‘আয় খোকা ফিরে আয়’ বলে হাঁক ডাক না করে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

555_219292

আ কমন সিকোয়েন্স অব বাংলা সিনেমাঃ নায়ক নায়িকার বাবাকে অবজ্ঞা করায় হুমকি দিচ্ছে- ‘আমি মুসলমান, আমার আল্লা এক, আমার জবান এক, এই আমি বইলা গেলাম, এর প্রতিশোধ নেবই নেব’। এধরণের ডায়লগের পর পরই হলসুদ্ধ লোক উল্লোসিত হয়, হাতে তালি দেয়।

শাহবাগের ছিন্নমূল শিশু। বয়স সাত কি আট। মানববন্ধন বা সভা হলে পাতানো চেয়ারে বসে থাকে। বাংলা, ইংরেজি, আরবী কোনো শিক্ষাই তার নেই, কিন্তু আযান শুরু হলে ভাষনদানরত লোকটি ব্যতিব্যস্ত হয়ে থামিয়ে দেয়! ওর সাত-আট গুণ বেশি বয়সের লোকটিকেও অবলীলায় সাবধান করে- ‘থামেন! আযান হইতেছে’! ওর এই শিক্ষাটা ও পরিবেশ থেকেই পেয়েছে। এধরণের শত শত উপমা দেয়া যেতে পারে। সহস্র ঘটনার বর্ণনা হতে পারে। লক্ষ-কোটি মানুষ লালিত অভ্যেস আর সংস্কৃতি দিয়ে এই ধরণের অবৈজ্ঞানিক আচার-আচরণ করে আসছে। এই অভ্যেসটাই যখন ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ নামে অবশ্যপালিত হয় তখনই সমাজে এক ধরণের প্রথা বা ইজম দাঁড়িয়ে যায়। স্বাধীনতার পর থেকেই জেনে-বুঝে শাসকশ্রেণি এই প্রথাকে পেট্রোনাইজ করেছে। গরু মোটাতাজাকরণ এর মত মোটা-তাজা করেছে। কখনো নিজের ভোটের বৈররণী পার হবার জন্য, কখনো প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য, কখনোবা নিজের লালিত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার জন্য।

গত চুয়াল্লিশ বছরে এই দেশের কোন কোন ক্ষেত্রে র‌্যাডিক্যাল চেঞ্জ হয়েছে প্রশ্ন করলে দুটি উত্তর বেরুবে। এক. জাতির, সমাজের, শ্রেণির সমস্ত আস্রয়স্থল থেকে সকল প্রকার প্রগতিশীলতা, বিজ্ঞানমনষ্কতা, ইহলৌকিকতা, সংস্কৃতমনষ্কতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে। তার পরও যারা দুর্দান্ত সাহসের সাথে রুখে দাঁড়িয়েছে তাদেরকে ধরে ধরে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছে। দুই. প্রবল গতিতে সমাজ, দেশ, শ্রেণি, জাতিকে পশ্চাদমুখি করা হয়েছে। কূপমণ্ডুকতা, পশ্চাদপদতা, ভাববাদী চিন্তাধারা এবং পরলৌকিকতার আগমন ঘটানো হয়েছে। এসবের কারণে নতুন শতাব্দীতে এই দেশটিকে আর কোনোভাবেও বাহাত্তরের চার মূলনীতির দেশ বলা যাবেনা। এমনকি ‘মডারেট মুসলিম’ দেশও নয়।সরাসরি উগ্রবাদী অসহিঞ্চুতাই যে দেশের নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত তিন বছরে যে ৪৮ জন মানুষকে ‘ধর্ম রক্ষার’ নামে প্রাণ দিতে হয়েছে তাদের জন্য ‘দেশের সকল মানুষ’ সরব হননি। কিছু সংখ্যক মানুষ নানাভাবে সরকারকে, সুশীল সমাজকে, বিবেকবান মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘোরতর অন্যায়। আপনারা সকলে এর বিরোধীতা করুন, এই ক্ষ্যাপা ষাঁড়কে থামান, নইলে সকলকে মারবে। সকল বিবেকবান মানুষের চিন্তাচেতনাকে বিস্মিত বিমূঢ় করে সরকার এবং শাসকশ্রেণির ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাবর্হিভূত অংশের কেউ কর্ণপাত করেননি, বরং ক্ষমতার দম্ভে উল্টে হুমকি দিয়েছেন শীর্ষ নেতারা। তাদের দেখাদেখি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এক্তিয়ারবর্হিভূতভাবে ‘সংযত হোন’, ‘দেশ ছেড়ে চলে যান’, ‘লেখালেখি বন্ধ করেন’ বলে নসিয়ত করেছেন। শত সহস্র মানুষ প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু আশঙ্কা নিয়ে অনিশ্চিত বেঁচেছে। প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অনিরাপদ, একাকী আর ভয়ঙ্করভাবে অসহায় ভেবে কুঁকড়ে থেকেছে। অসহায়ত্বের ক্ষোভে-দুঃখে গভীর ক্ষত নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করেছে!

আজকে গুলশানে সেই সব জঙ্গিদের হাতে ২০ জন বিদেশির মৃত্যুর পর আপনারা নড়ে-চড়ে বসেছেন! দেশজুড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন। প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছেন। প্রতিহতের শপথ নিচ্ছেন। আপনাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সারা দেশ চষে ফেলছে। টিভিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। জঙ্গিদের ফিরে আসার গান গাইছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হানা দিয়ে ‘চাপাতি আর জঙ্গি বইপত্তর’ জব্দ করছেন। বিশ্বের কোন কোন নেতা আপনাদের সাথে আছে ফলাও করে তার বিবিরণ প্রচার করছেন। প্রায় প্রতি ঘন্টায় কোনো না কোনো কর্তাব্যক্তি জঙ্গিবিরোধী বিশ্লেষণ হাজির করছেন।

আজকের এই দশা তো রাতারাতি হয়নি। এর পেছনের কারণগুলোও তলিয়ে দেখতে হবে। সবিস্তার নয়, খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে প্রথমতঃ বাহাত্তরের সংবিধানে শ্রমজীবি জনগণের কথা না থাকলেও আপামর জনসাধারণের জন্য গড়পড়তা কিছু প্রটেকশন ছিল। সংবিধানে ছিল গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। মহাজোট সরকার তৃতীয় মেয়াদে দেশ শাসন করলেও সর্বশেষ তারা সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছেঁটে দিয়েছেন। সেটা নিশ্চিতভাবে ফেরাতে হবে সংবাধান সংশোধন করে।

দ্বিতীয়তঃ পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর দুই সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান এবং জিয়াকে হত্যা করার পর এরশাদ দেশ শাসন করার কাজে একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানপন্থাকে উপজীব্য করেন। দুজনই সংবিধানের মূল নীতিকে পদদলিত করে হীন স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত এবং অপরাপর ধর্শাশ্রয়ী দলকে তিনি রাজনিতিতে পুনর্বাসিত করেন। সংবিধানের কপালে ‘বিসল্লিাহ’ লিখে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধোকা দেন। আর এরশাদ ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ নামে এক অদ্ভুত তত্ত্ব হাজির করেন। সংবিধানকে কেটে ছেটে এইসব সংযোজন কেবলমাত্র কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কূপমণ্ডুকতা, পশ্চাদপদতা, প্রগতিবিরোধীতা চালু করেছে। সমাজের শিরায় শিরায় ধর্মীয় মৌলবাদের বীজ রোপন করেছে। ধর্শাশ্রয়ীরা বেশুমার ব্যবসার সুযোগ নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করেছে এবং সেই টাকা নিজেদের বীজ রোপন এবং সাম্প্রদায়ীক বৃক্ষ বিস্তারে ব্যয় করেছে। সংবিধান সংশোন করে বাহাত্তরে ফিরেছেন, কিন্তু ‘বিসমিল্লাহ’ আর ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাদ দিতে সাহস করেননি। এগুলো রেখে কিভাবে জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করবেন?

তৃতীয়তঃ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলামগুলোও জঙ্গিবাদের সহায়ক হয়ে রয়েছে সেই প্রথম থেকেই। তাদের সিলেবাসে সোস্যাল সায়েন্স নেই। পলিটিক্যাল সায়েন্স নেই। নৃতত্ত্ব নেই। ফিলোসফি নেই। সমসায়িক বিষয় নেই।অর্থাৎ যে বিষয়গুলো পঠিত হলে শিক্ষার্থীরা বিচার-বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশীল মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারবে সেই বিষয়গুলিই সিলেবাস থেকে ছেঁটে দিয়েছে। সেই সাথে রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থায় গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা জাতীয়তাবাদ আর সমাজতন্ত্রকে শেখানো হয় বিধর্মী ইহুদি-নাসাদের মতবাদ হিসেবে। সেই শিশু বয়স থেকেই একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী এইসব ভুল আর অপশিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে ওঠে। তার পাশাপাশি রয়েছে উচ্চবিত্তের জন্য ক্যাডেট কলেজ, ক্যাডেট মাদ্রাসা, আরবী এনজিও এবং ইংলিশ মিডিয়া্ম শিক্ষা ব্যবস্থা। এতসব হ্যাপাজাট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রেখে আপনারা কি করে দেশ প্রেমিক জাতীয়তাবাদী প্রজন্ম তৈরি করবেন? গত চল্লিশ বছরে কমপক্ষে আটটি প্রজন্ম এভাবে বিকৃত হয়ে তৈরি হয়েছে। তারাই আজ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে গুলশানে ম্যাসাকার ঘটাচ্ছে আবার মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পুরোহিত, সেবায়েত, দর্জিকে হত্যা করছে।

চতুর্থতঃ গত চল্লিশ বছরে এই মাদ্রাসা শিক্ষা,ক্যাডেট কলেজের শেকড়হীন শিক্ষা আর প্যারাসাইট ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষায় শিক্ষিত কত হাজার হাজার লাখ লাখ বিকৃত চিন্তার মানুষ আপনাদের প্রশাসনে বসে আছে সেই খতিয়ান কোথায়? আজকে প্রশসনের যেখানেই হাত দেয়া হোক ডজন ডজন উগ্রবাদী মিলবে। শত শত জঙ্গি মানসিকতার মানুষ মিলবে। আপনাদের দেশরক্ষা বাহিনী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং অপরাপর বাহিনীগুলোতে সার্চ চালান, দেখবেন ঝাঁকে ঝাঁকে প্রগতিবিরোধী, সেক্যুলারিজমবিরোধী এবং সোস্যালিজমবিরোধী বেরিয়ে আসছে! কত জায়গায় শুদ্ধি অভিযান চালাবেন? সুতরাং সবার আগে শিক্ষাব্যবস্থা বদলাতে হবে। একমুখি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে না পারলে ওইসব ‘জিরা টলারেন্স’ শব্দবন্ধ কেবলই হুমকি-ধামকিতে ব্যবহার হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।

আপনাদের এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হোক না হোক উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদে জঙ্গি দমন করতে চান তাহলে দৃষ্টিটা আরেকটু প্রসারিত করতে হবে। আরেকটু নির্দিষ্টকরণ করতে হবে। আরেকটু শ্রেণি বৈষম্য কমাতে হবে।

আমরা জানি আমাদের পরামর্শ আপনাদের ভালো লাগবে না। হতে পারে আপনাদের একেবারে নিচের স্তরেরও কারো নজরে পড়বে না। পড়লেও আমলে নেবেন না। তার পরও বলা দরকার।

 

স্বল্পমেয়াদিঃ

১. সন্ত্রাসদমন আইনের সংস্কার করে নির্বাহী বিভাগ থেকে অনুমতি নেয়া রদ করুন।

২. সন্ত্রাসদমন আইন দ্রুত বিচার আইনের আওতায় আনুন।

৩. পুলিশ বিভাগের সংস্কার করুন। চার্জশিট দেয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিন।

৪. ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করুন। ৫৭ ধারা বাতিল করুন।

৫. সামাজিক মাধ্যমে হুমকি দাতাদের সনাক্ত করুন।

দীর্ঘমেয়াদীঃ

১. রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করুন।

২. ক্ষমতাসীন-ক্ষমতাবর্হিভূত দলগুলোর ভেতরে লালিত জঙ্গি ভাবধারা চিহ্নিত করে বহিষ্কার করুন।

৩. সিলেকশন কমিটি বাতিল করে সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন দিন।

৪. ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিলে ভিন্ন ধর্মের প্রতি কটাক্ষকারীদের নিবৃত করুন। আইনের আওতায় আনুন।

৫. পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার বাধ্যতামূলক করুন। পাঠাগার থেকে বিশেষ ভাবধারার বইপত্র সরিয়ে দিন।

৬. ধর্মাশ্রয়ী, মসজিদ- মাদরাসাভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করুন।

৭. বাংলা, ইংরেজি এবং মাদ্রাসার তিন ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা রদ করে একমুখি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করুন।

৮. নিয়ন্ত্রণহীন প্রপাগান্ডামূলক মনগড়া ধর্মীয় প্রকাশনা আইনি অনুমতির আওতায় আনুন।

৯. একমুখি শিক্ষাব্যবস্থা চালুর আগ পর্যন্ত মাদ্রাসাগুলোকে তদারকির আওতায় আনুন।

১০.সরকারী-বেসরকারী সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফিল্টারিংয়ের আওতায় আনুন, তাদের ভেতর শুদ্ধি অভিযান   চালান।

জঙ্গিবাদ যেমন রাতারাতি পয়দা হয়নি, তেমনি রাতারাতি নির্মূলও হবেনা। নীতিগতভাবে নির্মূলের সদিচ্ছা থাকতে হবে। শুধু সদিচ্ছাতেও কাজ হবেনা, সেই সদিচ্ছার প্রতিফলনও থাকতে হবে। ‘পশম বাছার কাজটি’ শুরু করতে হবে নিজ নিজ দলের ভেতর থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত।

 

মনজুরুল হক

ঢাকা

২৪ জুলাই, ২০১৬

2 responses to “‘আয় খোকা ফিরে আয়’ বলে হাঁক ডাক না করে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

  1. পড়লাম । সরকার যদি এভাবে না ভাবে তাহলে বাংলাদেশের কপালে আরও অনেক দুর্গতি আছে । সমস্ত বিষয়ে একমত । মাদ্রাসা তুলতে হবে কেন ? বিদ্বেষমূলক পাঠ্যক্রম বাদ দিয়ে সামান্য ধর্মশিক্ষা সহ আধুনিক সকল বিষয় পড়ানো হোক যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে হয় । খারিজী মাদ্রাসা বন্ধ হোক । ইংলিশ মিডিয়াম থাকুক , বাংলা পাঠ্যক্রম আর ইংলিশ পাঠ্যক্রম একই থাকুক ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s