সরকারের নৈতিক শক্তি তো আগেই হারিয়েছে, এখন সিন্ডিকেটের সামনে প্রশাসনিক শক্তিও প্রশ্নবিদ্ধ

 

 

সরকারের নৈতিক শক্তি তো আগেই হারিয়েছে, এখন সিন্ডিকেটের সামনে প্রশাসনিক শক্তিও প্রশ্নবিদ্ধ
————————————————————————————–
 
কোনো সলিড কারণ ছাড়াই যখন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছিল তখনই আমরা যারা নির্দিষ্ট অংকের টাকা রোজগার করি না তারা প্রমাদ গুণেছিলাম। আশঙ্কা করেছিলাম মুদ্রস্ফীতির। তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখিও হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ লেখক, বুদ্ধিজীবী, সুশীলগণ বেতন বৃদ্ধিকে আবশ্যিক ভেবেছেন। বিশাল অংশের মানুষ মনে করেছেন বেতন বৃদ্ধি প্রত্যাশিত এবং এটা আরও অনেক আগেই বাড়ানো উচিৎ ছিল। এই অভাজনের মত খুব কম লোক ছিল যারা মনে করেছিলেন বেতন বাড়ানোর ব্যাকফায়ার হবেই। সেই ব্যাকফায়ারের আফটার শকে কে কিভাবে ছিটকে পড়বে সেটাই দেখার বিষয়।
 
বলা বাহুল্য ব্যাকফায়ার হয়েছে। ব্যাকফায়ারের আফটারশকে শুধু ওই সৌভাগ্যবান ২২ লাখ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী আঁতকে ওঠেননি, সমগ্র জাতি বিধ্বস্ত হয়েছে। ওই ২২ লাখের সাথে সঙ্গতি রাখার জন্য বেসরকারী, আধাসরকারী, স্বায়ত্বশাসিত, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানোর দাবী উঠেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কিছু পরিমানে হলেও বেড়েছে।
 
অর্থনীতির কমন সূত্রানুযায়ী মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে পণ্যমূল্য বাড়বে। বাড়বেই। তা সে যতই প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশী পণ্যে মওজুদ থাকুক না কেন। যেমন বাড়ি ভাড়া। বাড়ির মওজুদ কিন্তু কম নেই। বাড়ির কোনো ঘাটতিও নেই। এই শহরে হাজার হাজার বাড়ি একদু’মাস খালি পড়ে থাকে। তার পরও বেতন বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে। তারপর একে একে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানী তেল, গ্যাস, কাপড়-চোপড়, ওষুধপত্তর, শিক্ষা উপকরণ, চিকিৎসা ব্যয়, খাদ্য পণ্য, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক থেকে শুরু করে জীবন-যাপনে ব্যবহার্য সকল কিছুর দাম বেড়েছে। এবং সেই অর্থনীতির সূত্রানুযায়ীই কমে গেছে মনুষ্য মূল্য। এখন সব চেয়ে কম দামী ‘পণ্য’ মানুষ। বিশেষ করে গরিব মানুষ। আক্ষরিক অর্থেই এদের নিয়ে কেনা-বেচা চলে!
 
গত কয়েক বছরে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম কি হারে বেড়েছে তা সাধারণ মানুষের নজরে আসেনি। আসবে না, কারণ অনেক মানুষই আছেন যাদের সে সব কিনতে হয় না। ভাবতে বিস্ময় জাগে, একটি দুস্প্রাপ্য ইনজেকশনের দাম ৮ হাজার টাকা! যাক। এসব বহুমূল্য ওষুধের কথা থাকুক। বরং নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের হাল হকিকত বলা যাক।
 
‘গরিবের আমিষ’ খ্যাত মুসুরির ডাল ১২০-১৩০ টাকা। মুগ ডাল ১৭০ টাকা। ছোলা ডাল ১০০ টাকা। গুড়ো দুধ ৫৫০ টাকা। গন্ধ সাবান ৪৮ টাকা। লবন ৪৫ টাকা। সয়াবিন তেল ১২০-১২৫ টাকা। চিনি ৬৫-৭০ টাকা। মোটা চাল ৫২-৫৪ টাকা। মিনিকেট বা চিকন চাল ৭০-৭২ টাকা। আটা ৩৪ টাকা। পেয়াজ ৩৫ টাকা। রসুন ১৫০ টাকা। জিরা ৮০০ টাকা। হলুদের গুড়ো ৩২০ টাকা। মুড়ি ১২০ টাকা। চিড়া ৬৫ টাকা। একটা ডাব ৫০-৬০ টাকা। কাচা পেঁপে ৪০ টাকা। সস্তা পাঙ্গাস মাছ ১৪০-১৫০ টাকা। পুঁইশাক ৪৫-৫০ টাকা। কচুর মুখি ৪০-৫০ টাকা।
 
এই সকল পণ্যের ভেতর অত্যাবশ্যক পণ্য কয়েকটি। চাল-ডাল, আটা-ময়দা, খাবার তেল, জ্বালানি তেল, নুন, কাচা মরিচ, মাছ-তরকারী, ওষুধ, কাপড়-চোপড় এবং ঘরভাড়া। অন্ততপক্ষে এই কয়েকটি পণ্যের দাম নাগালে থাকলে আপনি দেশ বেঁচে দিলেন না বন্ধক রাখলেন ওরা খোঁজ নেবে না। আপনি নোবেল পেলেন না অস্কার পেলেন তা নিয়েও ওদের শিরপীড়া নেই। আপনি দেশের প্রায় অর্ধেকটা দখল করে নিলেন কি না তা নিয়েও ওদের কপালের শিরা দপ দপ করে না। কিন্তু এত বড় ‘মওকার’ পরও ওই গরিব নিঝঞ্ঝাট সাতে-পাঁচে না থাকা, অল্পেতে তুষ্ট মানুষগুলোর কথা ভাবল না এই রাষ্ট্র। তার বদলে কি হল?
 
এই রাষ্ট্র যারা পরিচালন করেন সেই শাসক শ্রেণি তাদের শ্রেণিগত অবস্থানের কারণেই ধনিক শ্রেণি, সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশ, ক্ষমতাবান শ্রেণি, বুর্জোয়া, মৌলবাদী, ধর্মাশ্রয়ী, সাম্রাজ্যবাদের দালাল শ্রেণিসহ সমাজের গাভার্নিং ক্লাস বা শীর্ষ ক্ষমতাবান শ্রেণিকে তোষণ করে। এটা রেগুলেশন, তবে বর্তমান ক্ষমতাসীন শ্রেণি সেই তোষণকে ‘রেগুলেশন কনটেম্পোরারী এবং ম্যান্ডেটরী করেছে।’ তারা এই শ্রেণিগুলোকে তোষণ করে, আসকারা দিয়ে, পক্ষাপাতিত্ব করে, ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের হয়ে দালালি করে, তাদের কাছে ‘সুখদায়ক জিম্মি’ হয়ে, তাদের ‘কমিশন এজেন্ট’ হয়ে, তাদের স্টেকহোল্ডার হিসেবেই বিরাজমান। এদের এই পক্ষপাতিত্ব বা সুখের জিম্মি হওয়া এতটাই নগ্ন যে তা দেখার জন্য কোনো কোশেশ করতে হয় না। চোখ খুললেই দেখা যায়।
 
অনেক প্রস্থ উদাহরণ দেয়ার আবশ্যকতা নেই। সামান্য কয়েকটি উদাহরণঃ
 
১। দেশে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সরাসরি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। সরকার কোনোভাবেও তাদের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারেনি। পারছে না। তারা যা-খুশি করেছে। করছে। করবে। তারা যদি বলে প্রতি কিলোমিটার বাস ভাড়া ১০ টা! তো সেটাই সই। তারা যদি বলে এই মুহূর্ত থেকে যানবাহন বন্ধ। তো সত্যিই বন্ধ। সরকারের এমন কোনো বিকল্প নেই যে তা দিয়ে এই জিম্মিদশা থেকে বেরুতে পারবে। এখন চালের বাজার আগুন। সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে পরিবহন মালিকরা। তারা গড়ে ৩৫% ভাড়া বাড়িয়েছে রাস্তাঘাট খারাপ এবং যাজটের অজুহাতে!
 
২। তৈরি পোশাক শিল্পের মালিক সিন্ডিকেট প্রকারন্তরে সরকারের প্যারালাল! তারা মনে করে তারাই দেশের লাইফ লাইন! তাদের আয় করা ডলার দিয়েই সরকার বাজেট বানায়। তাদের আয় করা টাকা দিয়ে দেশের ৩০ লাখ শ্রমিকের পেট চলে। তারা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে বলেই সেই মুদ্রায় সরকার পণ্য আমদানী করে। তারা দেশের ‘প্রধান ধমনী’! আর সে কারণে তারা সঠিক হারে ট্যাক্স দেয় না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দেয় না। পানি-গ্যাস-বিদ্যুতের ন্যায্য বিল দেয় না। শ্রমিকের পাওনা টাকার অংক বিশাল হয়ে গেলে আগুন দিয়ে কারখানা পুড়িয়ে শ্রমিক হত্যা করে। পরিবেশ বৈরি স্থাপনা দিয়ে দেশের পরিবেশ নষ্ট করে। আয় করা বিদেশি মুদ্রা বিদেশেই পাচার করে। ইউরোপ-আমেরিকার পশ এলাকায় বাড়ি কেনে। ছেলে-মেয়েকে বিদেশে পড়ায়। নিয়মিত মানি লন্ডারিং করে। সরকারের ন্যায্য শুল্ক, কর, আবগারি, আইডিএলসি, ভ্যাট দেয় না। তার পরও এই মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব শুরু হলে সরকার সকল শক্তি দিয়ে মালিকদের পক্ষেই দাঁড়ায় শুধু না, মালিকদের হয়ে শ্রমিক পেটায়, আহত করে নিহত করে, চাকরিচ্যুত করে, উচ্ছেদ করে।
 
৩। তৃতীয় জিম্মিকরণ শক্তিটি দেশের ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠি। তারা একাত্তরে যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে, ২০১৭ তে এসেও তাই করছে। সরাসরি সরকারকে সরকারের মন্ত্রিদেরকে, দেশের বুদ্ধিজীবীদের, প্রগতিশীলদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, দিচ্ছে। তারা এমন সব নিয়ম কানুন চাপিয়ে দিতে চাইছে যা কোনো সভ্য দেশে লাগু হতে পারে না। এমন সব অন্ধকার নিয়ম-কানুন বলবত করতে চাইছে যাতে করে দেশের নারী সমাজ তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়ে। তথাকথিত ভোটের আশায় এই জঙ্গি আধাজঙ্গি সেমিজঙ্গি উগ্রবাদী গোষ্ঠিকে আসকারা দিতে দিতে তারা এখন নিজেদেরকে ওই গার্মেন্ট মালিকদের মত ‘সরকারের প্যারালাল’ ভাবে! পাঠ্য সূচি পরিবর্তন করে ‘মুসলমানিত্ব’ আনা হয়েছে। পাঠ্য সূচিতে সাম্প্রদায়ীক বিষ বাষ্প ঢোকানো হয়েছে। পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে হিন্দু-মুসলিম-এ ভাগ করে ফেলা হয়েছে। এই গোষ্ঠি একবার ঢাকাসহ পুরো দেশ জিম্মি করেছিল। তারা যে আবারও করবে সেটা না বোঝা মানে তাদের জিম্মি করাকে সমর্থন যোগানো।
 
৪। চতুর্থ জিম্মি করল চালকলমালিকেরা। তারা সরাসরি সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেল। সরকারের চোখের সামনে, সরকারের সকল ক্ষমতাকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে, সরকারের শক্তিকে তুচ্ছজ্ঞান করে তারা চালের দাম বাড়িয়ে এখন আবার ‘সমঝোতা বৈঠক’ করে তাদের বাড়ানোকে জায়েজ করিয়ে নিল! তারা কার্যত সরকারকে ‘নাখে খত’ দিতে বাধ্য করল। সরকারও অনেক অনুনয়-নিনিনয় করে কেজি প্রতি ২/৩ টাকা দাম কমাবে বলে প্রতিশ্রুতি নিয়ে সেটাকেই বিরাট এ্যাচিভমেন্ট ভেবে বোকাবাক্সে ঢেঁড়া পেটালো। তাদের দাবীর কাছে মাথা নত করে তাদের প্রতিটি মর্ত মেনে আরও একবার সাধারণ মানুষকে গিনিপিগ বানাল। এখন থেকে সরকারকে বিশেষ করে সরকারের খাদ্য নীতিকে তাদের কথা মতই চালাতে হবে।
 
৫। সর্বশেষ শক্তিশালী জিম্মিকরণ শক্তি সরকারের বিচভিন্ন অংগ সংগঠন এবং সরকারের এক নম্বর ‘পাহারাদার’ পুলিশ। সরকার জনকল্যাণে (!) যত ক্ষুদ্রই হোক, কোনো নীতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে, ভালো কিছু করতে চাইলে তার অন্যতম বাগড়া ঘটায় এই পুলিশ। যাদেরকে অবিলম্বে ধরে বিচারের আওতায় আনা দরকার তারা চোখের সামনে হেঁটে বেড়ালেও পুলিশ তাদের খুঁজে পায় না। ধরতে পারে না। আর যারা সরকারের সামান্যতম সমালোচনা করে, ন্যায্য দাবী জানায়, প্রাপ্য আদায় করতে চায়, সরকারের দমন নীতির বিরোধীতা করে এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সরকার বিরোধীতা করলে তাদেরকে খুঁজে পেতে হয় না পুলিশের। পুলিশ ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই যেন তাদের ধরে ফেলতে পারে। পিটিয়ে হাড় ভাঙ্গা, গ্রেপ্তার, পিপারস্প্রে, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া, লাঠিচার্জ, তারা করে খালে ফেলার মত ত্বরিত অ্যাকশনে কোনো বিরক্তি নেই পুলিশের। সরকারের হয়ে জনগণের একেবারে সরাসরি মুখোমুখি মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দন্ডায়মান পুলিশই সরকারের প্রতিভূ হিসেবে যেন আরেকটি ‘শ্যাডো সরকার।‘
 
আর এইসকল মহাশক্তিধর শক্তিগুলোর সম্মিলিত শক্তিকে ব্যবহার করে শাসন চালানোকেই সরকার চালানো বলা যেতে পারে। এভাবেই চলে সরকার। সংঘবদ্ধ শক্তিগুলোর কাছে জনসাধারণকে জিম্মি হতে দিয়ে তাদের কাছে অনুরোধ করা ছাড়া শক্ত কিছু করতে পারে না সরকার। এটাই এই সময়ের অন্যতম ট্রাজিডি। অন্যভাবে বলা যেতে পারে সরকার তো জিম্মি হয় না। সরকার আসলে এদের রক্ষা করে। কলেবরে বাড়তে দেয়। বিকোশিত করে এবং এদের সহায়তায় নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করে।
 
ঢাকা।
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s