যে মালিকরা গেট তালা দিয়ে অমূল্য জীবন পুড়িয়ে মারে তাদের বিচার চাই।

e352a0c44d59438e986200e87903c0f1-agni

গত শনিবার ভোর ৬টার দিকে টঙ্গির বিসিক এলাকার ট্যাম্পাকো নামক ফয়েল কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই লেখা তৈরি করার সময় পর্যন্ত মারা গেছেন ২৩ জন শ্রমিক। আরও অন্তত কয়েকশ শ্রমিক আহতাবস্থায় কারখানাটির ধ্বংসস্তুপে আটকা পড়েছেন। কারখানার বয়লারে বিস্ফোরণ ঘটায় অগ্নকাণ্ড। এই হচ্ছে ২৩ জন মানুষের লাশের শানেনাজুল। এবার বিস্তারেঃ এক শ্রমিকের জবানিতে- ‘তখন সকাল ৬টা ১০। অফিসে ঢুকব। তখন হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনি। দেখলাম আগুন ছড়িয়ে পড়ছে, ভবন ধসে পড়ছে। দেয়াল টপকে পাশের ফ্যাক্টরি বাংলাদেশ টেক্সটাইলে পৌঁছাই। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’—কথাগুলো বলছিলেন ট্যাম্পাকো কারখানায় হেলপার হিসেবে কর্মরত মাহবুব। দুর্ঘটনার পর টঙ্গী ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি আছেন মাহবুব।

এর পরের খবরগুলোর তেমন কোনো বৈশিষ্ট নেই। প্রায় শতভাগ গতানুগতিক। ঠিক যেমনটি যেমনটি ঘটে গার্মেন্ট কারখানায় আগুন লাগলে, এখানেও ঠিক তেমনটি ঘটেছে এবং ঘটবে। ‘২৫টি দমকল ইউনিট প্রায় ১০ ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হবে বা হয়েছে। আহতদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক, হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে আহতদের আর্তচিৎকারে, বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আহতদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান, তারা আহতদের সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন, প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি নেত্রী হতাহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের জন্য এত টাকা এবং আহতদের জন্য অত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদেরকে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে….’ এই কথাগুলো একেবারেই রুটিনমাফিক। সামান্য একটু এদিক-ওদিক ছাড়া হুবহু বসিয়ে দেয়া যাবে স্পেকট্রাম গার্মেন্ট এর ঘটনার বিবরণে। এই এই প্রতিবেদন বা রিপোর্ট বাসি হওয়ার আগেই দীর্ঘদিনের অভ্যেসবশত পুরো ঘটনাটি আলগোছে হিমঘরে চলে যাবে তাতেও কোনো সন্দেহ নাই।

এখন খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে; কেন এই নির্বিকার মৃত্যু সংগঠন? কেন বারে বারে কেবলই দরিদ্র শ্রমিকের মৃত্যু হবে? কেন কখনোই কোনো কর্মকর্তার মৃত্যু হবেনা (এ কথার মানে এটা নয় যে কর্মকর্তারাও মরুক)? কেন এই সকল অগ্নিকাণ্ডের আসল কারণ ধামাচাপা পড়েগ থাকবে? কেন নির্দিষ্ট বিরতীতে গরিব মানুষকে প্রাণ দিতে হবে? আর কেনই বা সামান্য দু লাখ টাকায় গুরিব মানুষের মৃত্যু ‘জায়েজ’ কিংবা রেগুলারাইজেশন হবে? কেন একের পর এক গেট তালা দেয়ার ঘটনায় মানুষের মৃত্যু ঘটে জানার পরও ‘তালা দেয়া’ নিষিদ্ধ করা যাবে না? কেন শ্রমিককে তালাবন্ধ গুদামে কাজ করতে বাধ্য করা হয়?

প্রকৃত সত্য হচ্ছে কারখানার গ্যাস রাইজারে ৩ দিন আগে লিকেজ দেখা দিলে কারখানার ব্যবস্থাপককে শ্রমিকরা অবহিত করেন তা ঠিক করার জন্য। কিন্তু এই বিষয় জানা সত্ত্বেও কারখানার মালিক ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন ঈদের পর ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান এবং প্রোডাকশন অব্যাহত রাখেন। এই কারখানার ৩ শিফটে ২৪ ঘণ্টা কাজ চলে। প্রতি শিফটে ১১০ জন করে মোট ৩৩০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করে। ঘটনার সময় কারখানার ভিতর ২ শিফটে মোট ২২০ জন শ্রমিক অবস্থান করছিলো এবং কারখানার একটিমাত্র পথ খোলা ছিল। আর এই পথের মুখেই ছিল গ্যাস রাইজারটি যাতে আগুন লেগেছিল। ফলে কোন শ্রমিক বের হতে পারেনি। এই কারখানায় ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো, নেসলে বাংলাদেশ, প্রাণ, মেরিডিয়ান সহ বিভিন্ন বিখ্যাত ব্র্যান্ডের প্যাকেট তৈরি করা হতো।

অন্য সকল কারণ আপাতত বাদ থাকুক। মাত্র একটি পয়েন্ট ধরা যাক। তালা। এই তালা দেয়ার ঘটনাটি আজকের নয়। যেদিন থেকে এদেশে গার্মেন্ট দোকানদারি চালু হয়েছে সেদিন থেকেই গেট তালা দিয়ে রাখার প্রচলন হয়েছে। শ্রমিকরা এটা-ওটা মানে এক রিল সূতো, আধা গজ কাপড় কিংবা এক মুঠো বোতাম তাদের শরীরে লুকিয়ে নিতে পারে। একজন শ্রমিক কোনোমতেই এক থান কাপড় নিয়ে বেরুতে পারবে না, কিংবা পাঁচটা-দশটা সার্ট/প্যান্ট নিয়েও বেরুতে পারবে না। তাহলে দেখা যাচ্ছে সামান্য সূতো-বোতাম, পিস কাপড় যেন চুরি করে না নিতে পারে সে জন্য সকল দরজায় তালা দিয়ে রাখা হয়। শিফট চেঞ্জ হয়ে শ্রমিকরা বেরুনোর সময় তালা খোলা হয় এবং একজন একজন করে শরীর হাতিয়ে বেরুতে দেয়া হয়। যদি শরীর হাতিয়ে পরীক্ষা করেই বেরুতে দেয়া হয় তাহলে তালা দিতে হবে কেন? তালা দেয়া দরজা খুলতে না পেরে অন্তত চার-সাড়ে চারশ’ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এযাবত। বহুবার দেখা গেছে দমকল কর্মীরা হাতুড়ি দিয়ে প্রধান দরজা ভেঙ্গে আহতদের উদ্ধার করেছেন। ‘তালা দেয়া যাবেনা’ মর্মে বহুবার কারখানা মালিকদেরকে সচেতন করা হয়েছে, সতর্ক করা হয়েছে। তারা শোনেননি। তারা মানেননি। তারা যে তালা না দেয়ার নির্দেশ মানছেন না সেটা কে দেখবে? পুলিশ, বিশেষ করে শিল্প পুলিশের দেখার কথা। তারা সেটা দেখেন না। শিল্প পুলিশকে জন্ম দেয়া হয়েছে অসহায় শ্রমিক পেটানোর জন্য। আন্দোলনরত শ্রমিককে হাত-পা গুড়ো করে দেয়ার জন্য। তাদের ন্যায্য দাবী আদায়ের আন্দোলন থেকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য। সে কারণে পুলিশও ওই তালা দেয়ার ইতর কাজকে তদারকি করেনি। আর সে কারণেই ঝরে গেল আরও ২৩টি অমূল্য প্রাণ (সরকারের তরফে যার মূল্য ধরা হয়েছে ২ লাখ!)।

তালা দেয়া নিয়ে সরাসরি শ্রমিকদের বক্তব্য পাওয়া গেছে- ‘শ্রমিকের স্বজনদের অভিযোগ, গেটে মালিকপক্ষ তালা দিয়ে রাখাতে শ্রমিকরা বের হতে পারেননি।
ওই কারখানার শ্রমিক ইসমাইলের ভাতিজা রফিক বলেন, কারখানা সব সময়ই তালা দেওয়া থাকতো। স্যাররা অনুমতি দিলে কেবল তখনই তালা খুলে দেওয়া হতো। আজ যদি তালা দেওয়া না থাকতো তাহলে শ্রমিকরা বের হয়ে আসতে পারতো। একই অভিযোগ করেন শ্রমিক সুমনের ভাই নাজিম। নাজিম বলেন, কারখানার মূল গেটে সবসময় তালা দেওয়া থাকতো। আমি যে কয়েকদিন গিয়েছি তালা দেখছি। দারোয়ানকে বললে ভেতরে গিয়ে আমার ভাইরে ডাইকা দিতো। এই তালার কারণে এতো মানুষ মারা গেলো (১০,০৯,২০১৬ বাংলানিউজ)।‘

অগ্নিকাণ্ডপরবর্তী কারখানার কর্তাদের কেউ কেউ বিবৃতি দেবেন। দিয়েছেনও। কারখানার মালিক সিলেট-৬ আসনের সাবেক সাংসদ সৈয়দ মকবুল হোসেন বলেন, ‘বয়লারে কোনো ত্রুটি ছিল কি না তিনি জানেন না। শেষ কবে বয়লার পরীক্ষা করা হয়েছে, তাও জানেন না তিনি। আজ কাজ শেষে কারখানা ছুটি হওয়ার কথা ছিল (প্রথম আলো, ১০.০৯.২০১৬)।‘ কারখানা মালিক কেন জানবেন না তার কারখানার বয়লার ত্রুটিপূর্ণ ছিল কি-না? তিনি কেন খোঁজ রাখবেন না তার বয়লার শেস কবে পরীক্ষা করা হয়েছে? যে বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়মিত বয়লার পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়ার কথা তারা কেন সেই রিপোর্ট দেয়নি? কেন সেই রিপোর্ট হালনাগাদ করা ছাড়া মালিক কারখানা চালাতে পেরেছে? বয়লার পরিদপ্তরের তাহলে কাজ কি? কেন তারা মোটা অংকের টাকায় বেতন নেন? তাদের বেতন কে বা কারা আপটুডেট করেন?….. এই অবসম্ভাবি প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর কেউ দেবেনা। এবং সেই উত্তর দেয়া ছাড়াই আরও একটি কারখানার দুর্ঘটনার জন্য শ্রমিকরা মানসিক প্রস্তুতি নেবে!

২৩ জন শ্রমিক মরে গেল। আরও হয়ত কয়েকজন ধুকে ধুকে মারা যাবেন। এই শ্রমিকদের পরিবার দুলাখ টাকা পেয়ে স্বজন হারানোর ব্যথা ভুলবেন হয়ত, কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর কেউ তলিয়ে দেখবেনা বা দেখার কথা মনেও আসবে না। এটাই এই ইতর সমাজের বাস্তবতা। এখানে দুই ধনীর মধ্যে যতই শেয়াল-কুকুরের মত বিবাদ-বিসম্বাদ থাকুক, শ্রমিককে পুড়িয়ে মারার পর তারা এবং সরকারের একাধিক বিভাগ একই সুরে কেত্তণ গাইতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জনগণের করের টাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালিয়েও গলদঘর্ম হয়ে তারা এই অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ‘বয়লার বিস্ফোরণে কারো হাত ছিলনা। এটা নিছক একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা’। বলাবাহুল্য ওই ‘শক্তিশালী’ তদন্ত কমিটিও নির্দিষ্ট সময় শেষে এরকমই একটি তদন্ত প্রতিবেদন (অশ্বডিম্ব ) প্রসব করবে। এটা প্রায় নিশ্চিত যে এই অগ্নিকাণ্ডে ২৩ জন পুলিশ মারা গেলে কিংবা ২৩ জন কর্মকর্তা পুড়ে গেলে অথবা ২৩ জন কেউকেটা ধনীক শ্রেণির লোক মারা গেলে বা নিছক আহত হলেও সারা দেশে তোড়পাড় শুরু হত! দেশের এমাথা-ওমাথা চষে দিগগজ পণ্ডিতেরা সল্যুশন বার করতেন, এবং রাতারাতি সেই সল্যুশন প্রয়োগ করা হত। আর কতদিন ধরে যে ওই ২৩ জনের জন্য কেঁদে কেটে বুক ভাসানো হত তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু অসহায় নিরুপায় ক্ষমতাহীন শ্রমিক মারা যাওয়াতে দুই নেত্রীর বিবৃতি, সরকারী কিছু হুমকি-ধামকি আর লাশ প্রতি লাখ দুয়েক টাকা ডিসবার্সমেন্টে সাবজেক্ট ক্লোজড।

আমরা জানি আমাদের এইসব কথা বার্তায় কেউ কান দেবেন না। আমরা এও জানি আমাদের এইসব প্রস্তাবনা কেউ ঘেটেও দেখবেন না। আমরা জানতে বাধ্য যে যতই শ্রমিকদের জন্য এটা-ওটা সাবধানতা অবলম্বন করতে বলি না কেন, দিন শেষে ওই দুটাকার সূতো-বোতাম-টিন-ফয়েল আর কলম-পেন্সিল ‘চুরি ঠেকাতে’ দরজা/কলাপসিবল গেট/ সদর দরজা সিকল দিয়ে তালা মারা থাকবে। মালিকদের এই ইতরসুলভ সামন্তবাদী মালিকানা দম্ভ তালাতেই নিরাপত্তা খুঁজবে। মালিকরা, পুলিশরা, সরকারের কর্তব্যক্তিরা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষরা শ্রমিকদেরকে ‘চোর’ ভেবে তালা দিয়ে রাখাকেই সমর্থন করবেন। কয়েকটি মাস গেলেই আর কেউ তালা মারার বিষয়টি মনে রাখবে না। আবারও আগুণ লেগে অগুনতি শ্রমিক পুড়ে মরবে। আবারও আমরা ফ্যা ফ্যা করে ‘তালা নিষিদ্ধ করুন’ বলে প্রলাপ বকতে থাকব…..। তাই কর্তাদের করকমলে নয়, আমরা শ্রমিকদের কয়েকটি কথা বলতে চাই।
১। সদর দরজায় তালা দেয়া কোনো কারখানায় কাজ করবেন না। কাজ না পেলে মাটি কাটুন, কুলি-মজুর হোন, গ্রামে যেয়ে কামলা খাটুন। কোনো কিছু না পেলে না খেয়ে থাকুন, তবুও তালা দেয়া কারখানায় কাজ করবেন না।
২। বেতন-বোনাস-ছুটির ন্যায্যতার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কাজ বন্ধ করে দিন। আপনারা সকলে কাজ বন্ধ করলে মালিক/সরকার/সরকারী বিভাগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য।
৩। প্রতিটি শ্রমিকের লাইফ ইন্সুরেন্স নিশ্চিত না হলে কাজ শুরু করবেন না।
৪। মনে রাখবেন, আপনি কাজ না করলে আরেকজন করবে বলে ভয় দেখিয়ে আপনাদেরকে কাজ করানো হয়। যদি সকল শ্রমিক পণ করেন যে এই তিনটি শর্ত পালিত না হলে কেউ কাজ করবে না, তাহলে মালিকপক্ষ বাধ্য হবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
৫। সরকার, মালিক, সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে বেতন-বোনাসের আন্দোলনের চেয়েও তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলুন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। নিজে বাঁচুন। পরিবারকে বাঁচান।
~~~~~~~~~
মনজুরুল হক
১০.০৯.২০১৬

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s