বিসিবি কার টাকা কোন অধিকারে দান করে?

 

 

একটা-দুটো ক্রিকেট ম্যাচ জিতলেই বিসিবি ক্রিকেটারদের কোটি কোটি টাকা উপহার ঘোষণা করে। কোনো এক কালে লক্ষ হলেও এখন কোটি ছাড়া কথা নেই। তো এই টাকা ‘কেন দেয়া হয়’, ‘কোত্থেকে আসে’, ‘গরিব দেশের এরকম ঘোড়া রোগ কেন’ ইত্যকার প্রশ্ন স্বভাবতই ওঠে, এবং এই প্রশ্নগুলোর ইনস্ট্যান্ট উত্তরও আছে। অনেককেই বলতে শুনি- ‘বিসিবি জনগণের টাকায় চলে না। তাদের নিজস্ব ইনকাম আছে। সেই টাকা থেকেই তারা কোটি কোটি টাকা উপহার দেয়। সুতরাং এটা নিয়ে কারো মাথা না ঘামালেও চলবে’।

এই রেডিমেড উত্তরদাতাগণ এত্তগুলা কিউট যে তাদের উত্তরে নিজেকে নেহাতই শিশু মনে হয়। সেই শিশুতোষ চিন্তা থেকে কিছু তথ্য শেয়ার করা যাক।

প্রথমতঃ যে কোনো দেশের সম্পদ সৃষ্টি হয় সে দেশের জনগণের শ্রম থেকে। শ্রম ছাড়া সম্পদ সৃষ্টি হওয়ার আর কোনো পদ্ধতি নেই। রাষ্ট্রের সম্পত্তি বলতে যা বোঝানো হয় তা আদপে জনগণের সম্পদ। এটাকে সরলিকরণ করতে গেলে ‘মহাভারত’ লিখতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ বিসিবি জনগণের টাকায় প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। যারা বিদেশ থেকে হাজার কোটি টাকা আয় করলেও তার প্রতিষ্ঠা হয়েছে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রের জমিতে রাষ্ট্রের বেতনে রাষ্ট্রের পরিচালনায়। এখানে রাষ্ট্র মানেই জনগণ। সুতরাং বিসিবি কার্যত জনগণের সম্পদ।

তৃতীয়তঃ বিসিবি আইসিসি থেকে, বিজ্ঞাপন থেকে এবং অন্যান্য উৎস থেকে যে আয় করে তার নির্দিষ্ট করাদি পরিশোধ করার পরই কেবল টাকাটাতে বিসিবি’র এক্তিয়ার জন্মে। বিসিবির আয় করা ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে টাকায় পরিশোধিত হয়। অর্থাৎ ব্যাংক তথা জনগণের প্রতিষ্ঠানে কর/ফি দেয়ার পরই টাকাটা ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।

সুতরাং বিসিবি মাসে একশ’ হাজার কোটি আয় করলেও সেই টাকা বিসিবি’র কোনো কর্মকর্তার নয়। যেমন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে একটি টাকাও কাউকে দিলে সেটা রাষ্ট্রের তথা জনগণের টাকা। তেমনি বিসিবি একটি টাকাও কাউকে দান করলে সেটা কোনো কর্মকর্তার টাকা নয়। রাষ্ট্রের তথা জনগণের টাকা। তপশিলি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের মত বিসিবি কর্মকর্তাদেরও কিছু পরিমান টাকা উৎসাহ বোনাস হিসেবে দেয়ার এক্তিয়ার আছে বটে, তবে সেটা ‘কারো বাপের টাকা’ নয়।

দেশের সবচেয়ে ধনী লোকটির হয়ত ট্রিলিয়ন ডলার সমান টাকা আছে, কিন্তু কালকে সকালে তার জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য তাকে কিনতেই হবে। সেই সমুদয় পণ্য জনগণের। সে বিনিময় সূত্রে পণ্যগুলো কিনছে। অর্থাৎ জনগণের উৎপাদিত পণ্য তাকে টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ওই পণ্যের পুরোটাই জনগণের।

জানি না বোঝাতে পারলাম কি না। তবে এই দেশটির ঐতিহাসিক ট্রাজিডি হল শাসকরা যেমন নিজেদেরকে দেশটির মালিক মনে করে (মুখে বলে জনগণই দেশের মালিক), তেমনি তস্য শাসক বা কয়েকশ’ ধাপ নিচের অনু-পরমানুসমান শাসকরাও নিজেদেরকে দেশটির, সম্পদের, পণ্যের, উদ্বৃত্ত মূল্যের মালিক মনে করে। সেই ক্ষুদে মালিকানা চিন্তা থেকেই তাদের মননে বাসা বাঁধে সামন্তচিন্তা। কাউকে টাকার মূল্যে উপহার ছুঁড়ে দেয়ার মধ্যে সেই প্রাচীন কালের রাজা-বাদশাহদের বাঈজির সামনে মুক্তোর মালা ছুঁড়ে দেয়ার পরম্পরা কাজ করে। আধুনিক রাষ্ট্রে এবং অগ্রসর সমাজে যা চরম নির্লজ্জতা। এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে আমাদের সামন্ত কত্তাব্যক্তিবর্গ সেই নির্লজ্জতা করে চলছেন এবং তাদের পোষ্যরা সেই নির্লজ্জতাকে র‌্যাপিং পেপারে মুড়ে পত্র-পত্রিকায় হাজির করছে।

ঢাকা
২০ মার্চ, ২০১৮

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: