াকলে পড়েছে আমেরিকা। সিরিয়ায় রুশ বিমান হামলা শুরুর পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একরকম গ্যাঁড়াকলে আটকে গেছেন। এক বছরের বেশি সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশ দাবি করে আসছিল তারা আন্তর্জাতিক জোট করে আইএস’র বিরুদ্ধে বিমান হামলা চলাচ্ছে।

আমেরিকা বহুবার বলেছে, আইএস-কে পরাজিত করতে অনেক সময় লাগবে। এ জোটে ছিল আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান ও মরক্কো। সিরিয়া সরকার কিংবা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই কথিত এ হামলা হচ্ছে।

ইরান, সিরিয়া ও রাশিয়া প্রকাশ্যে বলেছে- আইএস’র বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের হামলা শুধুমাত্র লোক দেখানো। অনেকে এ কথাও বলেছেন, আইএস-বিরোধী অভিযানের নামে মার্কিন সেনারা প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে হত্যার সুযোগ খুঁজছে।

আমেরিকার নেতৃত্বে এতবড় বাহিনীর বিমান হামলা সত্ত্বেও এক বছরের বেশি সময়ে যখন আইএস-কে পরাজিত করা যায় নি তখন যৌক্তিকভাবে রাশিয়ার সামনে পথ সহজ হয়ে গেছে।

এরই মধ্যে  প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ রাশিয়ার কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন। রুশ সরকার এগিয়ে আসে বন্ধু সিরিয়ার সাহায্যে। বৈধ প্রেসিডেন্ট আসাদের আহ্বানে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর সব বৈধতা পান রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন।তিনি এ সময় বলেছেন, মস্কো সিরিয়ায় লড়াই করবে বৈধভাবে এবং দেশটির সরকারের অনুমোদন নিয়ে। আর অন্যরা হামলা চালাচ্ছে অবৈধ ও বেআইনিভাবে। রুশ সংসদের অনুমোদন নিয়েই মস্কো শুরু করেছে তুমুল বিমান হামলা। আমেরিকা ও আরব-পশ্চিমা জোটের এখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু নেই।

{১১} রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়ায় সামরিক অভিযানে প্রাথমিক সাফল্য পাওয়ার পরই প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিন কেন আইএস-কে নির্মূল করা গেল না? কেন আইএস’র ওপর হামলার বিষয়ে ওবামা-ওলাঁদের আপত্তি? কারা সৃষ্টি করেছে আইএস? এসব প্রশ্নের জবাব সবাই জানেন; আমেরিকা জানে, ওবামা জানেন, ওলাঁদও জানেন। এবং এটা এখন প্রমাণিত যে কারা কি কি স্বার্থে আইএসকে সৃষ্টি করেছিল।

এটা এখন পরিষ্কার যে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশ ২০১৪ সালে থেখে আইএস’র ওপর বিমান হামলা চালাল আর সামান্য একটা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পতন হল না।

নেপথ্য কারণ আইএস’র ওপর হামলার নাম করে আমেরিকা ও তার মিত্ররা সিরিয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর, সরকারি স্থপানার ওপর এবং অনেক তেলক্ষেত্র, গ্যাসক্ষেত্র এবং গ্যাস স্টেশনের ওপর বোমা হামলা চালিয়ে দোষ দিয়েছে আসাদ সরকারের অথবা   নাম না জানা সন্ত্রাসীদের।

[১২] বিমান আক্রমণ শুরুর পর থেকে মাত্র ৭ দিনে ১১২টি টার্গেটে আক্রমণ করে রাশিয়ান বিমান ধ্বংস করেছে

৭১টি সাজোয়া যান, ৩০টি অন্যান্য যান, ১৯টি কমাণ্ড ফ্যাসিলিটিজ, ২টি কমিউনিকেশন সেন্টার, ফুয়েল এবং এ্যামুনিশনসহ ২৩টি ডিপো, এলইডি তৈরির ৬টি প্ল্যান্ট, গাড়িবোমা, বিভিন্ন আর্টিলারী, বিভিন্ন একাধিক ট্রেনিং ক্যাম্প। ইতিমধ্যে প্রায় ৩ হাজার জিহাদী সিরিয়া থেকে পালিয়েছে। এই পুরো আক্রমণটাকে রাশিয়া নাম দিয়েছে ‘মিশন কন্ট্রোল।‘ এরই মধ্যে ৭ তারিখ রাতে ১৫০০ মাইল দূরে কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থানরত রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজ থেকে আইএস লক্ষবস্তুতে ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ক্ষেপনাস্ত্রগুলো নিখুঁতভাবে টার্গেট বিদ্ধ করলেও ন্যাটো এবং আমেরিকা তৎক্ষনাত ক্ষেপনাস্ত্র হামলার প্রতিবাদ করেছে। আমেরিকার মুখপাত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেঃ ‘এটা কোনো ভাবেও মেনে নেয়া হবে না।‘

পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

[১] রাশিয়া তাদের আক্রমণকে ‘প্রথাসিদ্ধ’ করতে সে দেশের পার্লামেন্টর উচ্চকক্ষের অনুমতির পাশাপাশি ন্যাটো জোট, আমেরিকা, ওআইসি, জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের অবগত করিয়েছে। সেই সাথে সিরিয়ার সরাসরি আমন্ত্রণও রয়েছে। সুতরাং ‘কেন তারা সিরিয়ায় বিমান হামলা করছে’ এই জতীয় পশ্চিমা/ ন্যাটো/ মধ্যপ্রাচ্যর অভিযোগ ধোপে টেকে না। তাই রাশিয়া আগামী দিলগুলোতে আক্রমণ আরও জোরদার করবে।

[২] বিমান হামলার পাশাপাশি স্পেশাল কমান্ডো বাহিনী মার্চ করিয়ে রাশিয়া চাইবে স্বল্প সময়ে সিরিয়াকে আইএস মুক্ত করতে। পাশাপাশি আসাদবিরোধী বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে, যাতে করে ভবিষ্যতে যেন আসাদের শাসনক্ষমতা নির্বিঘ্ন হতে পারে।

[৩] রাশিয়ার পাশাপাশি চীন, ইরান, ইরাক এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ সিরিয়ায় স্থলেও আক্রমণ পরিচালনা করবে। ইতিমধ্যে আইএস সীমান্ত অতিক্রম করে জর্ডানে পালাচ্ছে। তাই স্থলভাগে আক্রমণ করে সর্ব শেষ আইএস সদস্যকে নির্মূল করতে সচেষ্ট হবে তারা।

[৪] তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান তীব্র ভাষায় রাশিয়াকে আক্রমণ করেছে সিরিয়ায় বিমান হামলার কারণে। যদিও বিমান হামলা কোনো আকষ্মিক বিষয় নয়। মূল বিষয় এরদোগানের এতদিনকার লালিত স্বপ্ন ভেঙ্গেছে এবং তার সাহায্য-সহযোগীতায় বেড়ে ওঠা তারই ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইট’ নিঃশেষ হতে চলেছে সেটা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তার কিছু করণীয় নাই! আর সে কারণে তিনি অজুহাত খুঁজছিলেন। পেয়েছেনও। গত ৬ অক্টোবর খারাপ আবহাওয়ার কারণে রাশিয়ান বিমান ক্ষণিকের জন্য তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। সাথে সাথে রাশিয়ান পক্ষ সে জন্য দুঃখ প্রকাশও করেছে। তার পরও এরদোগান ন্যাটো বৈঠকে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এবং ন্যাটো মুখপাত্র বলেছেন ‘তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন মানে ন্যাটোর আকাশসীমা লঙ্ঘন, এটা কোনোমতেই মেনে নেয়া হবে না।‘ এই হুমকির পর পরই রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের প্রস্তাব দিলে এবং দুঃখ প্রকাশ করলেও সেটা ‘যথেষ্ট নয়’ বলে হুমকি বহাল রেখেছে ন্যাটো। মনে করা হচ্ছে ন্যাটো জোট তাদের শক্তিমত্তাকে চ্যালেঞ্জ করে রাশিয়ার বিজয়কে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তারা যে কোনো সময় সামাণ্য অজুহাতেই রাশিয়া আক্রমণ করে বসতে পারে।

[৫] যদিও আমেরিকা আর ন্যাটোর স্বার্থ একই তার পরও ন্যাটো এবং আমেরিকা এক নয়। ন্যাটো হুমকি দিলেও ঠিক এই মুহূর্তে আমেরিকা রাশিয়াকে আক্রমণ করতে যাবেনা।

[৬] ‘সীমান্ত লঙ্ঘিত হয়েছে’, ‘নির্বিচারে মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করছে’ ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে’ কিংবা ‘রাশিয়া আইএস নিধনের নামে মধ্যপ্রাচ্যে দখল কায়েম করতে চায়’ অজুহাত দেখিয়ে সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত

বাহরাইন রাশিয়া এবং চার দলীয় কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে। কেননা আইএস নির্মূল হলে বাই ডিফল্ট আসাদের শাসন নিষ্কণ্টক হবে। আর সেটা হলে ইসরায়েলি-সৌদি অক্ষ শক্তির দাপট থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন সমীকরণে চলে যাবে যাতে করে বাদশাশাসিত দেশগুলোয় ক্ষমতাবদলের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সেটা তাদের জন্য অশনি সংকেত।

[৭] হামলা শুরুর সাথে সাথে রাশিয়াকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গবদ্ধ আক্রমণ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। গ্লোবাল মিডিয়া প্রধানত আক্রমণ করছে-(ক) রাশিয়ার আক্রমণে অগনিত নারী-শিশু মারা যাচ্ছে (খ)রাশিয়া অবৈধভাবে আক্রমণ করছে (গ) আইএস দমনের নামে রাশিয়া মুসলিমবিরোধী আক্রমণ পরিচালনা করছে (ঘ) রাশিয়া অচেনা অবস্থানে হামলা করে কার্যত আইএসকে শক্তিশালী করছে। এইসব অভিযোগের যথাযথ উত্তর দিয়েছে রাশিয়ার বৈদেশিক মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারভা। তিনি বলেছেনঃ ‘ওই অঞ্চলটি আমাদের নখদর্পনে। তাই কোথা হামলা করতে হবে, কিভাবে হামলা করতে হবে সেটা আমরা ভালো করেই জানি। আমাদের ১০ বছর আগেই এ অভিজ্ঞতা হয়েছে।‘

[৮] বিমান হামলা শুরুর পর পরই কৌশলগত কারণে মসজিদে আশ্রয় নিচ্ছে। রাশিয়া আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে তারা কখনোই মসজিদের মত পবিত্র স্থানে হামলা করবে না। এখন যদি কখনো হামলা হয়েই যায় তাহলে সেটাকে যেন ‘ক্যাশ’ করা যায় সে চেষ্টা করবে আইএস এবং তাদের শুভাকাঙ্খীরা।

[৯] ‘ISIS is not Islam’ – নামে রাশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ‘Anti-extremist textbook’ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা চাইছে প্রথম থেকেই যেন আইএসবিরোধী লড়াইটা ‘ইসলামবিরোধী’ প্রতিভাত না হয়। কোনো প্রকার অতিরঞ্জন ছাড়াই রাশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী স্কলারদের নিয়ে প্রথম দফায় ৩ হাজার কপি বই ছেপেছে।

[১০] আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ন্যাটো, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, বাহরাইন, ইসরায়েলসহ অক্ষশক্তির নাকের ডগা দিয়ে আইএস বিলুপ্ত হবে, আর অক্ষশক্তিবিরোধী আসাদের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক হবে সেটা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। নেবেওনা। আবার দেড় দশক আগে রাশিয়া আফগানিস্তানে যে ‘ভুল’ করেছিল সেটারও পুনরাবৃত্তি করবে না তারা। আমেরিকার সাথে পারমানবিক চুক্তি নিয়ে যতই ‘ফেয়ার প্লে’ হোক ইরানকে কোনো ভাবেও সিরিয়ার পাশ থেকে সরানো যাবে না। নিরাপত্তা পরিষদের আরেক সদস্য যার অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকেও চ্যালেঞ্জ করেছে সেই চীনও মিছিমিছি বসে থাকবে না। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত, ইরান, ইরাক, সিরিয়া মিলে যে নতুন অক্ষশক্তি তারাও বিনা চ্যালেঞ্জে আমেরিকা আর ন্যাটোর চোখ রাঙানি মেনে নেবেন।

[১১] ইতিমধ্যে রাশিয়ার নেভি আক্রমণে সামিল হয়েছে। ১৫০০ মাইল দূরে কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থানরত রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজ থেকে আইএস লক্ষবস্তুতে ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ক্ষেপনাস্ত্রগুলো নিখুঁতভাবে টার্গেট বিদ্ধ করেছে। অল্প দিনেই চেচেন বিশেষ স্থল বাহিনীকেও সিরিয়াতে নামানো হতে পারে।

[১২] ৭ অক্টোবর প্রায় খোলাখুলিই ইরাক তাদের ভাষ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে ‘সম্বভত খুব শিগগিরই ইরাক রাশিয়াকে ইরাকে ঘাটি গেড়ে বসা আইএস জিহাদীদের নির্মূলের জন্য আমন্ত্রণ জানাবে।

[১৩] আফগানিস্তানের বেলায় যেমনটি হয়েছিল সেই একই ফর্মূলা এবারও প্রয়োগ হতে পারে। রাশিয়াকে নিবৃত্ত করতে, কার্যত আইএসকে বাঁচাতে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, আরব আমিরাতসহ সুন্নিপন্থী বাদশাহশাসিত ধনকুবের দেশগুলো ‘নাস্তিক কমিউনিস্ট রাশিয়া’কে হঠাও বলে কোটি কোটি দিরহাম/ডলার/পাউন্ড খরচ করবে। যদিও এখন রাশিয়া কমিউনিস্ট শাসিত নয়, (বরং বুর্জোয়া পুঁজিবাদ শাসিত), তার পরও কমিউনিস্ট ঐতিহ্যের কারণে তাদেরকে ‘নাস্তিক কমিউনিস্ট’ ট্যাগ দেয়াটা সহজতর। তারা সেটা করবেও। আর তার রেশ পড়বে এই বাংলাদেশেও। একাত্তরে যে রাশিয়ার গৌরবোজ্জল ভূমিকার কারণে তাদেরকে আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম সুহৃদ মিত্র ভাবা হয় সেই রাশিয়াকে ‘মুসলমান হত্যাকারী’ বলে ঘৃণা এবং প্রতিরোধের জন্য উগ্রপন্থার রক্তগঙ্গাও বয়ে যেতে পারে। আমেরিকা-রাশিয়া ফাইট অব প্রেস্টিজ থেকে ‘মুসলিম ফেনোমেনা বনাম প্রাক্তন কমিউনিস্ট ফাইট’ বাজার পেতে পারে। আর সেটা একবার ছড়িয়ে পড়লে ‘মুসলিম-খ্রীস্টান’ চিরায়ত যুদ্ধও অবসম্ভাবি।

এমতাবস্থায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ মোড়কে কোনো যুদ্ধ হোক বা না হোক বিবদমান দুটি পক্ষের ভেতর মরণঘাতি সংঘর্ষ অনিবার্য। সেটা এখনই হতে পারে, আবার কিছুদিন পরও হতে পারে। তবে হবে যে তা নিশ্চিত। একবার সেই ব্যাপক লড়াই শুরু হলে বিশ্বের ছোট-বড় কোনো দেশ আর ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে থাকতে পারবে না। তাদেরকে স্ট্রাটিজিক কারণেই যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে। কেননা কেউই তখন আর যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারবে না। আর ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের অবস্থান হবে সব চেয়ে নাজুক। বাংলাদেশ, সিরিয়া, ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রকামী যে কোনো দেশের জন্য আমেরিকা তো বটেই, রাশিয়াও ধনন্তরি টোটকা নয়। রাশিয়াও গণমানুষের শত্রু, তবে ভিন্ন মাপে, ভিন্ন মাত্রায়। পুতিনও কঠোর হাতে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির টুটি চেপে ধরে। নিনা আন্দ্রিয়েভার মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিকে এক চুলও নড়তে দেয়া হয়না রাশিয়াতে। সেই প্রাচীন কাল থেকে রাশিয়ানরা প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী। এই জাত্যাভিমানী জাতীয়তাবাদের উত্তুঙ্গ শক্তির নিয়মই হল বলপূর্বক দখল। তাতার আর চেচেন ঐতিহ্য তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাশিয়ার এখনকার অবস্থানকে অনেকে ‘বৈপ্লবিক’ বা ‘সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে’ মনে করছেন (কারণ আমেরিকান অক্ষশক্তির দাপটের কাউন্টার একমাত্র রাশিয়াই করছে বলে)। কিন্তু মনে রাখতে হবে রাশিয়ায় এখন শাসনক্ষমতায় আছেন কমিউনিস্টদের কচুকাটা করা গর্বাচেভ-ইয়েলেতসিনদের উত্তরসূরি। ঐতিহ্যগত সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মশ্লাঘা তাদের কখনো কখনো উজ্জীবিত করে। তবে যেহেতু তারা পুঁজিবাদের সেবক তাই শেষ পর্যন্ত কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রের বিরোধীতাই তাদের শেষ পদক্ষেপ। সুতরাং ‘ক্যারিশম্যাটিক’ পুতিন জয়ী হলেও এই ধরণের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর গণমানুষের কোনো উপকার নেই, আমেরিকা আর তার স্যাঙাতরা জয়ী হলে তো কথাই নেই। আজকের রাশিয়া যে কোনো উপায়ে তার হারানো ‘সাম্রাজ্য’ পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। নতুন পুঁজিবাদের বোতলে পুরোনো সোভিয়েতের ঐতিহ্য ফেরি করতে চাইছে। আর সেটাকেই ঘটনাক্রমে বিশ্বের অগুণতি শান্তিকামী মানুষ ‘আশার আলো’ বলে বিভান্ত হচ্ছে। মরিচিকাকে জলাশয় ভেবে প্রতারিত হচ্ছে। তবে যুদ্ধের নিয়ম হল সৃষ্টি। এবারকার এই যুদ্ধও নিশ্চিতভাবে কিছু না কিছু সৃষ্টি করবে। করবেই।সময়ই বলে দেবে সেটি ইতিবাচক না নেতিবাচক।


মনজুরুল হক

ঢাকা

৭ অক্টোবর, ২০১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s