বিচার বর্হিভুত হত্যা এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব।

 

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের মাসিক প্রতিবেদনে বলেছে-“আইন প্রয়োগকারি সংস্থার হাতে বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ড বেড়েছে অভিযোগ করে ঘটনাগুলো তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্তকারি প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। তারা দাবি করেছে ,বিচারবর্হিভুত হত্যা বেড়ে মারাত্মক রূপ নিয়েছে এবং গত জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে দুই জন এ ধরণের হত্যার শিকার হয়েছেন। শূক্রবার অধিকারের প্রকাশ করা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ থেকে ৩১ জুলাই সময়ের মধ্যে মোট ১৬ ব্যক্তি বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ডের শিকার হন। এর মধ্যে ৭জন র‌্যাবের এবং ৯জন পুলিশের ক্রসফায়ারে বা এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।সম্প্রতি নওগাঁয় কথিত বন্দুকযুদ্ধে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম এল-লাল পতাকা) শীর্ষ নেতা ডা.মিজানুর রহমান টুটুলের নিহত হওয়ার ঘটনার উল্লেখ করে অধিকার বলেছে,টুটুল গ্রেফতার হওয়ার পর তার মা আইনি প্রক্রিয়ায় তার ছেলের বিচার চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ওই আবেদন জানানোর কয়েক ঘন্টার মধ্যে টুটুল আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন। এ হত্যাকান্ড কোনোও বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। অধিকার আশংকা করছে, জাতীয় ও আন্তর্যাতিক উদ্বেগ স্বত্তেও বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ড এ ভাবে চলতে থাকলে আগামী মাসগুলোতে আরো বেশি মানুষ এ ধরনের ঘটনার শিকার হতে পারে। অধিকার ক্রসফায়ার কিংবা বন্দুক যুদ্ধের নামে বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ড বন্ধ করার এবং এতে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাগুলো তদন্তে একটি বেসামরিক স্বাধীন তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী ব্যবস্থা গ্রহণ,তদন্ত এবং উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ওই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে(ভোরের কাগজ,২ আগস্ট,২০০৮)।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর প্রায় পুরো প্রতিবেদনটাই তুলে দেওয়া হলো। গত এক মাসে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ঘটিত হত্যাকান্ড নিয়ে অধিকার ছাড়া আর কোন সংস্থার কোনও প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি ।বাম তাত্বিক বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বে গত ৩০ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যাকান্ডের নিন্দা এবং জড়িতদেও বিচারচাওয়া হয়েছে।ডা.টুটুল ছাড়া অন্যান্যদের ক্ষেত্রে
যেটা হয়েছে আইনি সহায়তা চাওয়ার আগেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ডা.টুটুলের গ্রেফতার হওয়ার পর পরই তার মা ঝিনাইদহের স্থানীয় দুই তিন শ’ মানুষ নিয়ে ডিসির কাছে আবেদন করেছিলেন। তার মায়ের আবেদন ছিল এরকম: টুটুলরে মায়রে শগ্ধকা ছলি তার ছলেকেে ‘ত্রক্রসফায়ার’ে মরেে ফলো হতে পার।ে গত শনবিার সকালে বাড়তিে বসইে পুলশিরে কাছ থকেে খবর পান ঢাকার উত্তরায় ছলেে ডা. মজিানুর রহমান টুটুল গ্রফেতার হয়ছেনে। বৃদ্ধা মা নভরো খাতুন কোটচাঁদপুর থকেে ঝনিাইদহ সদরে ছুটে গয়িে জলো প্রশাসকরে দফতরে স্মারকলপিি দতিে চান। আবদেন, তার ছলেকেে যনে ‘ক্রসফায়ারে হত্যা না করে প্রচলতি আইনে বচিার করা হয়।’
রাত ৯টায় তনিি এলাকার শ’ দুয়কে লোকসহ ঝনিাইদহ প্রসে ক্লাবে গয়িে সাংবাদকিদরে কাছে স্মারকলপিরি আবদেনটি তুলে ধরনে যনে সরকাররে কানে যায়।তার মায়ের আশংকাই সত্য হয়েছে।

অধিকারের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে শুধু জুলাই মাসেই ১৬ জন ব্যক্তি কে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছে। কেন এই এক মাসেই এত জন হত্যার ‘রেকর্ড হয়েগেল? এর আগে আমরা দেখলাম গত মে-জুন মাসে ঢাকায় পর পর কয়েক দিন চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাসী হত্যাকান্ড বেড়ে গেল।সংবাদ পত্রগুলোতে বড় বড় ব্যানার হেড হলো। তার পর পরই আক্রমণ শুরু হলো বিশেষ একটা দলের নেতা-কর্মিদের ধরে ধরে হত্যা করা।যেন এটা প্রমান করা যে, ঢাকায় যে আইন শৃংখলার অবনতি হয়েছিল সেটা ওই বিশেষ রাজনৈতিক দলের লোকরাই করছিল! অথচ ওই বিশেষ দলের যে ক’জনকে হত্যা করা হয়েছে তাদের কারো ‘হত্যাকারণের’ বিবৃতিতে ্ওটার উল্লেখ নেই যে, তাদের দ্বারাই রাজধাণী ঢাকার বা দেশের অন্যান্য জায়গার আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছিল। যে ক’জন কে হত্যা করা হয়েছে তাদের প্রায় সবার নামেই অভিযোগ যে, তাদেরনামে ভুরি ভুরি মামলা থানায় আছে বা ছিল। তাহলে কী ব্যাপারটা এরকম দাঁড়াচ্ছে না যে, দু’চারটা ডাকাত বা সন্ত্রাসীকে ‘ক্রসফায়ারে মেরেও গড়ে সব ফায়ারেরই টার্গেট একটা বা একাধিক বিশেষ রাজনৈতিক দল ?

আট ন’মাস হয়ে গেল আমাদের বিচার ব্যবস্থা স্বধীন করা হয়েছে। এটা বর্তমান তদারকি সরকারের একটা সাফল্য বটে।অর্থাৎ বিচার ব্যবস্থা যখন স্বাধীন তখনই বিচার ব্যবস্থার উপর খোদ সরকারেরই কোন আস্থা নেই? আমরা আগে দেখতাম বিচার ব্যবস্থার উপর সরকারের খবরদারির কারণে বিচারকরা স্বধীন ভাবে বিচার কার্য চালাতে পারতেন না। অনেক লিমিটেশনের মধ্যে বিচারকদের বিচারকার্য চালাতে হতো। বিচার ব্যবস্থা স্বধীন হওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম এবার সাধারণ মানুষ তাদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল আদালতের উপর আস্থা আনতে পারবে। এবার ন্যায়বিচার কোন ক্ষমত্বানের অঙ্গুলি নির্দেশে স্তব্ধ হয়ে যাবে না। কিন্তু প্রকারন্তরেদেখা গেল কী? স্বধীন বিচারব্যবস্থা থাকারপরও সেই বিচারালয় ্ও ধরণের বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ডের বিরু দ্ধে টু শব্দটি করল না। ‘স্বধীন’ বিচারপতিরা অন্তত এই কথাটাও বলতে পারতেন যে,বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ড যদি ঘটতেই থাকে তাহলে বিচারালয়ের কাজ কী? শুধু বিচারালয়বা বিচারপতিরাই নয়, এ ধরণের চিারবর্হিভুত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র,সমাজতন্ত্র,মানবতার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলেফেলা অর্ধবাম, পুরো বাম, মধ্যবাম, প্রগতিশীল কেউই প্রতিবাদ দূরের কথা সামান্য বিবৃতি টাও দিল না। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তেলতেলে করা আর ক্ষমতার সিঁড়িতে এক পা দু’পা করে এগুতে থাকার মোহ এতোই যে, এ ধরণের অন্যায়ের সঙ্ েকাছাখোলা আপোষ করতেও তাদের বিবেকে বাঁধেনি। একটা সভ্য দেশের আইন মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করার লাইসেন্স দিচ্ছে ! এটা দেখেও যে তথাকথিত গণতন্ত্র আর মানবতার ধ্বজাধারীরা নিশ্চুপ তা কি কেবলই তথাকথিত সšা¿স বিরোধীতা? নাকি কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার অনির্বাণ ইচ্ছা?

‘ক্রসফায়ার’, বন্দুক যুদ্ধ’, কিংবা ‘লাইন অব ফায়ার’ যা-ই হোক না কেন কোন অপরাধী কে তার অপরাধ প্রমাণের , সংশোধনের ’আইনি সহায়তার সুযোগ না দিয়ে হত্যা করা কেন সভ্য দেশের আইন হতে পারে না। আইন বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা হয়ত বলবেন ‘বাইরের সভ্য দেশের বাস্তবতার সাথে আমাদের বাস্তবতার কোন মিল নেই। আমাদের বাস্তবতায় এটাই সর্বেত্তম পন্থা’। বেশ । তাই যদি হয় তাহলে যে সকল রাজনীতিবিদদের কারণে ওয়্না ইলেভেনের আগে দেশের সামগ্রিক অবস্থা টালমাটাল হয়ে উঠেছিল ,যাদের কামড়াকামড়ি থেয়খেয়ির কারণে ওয়ান ইলেভেন ঘটাতে হলো ,তাদের তো ঠিকই আদালতে আইনের হাতে সোপর্দ করা হলো । যারা এখর আইনের ফাঁকফোঁকোড় গলে বেরিয়ে আসছে।

আমাদের দেশে যে সকল বুদ্ধিজীবীরা ,সুশীলরা গণতন্ত্র আর সুশাসনের জন্য মায়াকান্না কাঁদেন, যখন তখন একে তাকে নসিয়ত করেন,গণমানুষের অধিকারের কথা বলে হরেকরকম দোকান টোকান খুলে বসেন এইসব ধূয়ো টুয়ো তুলে মৌসুমি বিদেশ সফর টফর করেন বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ডে তাদের নির্লিপ্ততা,নির্জিবতা আর পাওয়ারবেল্টের সাথে কোলাবরেশন দেখে নবারুণ ভট্টাচার্যের এই কবিতার লাইনটি ই যথার্থ :‘যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরানী প্রকাশ্য পথে এই হত্যার বিচার চায়না আমি তাকে ঘৃণা করি’(নবারুণ ভট্টাচার্য।’এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’।)

মনজুরুল হক।
০৩/০৮/২০০৮13417601_10209794217715896_6662804109438839819_n

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s