বিরাজনীতিকরণ আর ধর্মীয়করণে ক্ষতবিক্ষত এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

 

12220_10151171692356769_79098550_nবাংলাদেশের ইতিহাসে নিকৃষ্টতম বিরাজনীতিকরণের মওসুম চলছে গত এক যুগ ধরে, যা গত পাঁচ-ছ’ বছরে পূর্ণতা পেয়েছে। কীভাবে বিরাজনীতিকরণ, কীভাবে ন্যুনতম মূল্যবোধের অবলুপ্তি সে খতিয়ান বিরাট লম্বা, দরকার নেই। সংক্ষেপে-
১। যে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐতিহ্যগতভাবে অন্যায়-অবিচার, স্বৈরশাসন, আগ্রাসন রুখে দিয়েছে সেই ছাত্র সংগঠনগুলো স্থবির। দেড় যুগ ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। সরকারী সংগঠন সরকারেরই আরেকটি ‘টুলস’ হয়ে নিপীড়ক। বিরোধী ছাত্র সংগঠন জাতীয় স্তরে ভূমিকার রাখতে সক্ষম নয়। কার্যত ‘ক্লাবম্যানশিপ’ দশায় নিমজ্জিত।

২। কৃষক-শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়ার আন্দোলনে বিদেশি শাসকদের চেয়েও ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন করায় কৃষক-শ্রমিকের স্বাভাবিক সাহসীকতা নষ্ট হয়ে গেছে। যে বাম সংগঠনগুলো নাম কা ওয়াস্তে তাদের মুক্তির কথা বলছে তারা ক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে বেতন, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবীতে সীমাবদ্ধ রেখেছে। সে কারণে শ্রমিক-কৃষকের চিরায়ত সৃজনশীলতাও সুবিধাবাদী রূপ পেয়েছে।

৩। শিক্ষা- সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং রাষ্ট্র কাঠামোর সকল ইন্সটিটিউটগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এমন কোনো একটি প্রতিষ্ঠান নেই যেখান থেকে সমাজ পরিবর্তনের ডাক আসতে পারে! এমন একটি দল কিংবা জোট নেই যারা মানুষের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তির সর্বব্যাপী কর্মসূচি দিতে পারে!

৪। শিক্ষা- সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাষ্ট্র কাঠামো, রাষ্ট্রের কড়ে-বর্গা, কল-কব্জা, রাষ্ট্রের একেবারে শীর্ষ থেকে প্রান্তিক পর্যন্ত বিরাজনীতিকরণ এবং রাজনৈতিক ঘৃণা এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে যার প্রভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম রাজনীতিবিমূখ হয়ে, রাজনীতিকে ঘৃণা করে আর এক নতুন রাজনীতির চর্চা করছে, যার জন্ম হয়েছে কর্পোরেট ইঙ্কুবেটরে শাসকশ্রেণির ঐকান্তিক চেষ্টায়। শাসকশ্রেণি এই প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞে এতটাই ‘সফল’ যে দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ কোনো একটি বিষয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানালেও সরকার ভীত হয় না! কারণ সরকার জানে এই চ্যালেঞ্জ দিন শেষে সামান্য স্বার্থে বিক্রি হবে। হবেই।
কর্পোরেট দোকানদাররা এই মাহেন্দ্রকক্ষণটির জন্যই বছরের পর বছর ম্যানেজারিয়াল গাধা পয়দা প্রকল্পে লগ্নি করেছে। একের পর এক ভ্যালুজগুলোকে চোখের সামনে ‘হত্যা’ করেছে, হত্যা হতে দিয়েছে। রাষ্ট্র, সরকার আর কর্পোরেট দঙ্গল এক হয়ে আজকের এই “কোনো কিছুতেই কোনো কিছু হবেনা” কালচার সফলভাবে চালু করতে পেরেছে। যার বাইপ্রডাক্ট তিন তিনটি গুড ফর নাথিং প্রজন্ম।

দেশে এখন বিরোধী দল নেই। সেমি বিরোধী দল নেই। কমিউনিস্ট শক্তি নেই। সশস্ত্র সংগ্রামের কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেই। সংঘবদ্ধ কৃষক-শ্রমিকের দল নেই। মধ্যবিত্তের শক্তিশালী সিভিল সোসাইটিও নেই। এই সবই কিন্তু কাগজে-কলমে আছে, কিন্তু বাস্তবে নেই। এই যে ‘নেই’ সেটাই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় এ্যাচিভমেন্ট। The great achievement of political demolition!

আজকের যে প্রাথমিক শিক্ষার ভজগট নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে সেটা কি নিছক ভুল? মোটেই নয়। জেনে-বুঝে এই ‘রিফর্ম’ করা হয়েছে। খেলাফত মজলিশ-এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের করা সেই চুক্তিই (আব্দুল জলিলের) প্রমাণ দেয় সরকার শিক্ষাকে ‘ইসলামিকরণে’ কতটা উৎসাহী। সিম্পল ইকোয়েশন- বিএনপি-জামাতের কার্যত কোমর ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। তার পরও তারা জনগণকে একত্রিত করে বড় ধরণের আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারে। শাসক জোট ভালো করেই বোঝে জনগণের মোটিফ কী? সেক্ষেত্রে প্রিকোশন হিসেবে এমন কাজ করা উচিৎ যা বিএনপি-জামাত ক্ষমতা দখল করার পর করবে। সেই কাজটাই (সর্বক্ষেত্রে ইসলামীকরণ, ধর্মীয়করণ, মাদ্রাসা শিক্ষা, মাদ্রাসাভিত্তিক জনগোষ্ঠি, ধর্মাশ্রয়ী জনগোষ্ঠি, ক্ষমতা দেখাতে পারে এমন মৌলবাদী গোষ্ঠি, বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা, ফতোয়াধারী, ফতোয়া প্রদানকারী এবং সমাজে প্রভাব আছে এমন গোষ্ঠির ‘প্রেসক্রিপশন’ মেনে তাদের পছন্দ মত পরিচালন- শাসন-শোষণ) তারা করে ফেলছেন। নিজেদের শাসনের-ক্ষমতারা কোনো বত্যয় না ঘটিয়ে, অর্থনৈতিক লোকসান না করে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশের বিরাগভাজন হয়ে ব্যাপক বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে খুশি করার এরচে’ ভালো পদ্ধতি আর কি হতে পারে? আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের এই ‘ইতিবাচক’ ভূমিকা দেখে যে ধর্মাশ্রয়ী জনগোষ্ঠি কিছুদিন আগেও ‘জালেম সরকার’, ‘ভারতের দালাল সরকার’ বলে ভৎর্সনা করত তারা এখন স্তৃতি গাইছে! মুবারকবাদ জানাচ্ছে! এ অবস্থায় এরাও আর সরকারবিরোধী ‘শাপলাঘেরাও’ করতে উৎসাহী হবে না। রাজনৈতিকভাবে এ হেন কূটকৌশল প্রয়োগ করতে পারায় মহাজোটের পথের সকল কাটা দূর হয়েছে, হচ্ছে, হবে।

তার পরও এন্ড অব দ্য ডে একটা শঙ্কা নিয়েই মানুষ রাতে ঘুমুতে যায়- কেউ জানে না কালকের সকালটা কোন রূপে উদয় হবে?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s