বাংলাদেশকে অনুসরণ করে পাকিস্তানের উঠতে চাওয়া বনাম নিজের ভুলে বাংলাদেশের ডুবতে থাকা

05232899_f00c60922089840a9484c1adb64e6cc4.nbcnews-ux-2880-1000

জন্মের পর থেকেই সেনা শাসনে অভ্যস্ত পাকিস্তানের সেনা শাসকরা আশির দশকে আফগান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে সরাসরি তালিবান পয়দা করেছিল। সেই তালিবানরা নজিবুল্লাহকে হত্যা করে যে আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছিল সেই থেকে আজ অব্দি আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে তালিবান কখনো কখনো সরকারের প্যারালাল, কখনো কখনো সরকারের অভিভাবক। পাকিস্তানের কোনো সরকার যদি তালিবানমুক্ত থাকতে চায় তাও তাদের পক্ষে অসম্ভব! অর্থাৎ তালিবানের জন্মদাতা সেনাবাহিনী যে কোনো বিচারে পাকিস্তানের ‘প্যারালাল সরকার’। এভাবে চলার ফলে দেশটির যে পরিণতি হওয়ার কথা, তা-ই হয়েছে। একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে পাকিস্তান। এমন একটি দিন নেই যেদিন শিয়া-সুন্নি, মুসলিম-খ্রিষ্টান, পাকিস্তানি-মহাজের হানা হানি কাটা কাটি হয় না। গত কয়েক বছরে মসজিদে, গীর্জায়, বাজারে, পার্কে, স্কুলে বোমা হামলায় অন্তত কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ল’এন্ড অর্ডার বলতে যা বোঝায় তার কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই দেশটিতে। সর্বশেষ অন্তত ৭৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে লাহরের একটি পার্কে বোমা বিস্ফোরণে, যাদের অধিকাংশই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বি শিশু।

এই যে চিত্রটি দেয়া হল পাকিস্তানের, এর পরও দেশটি চেষ্টা করে যাচ্ছে এই ঘোর অমানিশা থেকে বেরিয়ে আসতে। লাহরে হামলার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এই অন্ধাকার সময়েও পাকিস্তানে কোনো কোনো প্রশাসক এবং উচ্চ আদালত দুর্দান্ত সাহসিকতা দেখিয়ে চলেছে। লাহরে হামলার পেছনেও সেই ‘সাহসিকতার’ পরিণতি! রোববারের ওই হামলাকে পাকিস্তানের নীতনির্ধারকদের প্রতি সেই ধরণের র্বাতা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানে র্ধমদ্রোহিতারোধ আইন বাতলি করতে চাওয়া গর্ভনর সালমান তাসিরের হত্যাকারী মমতাজ কাদরির মৃত্যুদণ্ড এই মাসের প্রথম দিকে কার্যকরের পর অনেকে বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। এই হামলাকে ওই ঘটনায় বিক্ষুব্ধদের উসকে দেয়ার চেষ্টা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ পাঞ্জাবের গর্ভনর সামলাম তাসির সাহসিকতা দেখিয়ে ‘ধর্মদ্রোহিতারোধ’ আইন বাতিল করতে চেয়েছিলেন। তার পর পরই তারই দেহরক্ষি সালমান তাসিরকে হত্যা করে। বিচার শেষে তাসিরের হত্যাকারীর ফাঁসি হয় গেল সপ্তাহে। আর সেই ফাঁসির প্রতিশোধ হিসেবেই ইস্টার সানডেতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপর বোমা হামলা এবং ৭৫ জনের প্রাণহানী।

এভাবে তাৎক্ষণিক হামলা এবং নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের পরও পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত বসে নেই। দেশটির সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের দুটি সংশোধনীর শুনানিতে বলেন, পাকিস্তানের পার্লামেন্ট চাইলে বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তানকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।

‘২০১৫ সালে ৫ মার্চ পাকিস্তানের সংবিধানের ১৮ ও ১৭তম সংশোধনীর শুনানির সময় পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি নসিরুল মালিক এই পর্যবেক্ষণ দেন। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে ১৭ ও ১৮তম সংশোধনী আনা হয়। পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ গঠন হলে পাকিস্তান এই দুটি সংশোধনীর মাধ্যমে তাদের সংবিধান সংশোধন করে। রিটের শুনানিতে পাকিস্তানে ১৭ জন বিচারক অংশগ্রহণ করেন। তারা তাদের পর্যবেক্ষণে বলেন, ১৯৪৭ সালে পশ্চিম ও পূর্বপাকিস্তান নিয়ে ইসলামি রিপাবলিক পাকিস্তান গঠন হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ গঠন করে। তাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা হয়। সেই বিবেচনায় পাকিস্তানের সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রণয়ন করা যায়। প্রধান বিচারপতি বলেন, পাকিস্তানে একটি জনপ্রিয় দাবি রয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষতার। এই হিসাবে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে ধর্মনিরক্ষেতার দাবি নিয়ে জয়ী হয়ে আসলে সংবিধান তারা সংশোধন করতে পারে। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগের চিন্তা পরিবর্তন করা যায়।  তিনি বলেন, তুরস্ক ও চীনের জনগণ যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের সংবিধান পাল্টিয়ে ফেলেছে (আমাদের সময়.কম : ২৯/০৩/২০১৬)।‘

পার্কে হামলা করে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা করে যারা ‘মেসেজ’ দিতে চেয়েছে তারা জামাত-উল-আহরার নামরে একটি জঙ্গি সংগঠন। এটি স্বল্পপরচিতি। বলা যায় আনকোরা সংগঠন। বছর দুয়কে আগে তহেরকি-ই-তালবোন পাকস্তিান (টটিপি) থেকে বেরিয়ে এটির জন্ম হয়।

বৃহত্তর তালেবানদের মতো জামাত-উল-আহরারও কট্টর দওেবন্দি ভাবধারায় অনুপ্রাণতি। উপসাগরীয় এলাকা থেকে প্রভাবিত এই ভাবধারা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলোকে অনুপ্রাণতি করছে। আফগানস্তিান সীমান্তর্বতী প্রত্যন্ত অঞ্চলভত্তিকি জামাত-উল-আহরাররে ভাষ্য, এটি ‘কাফরে রাষ্ট্রের’ বিরুদ্ধে তাদরে ‘জিহাদ’।এরই মধ্যে পাকিস্তানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনিী সাড়াশি অভিযান জারি রেখেছে। লাহোর পাকিস্তানের সম্পদশালী প্রদশে পাঞ্জাবের রাজধানী। এটি নওয়াজ শরীফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত। পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরে ২০১৪ সালরে ডিসেম্বরে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে হামলার পর রোববারের হামলাটি ছিল সবচেয়ে বড়। পেশোয়ারের হামলায় নিহত হয়েছিল ১৩৪ জন। এর বেশির ভাগই ছিল স্কুলের শিক্ষার্থী।

লাহোর হামলায় নওয়াজ শরিফ গতকাল তাঁর নির্ধারিত যুক্তরাজ্য সফর বাতলি করেছেন। রোববার গভীর রাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ উচ্চ পর্যায়ের জরুরি বৈঠক করেন। সেখানে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

একের পর এক হামলা হচ্ছে, অসংখ্য মানুষের মৃত্যুও হচ্ছে। তার পরও পাকিস্তানে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বেরিয়ে আসার চেষ্টাটি আছে। সুপ্রিম কোর্ট কিংবা কোনো প্রদেশের গর্ভনর অথবা কোনো আইনজীবি গোষ্ঠি এবং সাংবাদিক মহল ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দেশটিতে সাপের ফনার মত তাক করে থাকা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠগুলোর খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসার। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অনুকরণে তারাও চাইছেন ইসলামি রিপাবলিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ পাকিস্তান গড়তে। এই চেষ্টাটি নিঃসন্দেহে চরম সাহসী সিদ্ধান্ত। একদিকে সরকারের বিরোধীতা, অন্য দিকে প্রচণ্ড শক্তিশালী একাধিক তালিবানী দল বা গোষ্ঠির তীব্র বিরোধীতা, হামলা, হত্যা আতংকের পরও সুপ্রিম কোর্ট আর কয়েকজন ‘সালমান তাসির’ দেশটিকে বাঁচাতে লড়ে যাচ্ছেন। এত যে হতাশা, এত এত মৃত্যু, প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুআতঙ্ক, প্রতিমুহূর্তে জীবনের শঙ্কা, উপাসনালয়গুলোতেও সামাণ্যতম নিরাপত্তা না থাকার ভেতর দিয়েও তারা সাহসীকতা দেখিয়ে এগুতে চাইছেন। অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসতে চাইছেন। তাদের এই ঐকান্তিক চাওয়া আজ না হোক কাল বাস্তবায়ন হতে পারে। হতেই পারে। পাকিস্তান ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ থেকে বেরিয়ে আসবে, কারণ তারা নিজেদের সমস্যাগুলোকে স্বীকার করেন। সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করেন। সমস্যাগুলোর সমাধান করেই মুক্তি পেতে চান। ব্লাসফেমি আইনের অজুহাতে যেখানে রোজ রোজ কাউকে না কাউকে হত্যা করতে আব্দার করে মৌলবাদীরা, সেখানে সরকার চালাতে গেলে যে গার্টস লাগে তার পুরোটা পাকিস্তানের শাসকদের না থাকলেও তাদের চেষ্টাই তাদেরকে সফল করতে পারে।

যখন পাকিস্তান নিজের খোঁড়া ‘কবর’ থেকে উঠে আসার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ আরেক প্রস্থ অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। এবং বিস্ময়কর হল সেই তলিয়ে যাওয়াকে শীর্ষমহলে ‘বাঁচা’ বলা হচ্ছে। ২৮ বছর আগে মতলববাজ স্বৈরাচার এরশাদ নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে যে উদ্ভট আইন (রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম) জারি করেছিল তাকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিট সরাসরি খারিজ হয়ে গেছে। রিট খারিজ হওয়াটা আসমান থেকে পড়ার মত আশ্চর্য কিছু নয়, কিন্তু ‘খারিজ’ করার ধরণটি বিস্ময়ের সৃষ্টি করে বৈকি!

রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে করা রিট পিটিশন খারিজ হয়েছে কেন?  আদালত বলছে পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য রিট খারিজ। এখন এই প্রশ্নটি উঠতেই পারে আগের একটি বেঞ্চ যে এই রিটের ওপর রুল দিয়েছিল সেই বেঞ্চ কি এই পদ্ধতিগত ত্রুটি খেয়াল করেনি ? যে ১৫ ব্যক্তি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন তাদের  একজন ছিলেন প্রধান বিচারপতি বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন।ছিলেন বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য,  বিচারপতি কে এম সোবহান, ব্যরিষ্টার ইশতিয়াক আহমেদ। আজকের বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি নাঈমা হায়দার ছিলেন প্রয়াত ইশতিয়াক আহমেদের জুনিয়র। নাঈমা হায়দারের বাবা বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। বিচারপতি চৌধুরী নির্বাচনে জামায়াতের সমর্থন নিতে যুদ্ধাপরাধীদের গুরু গোলাম আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সে সময় এ নিয়ে যথেষ্ট পানি ঘোলা হয়েছিল। এখন  দেশের সেরা আইনজ্ঞেরা ‘রিট পিটিশন দায়ের করতে প্রক্রিয়াগত ভুল করেছিলেন’ এটা একটা বিস্ময়। আরেকটি বেঞ্চ যে এটি খেয়াল করল না তাও এক চরম বিস্ময়! এতসব বিস্ময়ের কোনো মূল্য নেই এখন আর।

আজকে যে দুজন নেত্রী এই রায় নিয়ে স্পিকটি নট তারা কিন্তু সে সময় প্রবল প্রতিবাদী ছিলেন! ১৯৮৮ সালের ৮ই জুন জাতীয় সংসদে উপস্থিত জনপ্রতিনিধিদের সম্মতিতে ‘ইসলাম’কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮৮ সালে সংবিধান সংশোধনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন ‘ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে এই সংশোধনী বাতিল করবে’।আর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন ‘ সংবিধানের এই সংশোধনী জাতিকে বিভক্ত করবে, এই সংশোধনী গ্রহনযোগ্য নয়।‘

ইতিহাসের নির্মম পরিণতি হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আজকে যে ব্যর্থরাষ্ট্র পাকিস্তান সকল ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে ৪৫ বছর আগে পৃথক হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সংবিধানের অনুকরণে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ চালু করতে চাইছে, সেই একই সময়ে ‘অনুকরণীয়’ বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দিয়ে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বহাল রেখে আশ্বস্ত হচ্ছে! তাদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ছে! এই ঘুণীপাকে আজ হোক কাল হোক পাকিস্তান ‘বেঁচে’ যাবে, কারণ তারা বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ‘বাঁচবেনা’, কারণ এরা বাস্তবতা অস্বীকার করে কিউই পাখির পিঠে চড়ে উড়তে চাইছেন!

 

মনজুরুল হক

৩১ মার্চ, ২০১৬

ঢাকা।

 

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s