চিনিকল বন্ধ করে সূতা চাষ! পেছনে অনেকগুলো পাকামাথা

 

চিনিকলগুলো বন্ধ করার পর সেগুলো দশা এমন হবে!

 

অর্থমন্ত্রী হলে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে শত সহস্র কোটি টাকা তসরূপ হলে তাকে কিছু বলতেই হয়। সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকগুলো প্রায় দেউলিয়া হতে বসলেও তাকে দুচারটা বাণী দিতেই হয়। আর ফি বছর বাজেট নিয়ে তার জ্ঞানের বহর ঝালিয়েও নিতে হয় সেটা তো রেগুলেশন অব ওয়ার্ক।

কিন্তু অর্থমন্ত্রী হলেই তাকে ‘নস্ট্রাদামুস’ হতে হবে কে বলেছে? তাকে গার্মেন্ট শিল্পের বিরাট উর্দ্ধারকারী এবং সমঝদারই বা সাজতে হবে কেন?

‘গ্লোবাল কটন সামিট ২০১৮’এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেছেনঃ

“আখের জমিতে আখ চাষ বন্ধ করে তুলা চাষ করা উচিত। এতে দেশের তুলার চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে (অফ দ্য রেকর্ড তিনি আরও বলেছেন; আখ চাষ একটা লুজিং কনসার্ন, কমিপ্লিটলি লুজিং, ইমিডিয়েটলি এসব বন্ধ করে দিতে হবে)।

মুহিত বলেন, আখ চাষ খুবই ব্যয়বহুল। সুতরাং এ শিল্পটি মারা যাবে। দীর্ঘদিন ধরেই আখ শিল্প অলাভজনক। আমাদের উচিত হবে আখ চাষ থেকে বেরিয়ে আসা। আমি মনে করি আখ চাষ বন্ধ করে ওই জমিতে তুলা চাষ করা যেতে পারে। এতে আমরা বৃহৎ পরিমাণে তুলা উপাদন করতে পারবো।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে তুলা উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট জমি নেই, সে জন্য দেশীয়ভাবে কটনের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। চিনি ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদন বন্ধ করে এসব জমিতে তুলা চাষ করা উচিৎ। কেননা দেশীয়ভাবে চিনি উৎপাদন লাভজনক নয় (চ্যানেল আই অনলাইন ২৩.০২.২০১৮)

মন্ত্রির এই মনগড়া বক্তব্যের ক্রম অনুসারে জবাব দেয়া যাকঃ

এক. তিনি বলেছেন; “আখের জমিতে আখ চাষ বন্ধ করে তুলা চাষ করা উচিত। এতে দেশের তুলার চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।”

খেয়াল করুন, তিনি দেশের তূলার চাহিদা কিন্তু মিটিয়ে দিচ্ছেন!

আবার পরক্ষণেরই বলছেন; “সুতার যে চাহিদা রয়েছে তার মাত্র ৩ শতাংশ আমরা দেশের ভেতরে উৎপাদন করতে পারছি। বাকি ৯৭ শতাংশ আমাদের আমদানি করতে হয়।” সূতা মানে সেই তূলাই। যে তূলা উৎপন্ন হয় তা দিয়ে সূতা বানিয়ে মাত্র ৩ শতাংশ চাহিদা মেটে। এবার তিনি দেশের সব কয়টি চিনি কলের আখ উৎপানক্ষম জমিতে তূলা চাষ করেই দেশের পুরো চাহিদা মেটাবেন! তার কি ন্যুনতম ধারণা আছে দেশের কত ভাগ জমিতে আখ চাষ হয়? আর সেই জমি পুরোটা তূলা চাষে দখল করলে কত হেক্টর জমিতে তূলা চাষ হয়? না। বয়োঃবৃদ্ধ স্মৃতিতে ওসব কিসসু নেই। তিনি আসলে নিজে বলেন না। কোনো না কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠির ‘পারপাস সার্ভ’ করেন!

দুই. যে শিল্পটি (গার্মেন্ট) আগা-গোঁড়া আমদানি পণ্যের উপর নির্ভরশীল, যে শিল্পটি দেশে বেসিক অর্থে তেমন কোনো ভ্যালু এ্যাড করে না, যে শিল্পটি প্রতিষ্ঠিত এবং টিকে আছে ‘চোথা বাণিজ্য’ বা ‘ফড়ে ব্যাপারের’ হাত ধরে, যে শিল্পটি দেশ থেকে টাকা পাচারের অন্যতম কারিগর, যে শিল্পটির বিকাশ গত ৩৬-৩৭ বছরে এদেশের অর্থনীতির মূল ধমনী কৃষির কোনো উপকার করেনি, কোনো আপগ্রেডেশন করেনি, কৃষিনির্ভর কোনো কাঁচামাল এই সেক্টরে লাগানোর ব্যবস্থা করেনি, গার্মেন্টের কারণে কৃষির ক্ষতি ছাড়া কানাকড়ি লাভ হয়নি, গার্মেন্টের কারণে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ‘ইন্ডেন্ট ইকোনমি’তে পরিগনিত হয়েছে, সেই গার্মেন্ট সেক্টর নিয়েই দেশের আর দুদশ জন ব্যুরোক্র্যাটের মত তিনিও পক্ষাপাতিত্বমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন।

যে ৩ শতাংশ তূলার চাহিদা দেশি তূলা দিয়ে মেটানো হয় এবং ৯৭ শতাংশ তূলা/সূতা আমদানি করতে হয় (সরকার এক পয়সাও শুল্ক পায় না, কারণ আমদানি হয় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’র মাধ্যেমে) সেই ৯৭ শতাংশ সূতা রাতারাতি অর্থমন্ত্রী বর্ণিত আখ চাষের দখলকৃত জমিতে তূলঅ চাষ করেই সম্ভব? আষাড়ে গল্পেরও কিছুটা ভিত্তি থাকে, এখানে তাও নেই।

তিন. অর্থমন্ত্রীকে ‘ব্যাকআপ’ দিয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আযম বলেছেন; “বস্ত্রশিল্পের উন্নয়নে প্রতিটি জেলায় টেক্সটাইল ইনিস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।”

এর অর্থ খুব পরিষ্কার। প্রতিটি জেলায় টেক্সটাইল ইনিস্টিটিউট স্থাপনের মানে হচ্ছে সারা দেশে কয়েক হাজার নতুন আমলা পোষার ব্যবস্থা। সেই সব আমলাদের জন্য বাজেটে বিরাট একটা অংশ রাখা এবং সেখান থেকে আরও বড় একটা অংশ ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়া। কাজের মধ্যে যে দৃশ্যমান হবে- টেক্সটাইল ইনিস্টিটিউটের পাশে কয়েক একর জমিতে প্রদর্শনীমূলক তূলা চাষের ব্যবস্থা করা। সারা দেশের সেই সব তূলা একত্র করলে ওই গার্মেন্ট ঘোষিত ৯৭ শতাংশ সূতা আমদানি বন্ধ তো হবেই না, বড়জোর ৩ শতাংশের জায়গায় আরও ৩ শতাংশ যোগ হতে পারে।

আর এই মোট ৬ শতাংশ তূলা এবং সূতার উৎপাদনের জন্য তারা দেশের সকল সরকারী চিনিকলগুলো বন্ধ করে শতভাগ চিনি আমদানীর দূরভিসন্ধী বাস্তবায়ন করবে। এটা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স পড়তে হয় না। সাদা চোখেও দেখা যায়।

১৯৯৬ টার্মে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে সময়কার শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ এক ভাষণে বলেছিলেন; “আমরা আমদানি করেই ২৩ টাকা কেজি দরে চিনি খাওয়াতে পারি, কিন্তু তাতে আমাদের চিনিকলগুলো অকেজো হয়ে যাবে বলে আমদানি করছি না।“

আজ থেকে ২১ বছর আগে তোফায়েল আহমদ যে ‘সম্ভবনা’র কথা বলেছিলেন, এবার সেটাকেই বাস্তবে রূপ দিতে চাইছেন ব্যাংকের (জনগণের) শত সহস্র কোটি টাকাকে ‘পয়সা’ ভাবা অর্থমন্ত্রী!

চার. ধরে নেয়া যাক সকল চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে। সেই চিনিকলের আওতাধীন জমিতে তূলা চাষ শুরু হয়েছে। সেই তূলা দিয়ে ‘কাগজে-কলমে’ দেশের শতভাগ সূতার চাহিদা মিটে যাচ্ছে! এক রিল সূতাও আর আমদানি করতে হচ্ছে না। দেশ সূতায় সয়ংসম্পূর্ণ! এই বাকবাকুম খুশির মওসুমে চিনির চিত্রটা কেমন হবে সেটা অনুমান করার জন্য ওই সেমিনারে উপস্থিত আরেক ‘দেশপ্রেমিক’-এর পরিচয়টা দেখা যাক।

… অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক কটন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মির্জা সালমান ইস্পাহানী! এবার ধারণাটা মিলিয়ে নিতে সমস্যা হবে না যে কে বা কারা কারা আগামীতে চিনি আমদানি করে জাতির চিনি চাহিদা মেটানোর গুরু দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন। এখনই দেশে আখের চিনির বদলে বিট-এর মণ্ড থেকে চিনি উৎপাদন করা হয়, যে চিনি আখের চিনির মত মিষ্টিও নয় তেমন স্বাদ-গন্ধও নেই। এখনই দেশে বেশ কয়েকটি চিনি আমদানিকারক আছে যারা বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে বাজার কব্জা করে কোটি কোটি টাকা মুফতে ঝেড়ে দেয়। এখনই চিনির এজমালি স্বত্ত্ব মাত্র কয়েকজন ধেড়ে ব্যাপারির হাতে। আর যদি একবার আখের জমিতে তূলা শুরু হয় তাহলে এক ছটাকও আখের চিনি হবে না দেশে। চিনিকলের শ্রমিকরা, আখ চাষের মজুররা কি করবে সে প্রশ্ন তোলা রইল। তারা বলবেন, আখের চাষা তূলা চাষ করবে। সে হিসেবে চিনিকলের শ্রমিক কি সূতা কলে কাজ পাবে? গার্মেন্টে কাজ পাবে? কে কাজ দেবে? এই প্রশ্নগুলোও তোলা রইল।

আমরা নই, সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দীন আহমেদ বাবলু বলেছেন-

“ডিসেম্বর পর্যন্ত ওয়েট করার দরকার কী? আপনি আজকেই অবসরে চলে যান, গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বাঁচান, আমাদের বাঁচান। দায়িত্ব নিয়ে আজকেই অবসরে যান, দেশ জাতিকে পরিত্রাণ দেন। অর্থপাচার বন্ধে কোনো ব্যবস্থা হয়নি। ব্যাংক খাতে আতঙ্ক-উদ্বেগ-বিভ্রান্তি। এই হচ্ছে মানি মার্কেটের অবস্থা। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। প্রথম পানামা পেপারসে নাম আসল, সরকার বা অর্থমন্ত্রী কোনো ব্যবস্থা নিলেন না। তারপর প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসল অনেক ব্যবসায়ীর কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিলেন না।

এগুলো বিভিন্ন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট…ওয়াশিংটনভিত্তিক কোম্পানি বের করছে। অথেনটিসিটি আছে। ওগুলোর ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

আমাদের ২৭ জনের নাম এসেছে। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কত টাকা পাচার হয়েছে তারও কোনো হিসাব উনি (অর্থমন্ত্রী) সংসদে দেননি, মনে হয় উনি বাধ্যও নন (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮.০২.২০১৮)

আমরাও সংসদের বাইরে থেকে ‘বাইরের লোক’ হিসেবে বলি- দয়া করে আমাদের নিয়ে আর গিনিপিগ গিনিপিগ খেলবেন না মাননীয় মন্ত্রি। দেশকে শতভাগ চিনি আমদানীকারণ দেশ-এ পরিণত করতে চান, ‘প্রিয়’ মানুষদের আমদানি বাণিজ্যে দুপয়সা লাভের মুখ দেখাতে চান, গার্মেন্ট ফড়ে ব্যাপারিদের কাছে বিবেক স্বত্ত্বা সব বন্ধক রাখতে চান সে সব আপনার নিজস্ব সোর্স থেরেক করুন। জনগণের সম্পত্তি নিয়ে আপনার এই ‘এক্সপেরিমেন্ট’ জনগণ ভালোভাবে নেবে না, কারণ তাদেরকে এই সম্পদ সৃষ্টি করতে হয়েছে তিল তিল রক্ত ঘাম ঝরিয়েই। এবং আপনি সে সব ধ্বংস করার কোনো অধিকার রাখেন না।

 

মনজুরুল হক

ঢাকা

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

 

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s