নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের ওপর তাণ্ডব একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ণের ডেমোনেস্ট্রেশন মাত্র!

14953891_10211121658703248_6431594851107065474_n
 
বাঁদরের হাতে লাঠি উঠলে বাঁদর কোনো মনিব-পাবলিক জ্ঞান করেনা। তেমনি জড় বুদ্ধির অর্ধশিক্ষিত, কুশিক্ষিত ভাবমুর্তিবাদীর হাতে ইলেকট্রনিকস ডিভাইস উঠলেও সে আধুনিক হয়ে যায় না, বরং অশিক্ষা-কুশিক্ষা-জড় বুদ্ধির মিশেলে ফ্যানাটিক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সে আইনজ্ঞ, ধর্মবেত্তা, আইন প্রয়োগকারী, বিচারক, শাস্তি বিধানকারী এবং তার ঠুনকো বিশ্বাস রক্ষার সোল এজেন্টও হয়ে ওঠে।
 
কড়কড়ে কারেন্সি নোটের গন্ধঅলা লাভের লোভে বাংলাদেশে আগ-পিছ বিবেচনা না করে এই ধরণের কোটি কোটি ‘ফ্যানাটিকের’ হাতে মোবাইল, ইন্টারনেট তুলে দেয়া হয়েছে। নির্ভুলভাবে একটি বাক্য বলতে না পারলেও হাতে ‘চাঁদ’ পাওয়া মূর্খ মুহূর্তেই উকিল, পীর, পুলিশ, বিচারপতি, জল্লাদ হয়ে উঠছে। আশঙ্কাজনকভাবে বাংলাদেশে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা প্রায় সত্তর থেকে আশি ভাগ!
 
আজকে কোনোওভাবে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ক্ষমতা দখল করুক কালকেই আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং অন্যান্য ‘গণতান্ত্রিক’ এবং ‘বাম’ দলগুলো থেকে সত্তর-আশি ভাগ নেতা-কর্মী কাছা-খোলা সমর্থন দিয়ে ঈমানী দায়িত্ব পালন করবে। আজকে সেক্যুলারিজম, মুক্তচিন্তা, প্রগতিশীলতা আর মুক্তিযুদ্ধ-টুদ্ধ নিয়ে ধরা ধাম কাঁপিয়ে দেয়া তালেবরই কালকে ওই ক্ষমতা দখলকারী দলে নাম লেখাতে লাইন দেবে! এতে ছাত্র-শিক্ষক, উকিল-মোক্তার, সায়েব-চাপরাশী, কেরাণী-অফিসার, ব্যাপারি-দোকানদার, আমলা-মিনিস্টার, নেতা-কর্মী, গাড়িঅলা-গাড়িছাড়া, হাটুরে-বাজারি, ইতর-ভদ্র কিংবা ধনী-দরিদ্র পার্থক্য থাকবে না।
 
সুতরাং সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি-সমতলীদেরকে হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, উচ্ছেদ করা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সবই নিজ ধর্মের, নিজ ইজমের, নিজ মজহাবের শ্রেষ্ঠত্ব এবং অপরের ধর্ম, বর্ণ, জাতকে নিকৃষ্টজ্ঞান থেকে উদ্ভুত। সে কারণে নিয়মিত এধরণের ক্রিমিনাল অফেন্স ঘটে গেলেও সরকারের তরফে ‘অপরাধী যে-ই হোক ছাড়া পাবেনা’, ‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেয়া হবেনা’, ‘অপরাধী যে দলেরই হোক তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে’র মত ইনস্ট্যান্ট বিবৃতি দেয়া এবং ‘আইওয়াশের’ এলিমেন্ট হিসেবে দু’চার জনকে বহিষ্কার-টহিষ্কার করা এবং একটা ঠুঁটো- জগন্নাথ মার্কা তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়া কার্যত কিছুই করে না। করবে না।
 
বাজারি উন্নয়নের তোড়ে কখন যে মূল্যবোধ, মানবিকতা, মনুষ্যত্ব, বিবেক-টিবেক বাণের জলে ভেসে গেছে সে খেয়াল করেনি কেউই। দরকারও নেই। টাকা হলেই হলো। সে টাকা কীভাবে এলো কে দেখে? ওইরকম উন্নয়নের জজবায় এইসব সংখ্যালঘু হিন্দুর বাড়িতে আগুন দেয়া, তাদেরকে উচ্ছেদ করা, তাদের সঙ্গে ইতরসুলভ আচরণ করার ঘটনাগুলো সমাজের মূলস্রোতে কোনো প্রভাব ফেলে না। যদিওবা প্রচার হয়, সেখানেও গায়ের জোরের ব্যাখ্যা হাজির। সেখানেও অন্যায়ভাবে সংখ্যাগুরুর ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় উদ্ধতভাবে। এবং বিস্ময়করভাবে এই নিকৃষ্ট অপরাধগুলো সংঘটিত হয় দেশের সকল নির্বাহী প্রধানদের চোখের সামনে!
 
নাস্তিক, নাসারা, মুরতাদ আখ্যা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা, ব্লাসফেমি জারির চাপ, সমাজকে ধর্মীয় লেবাস পরানোর চাপ আর সংখ্যালঘু হত্যা করে, নিপীড়ন করে, অত্যাচার করে, ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং তার সম্পত্তি দখল করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এবং ‘ভোটের রাজনীতি’ নামক এক সুবিধাবাদী টার্মের কারণে ওই সকল ‘নিজস্ব’ ভোটারকে ক্ষমতাসীনরাও তোয়াজ করে চলে। ওরাও সেই তোয়াজের বলে বলিয়ান হয়ে যা-খুশি করতে পারে। ক্ষমতার দম্ভে খোদ মন্ত্রিও অত্যাচারিত হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে ভৎর্সনা করেন খুলে আম! তারও কোনো বিচার হয়না।
 
এসব দেখে মনে হয় সরকার এই ব্যাপারগুলোকে ‘তেমন বড় কিছু নয়’ ভেবেই গা-করে না। সরকার যে এমনই করবে বা ভাববে সেটা যেন প্রশাসন আগে-ভাগেই বুঝে ফেলে! তাই তারাও নির্লজ্জের মত ক্রিমিনালদের সঙ্গে গলা মেলায়, অপরাধীকে আড়াল করে এবং কেস টেস হলে তা হিমঘরে পচিয়ে দেয়।
 
এই সব অন্যায়ের প্রতিকার কী? এই প্রশ্নটির একেবারে নিরীহ উত্তর হলো- নেই। কোনো প্রতিকার নেই। মিডিয়ার চাপে দুএকজনকে ‘ক্লোজড’ আর দুচারজন দলীয় লোককে সাময়ীক বহিষ্কার ছাড়া আর কিছুই হবার নয়। কারণ কি? কারণ দেশে কোনো বিরোধী দল নেই। দেশে কোনো শক্তিশালী অপোনেন্ট নেই। দেশে কোনো গণতান্ত্রিক অনুশীলন নেই। দেশে কোনো নিরপেক্ষ বিচার নেই। এবং কোথাও কোনো জবাবদিহিতাও নেই। এই অমানিশাকালকে প্রতিহত করবার জন্য, এইসব অন্যায় রুখে দেবার জন্য, এই নির্লিপ্ত শয়তানীকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত কোনো শক্তিশালী জনগণের পার্টিও দেশে নেই!
 
সুতরাং নির্মমতা, অত্যাচার-অবিচার, নিপীড়ন-নির্যাতন সয়ে নেয়া ছাড়া সংখ্যালঘুদের সামনে আর মাত্র দুটি পথ খোলা। এক. দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। দুই. জন্মভূমিতে নিজের বসবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয় প্রতিরোধে নামা। মনে রাখতে হবে পৃথিবীর আদিমতম লড়াইয়ের নাম বেঁচে থাকার লড়াই। আজ থেকে সহস্র বছর আগেও কেউ আপষে বাঁচতে দেয়নি, এখনো দিচ্ছে না, ভবিষ্যতেও দেবে না। সুতরাং বাঁচতে হলে লড়তে হবে। সেই লড়াইয়ে খুব ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও এখনো কেউ কেউ পাশে দাঁড়াবে। এখনো সব কিছু একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।
————————
৫ নভেম্বর, ২০১৬

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s