জাত-ধর্ম নয়, রোহিঙ্গাদেরকে অসহায় মানুষ হিসেবে ভাবতে পারছি না কেন?

rohingya-01

1409547009rohingyas-save benqt60_1352366028_1-muslims-burma

বাংলাদেশে ৫ লাখ রোহিঙ্গা ‘অবৈধভাবে’ বসবাস করছে না ‘বৈধভাবে’ বসবাস করছে সেটা এই মুহূর্তের আলোচিত বিষয় নয়। ঠিক এই মুহূর্তে বিবেকের তাড়নাতেই অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। অথচ আমাদের সরকার ঠিক তার বিপরীত কাজটি করছেন। রোহিঙ্গারা আদতে বাংলাদেশি বংশদ্ভুত কি-না সেটার কোনো নৃতাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণ হয়নি। কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণাও হয়নি। আরোপটি এককভাবে মিয়ানমার দিয়ে আসছে। বাংলাদেশও বরাবরই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি মুসলমান বা বাঙালি বলে স্বীকার করেনি। এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদর উপর মরণঘাতি আক্রমণের অজুহাত হিসেবে মিয়ানমার সরকার সোজাসাপ্টা ‘অনুপ্রবেশকারী’ খেদাও কর্মসূচী বলতে পারে। এবং রোহিঙ্গারা আরাকান থেকে বিতাড়িত, অত্যাচারিত, নিপীড়িত হয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাইলে বাংলাদেশও তাদেরকে অস্বীকার করে। এমন দুর্ভাগা জাতি বিশ্বে আর একটিও নেই!

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। মায়ানমার সরকার ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, রোহিঙ্গারা তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। মিয়ানমার সরকার মনে করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী, যারা বর্তমানে অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে।  রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে এবং সেটা ইতিহাসেই লিপিবদ্ধ।

ধারণা করা হয় সপ্তম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়।  ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানী, বার্মিজ, বাঙালী, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভুত এই শংকর জাতি হিসেবে চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের রাজ্য ছিল।

মিয়ানমার সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা ভারতীয়, বাঙালী ও চাঁটগাইয়া সেটলার, ব্রিটিশরা ওদেরকে আরাকানে এনেছে। অথচ ইতিহাসেই এটি প্রতিষ্ঠত যে, ব্রিটিশরা বার্মায় শাসক হিসেবে আসার কয়েক শতাব্দী আগে হতেই রোহিঙ্গারা আরাকানে পরিষ্কার জাতি হিসেবে বিকশিত হয়েছিল।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করায় সকল প্রকার নাগরিক ও মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারে ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য পরিচয় পত্র থাকাটা খু্ব জরুরি বিষয়। কিন্তু মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয় পত্র ইস্যু করে না, ফলে, এমনিতেই পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা আরো পিছিয়ে পড়ছে।

মিয়ানমার সরকারের ভূমি ও সম্পত্তি আইনে কোনো বিদেশী সম্পত্তি ও ভূমি কিনতে পারেনা। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ অভিবাসী তথা, বিদেশী। তাই, রোহিঙ্গারাও কোন ভূমি বা স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারেনি। বর্তমানে যেসকল ভূমিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে, মিয়ানমার সরকার যেকোন মুহুর্তে সেগুলো দখল করে নিতে পারে। এবং এখনকার নির্বিচার আক্রমণও ওই ‘অবৈধ’ বসবাসের অজুহাতে।

রোহিঙ্গারা সরকারী চাকরি করতে পারে না, সরকারী কোন সেবাও পায় না রোহিঙ্গারা। সরকারী চিকিৎসা সেবা পায় না।  সেবা খাত (বিদ্যুত, পানি, জ্বালানী) জন্য আবেদন করতে পারে না, ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে না, রোহিঙ্গা হিসেবে তাদের সন্তানদের স্কুৃলে ভর্তি করতে পারেনা। আর তাই প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গা অক্ষরজ্ঞানহীন।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষ ধরণের ব্যবস্থা করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশেষ বসবাসের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা থেকে ওরা অনুমতি ছাড়া বের হতে পারে না। এটা অনেকটা সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালিন ইহুদীদের বিরুদ্ধে করা নাজি আইনের মত! সে সময় ইহুদীদের হাতে হলুদ রঙের ব্যাজ পরিয়ে দেয়া হতো। তাদের জন্য অবাধে সকল স্থানে যাওয়ার বারণ ছিল। এভাবেই ‘দাস’ হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করে রোহিঙ্গারা।

এসবের মধ্যে প্রায় নিয়ম করে মিয়ানমার সরকার তাদের ‘নিজস্ব জমি’ থেকে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ করে। এক অঞ্চল থেকে উচ্ছেদ হয়ে ওরা আরেক অঞ্চলে যায়। সেখানেও তাড়া খেয়ে ভারতে এবং বাংলাদেশে আসে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ফের মিয়ানমার সরকার ‘এ্যাথেনিক ক্লিনজিং’ শুরু করেছে। প্রথম চেষ্টাতেই ৬৯ জন রোহিঙ্গা হত্যা করেছে। পরের ধাপে আরও ২২ জন। এভাবে প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সেই সাথে রয়েছে কাদানে গ্যাস, ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, ধর্ষণ।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত চৌকিতে কড়া সতর্ক পাহারায় রয়েছে তারা। টহল জোরদার ছাড়াও সীমান্তে বিজিবির সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ মোকাবেলায় সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদেরও সহায়তা নিচ্ছে বিজিবি। পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছেন এমন অন্তত ৮৬ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিজিবির দায়িত্বশীল সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বিদেশি গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত ৯ অক্টোবর থেকে রাখাইনে নির্মম সেনা অভিযান চলছে। এতে অনেক রোহিঙ্গা হতাহত হয়েছেন, শিশুরাও রেহাই পায়নি। প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। মিয়ানমারের সেনা অভিযানের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিজিবি বাড়তি এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে (সমকাল, ১৮.১১.২০১৬)।‘

এদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

‘মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য বাংলাদেশ যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সে সম্পর্কেও বলেছে সংস্থাটি। ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে মানুষদের নিয়ম অনুযায়ী রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে সেখানকার সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছে (কালের কণ্ঠ, ১৮.১১.২০১৬)।‘

তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল? মিয়ানমার তার ‘ভ্যালুলেস’, কথিত অনুপ্রবেশকারী দরিদ্র নাগরিকদেরকে এথেনিক ক্লিনজিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করে দেশছাড়া করছে। অসহায় রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটে আসে বাংলাদেশে ঢুকে অন্তত প্রাণটা বাঁচাবে বলে। এবং বাংলাদেশ তাদেরকে ঢুকতে না দিয়ে সেই দেশেই ফেরৎ পাঠাচ্ছে যে দেশ তাদেরকে অস্বীকার করছে! তাহলে এই নির্যাতিত প্রাণভয়ে ভীত মানুষগুলো কোথায় যাবে? জাতিসংঘ তো মুখস্ত বুলি উগরে দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়েছে। তারা মিয়ানমারকে মৃদু ভৎর্সনা করেছে, আবার বাংলাদেশকে নসিয়ত করেছে তারা যেন সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়! কেন? কেন জাতিসংঘ মিয়ানমারকে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার জন্য বাধ্য করতে পারেনা? কেন তারা রোহিঙ্গাদের জন্য অন্য কোনো সম্পদশালী দেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেনা? রোহিঙ্গা মুসলমান বলে তারা কেনই বা ভারতে আশ্রয় পাবে না?

প্রায় ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কক্সবাজার টেকনাফে বসবাস করে আসছে। তারা এদেশে জাল ভোটার হয়ে ভোট বিক্রি থেকে অসামাজিক অনেক কাজকম্ম করেছে। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের ক্রিড়ানক হয়ে অনেক অপকর্মও করেছে। তাদের কারণে ওই অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়নি। এই অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটির সত্যতা আছে। তার পরও রোহিঙ্গারা যখন কামানের গোলার মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটে আসে তখন তাদেরকে ধরে ধরে পুশব্যাক করা অমানবিক। তারা মুসলমান কিংবা বাঙালি অথবা আরাকানী যা-ই হোন তাদের এখন প্রাণ সংশয়ে। এই অবস্থায় তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া কোনো মানবিক কাজ হতে পারে না। আমাদের যত কষ্টই হোক আমাদের কর্তব্য হবে এই অসহায় মানুষগুলোকে আশ্রয় দেয়া। বাঁচার সুযোগ দেয়া। ইত্যবসরে আমরা দূতিয়ালি করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারি। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলও আমাদের পাশে থাকবে।

মনজুরুল হক

২০.১১.২০১৬

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s