~ অপরাধদমনে চরমপন্থা গ্রহণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা প্রচারমাধ্যমের দায়িত্ব নয় ~

বাঙালিদের মননে যে কয়েকটি বিষয় খোদাই হয়ে স্থায়ী হয়েছে তার একটি হল ‘সংবাদপত্র ন্যায়ের প্রতীক এবং জাতির পথপ্রদর্শক’। আরেকটি ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’। অনেকগুলো জ্ঞানভারে ন্যুব্জ প্রবচন বা মনন বাদ রেখে শুধু এ দুটো কেন উল্লেখ করা হল?

আপনরা যারা নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন তাদের খেয়াল থাকবে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে ভারতে নৃশংসভাবে নক্সালদের পতন ঘটানোর পর এদেশেও তার প্রভাব পড়ে। রক্ষীবাহিনী ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়। হঠাৎ করেই চারিদিকে সুনশান হয়ে ওঠে! তার পর ফের আশির দশকে যখন নক্সালপন্থীরা, সর্বহারার বিভিন্ন ফ্যাকশন এবং অন্যান্য সশস্ত্র সংগ্রামের দলগুলো সক্রিয় হতে শুরু করে সে সময় ‘দাগি দালাল’ ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি নতুন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী দালাল’ কাগজে ঘন ঘন এমন রিপোর্ট বের হতে থাকে-

“ময়মনসিংহে এক অভিযানে ৪ সর্বহারা ধৃত। তাদের কাছে মদের বোতল, গাঁজা এবং নিষিদ্ধ বইপত্র পাওয়া গেছে”। “নেত্রকোনায় ৩ সর্বহারাকে ধরে গ্রামবাসী চোখ তুলে নিয়েছে”। “মাদারীপুরে গ্রামবাসীর তাড়া খেয়ে ২ সর্বহারার সলিল সমাধী”। “রাজশাহীতে নক্সালপন্থীরা ২ গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে গেছে, সাথে তাদের দুটি গরুও”। “তানোরে নক্সালরা গ্রামে ঢুকে ব্যাপক লুটতরাজ করেছে”…….।
এই ধরণের এমবেডেড এবং ম্যানুফ্যাকচার্ড খবরগুলো একটু একটু করে বিশেষ মহলে জমতে থাকে। এক সময় খবরগুলো আরও নির্দিষ্টকরণ হয় এবং তার পর পরই বিএনপি-জামাতের হাতে পয়দা হয় ‘যৌথ বাহিনী’। তারা সারা দেশে কিসের রাজত্ব কায়েম করেছিল সে খতিয়ান দেয়ার জন্য এই লেখা নয়।

এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ, সেনা, বিডিআর ইত্যাদির দমন-পীড়ন ‘পর্যাপ্ত নয়’ ভেবে নীতিনির্ধারকরা বেসরকারী নির্মূল বাহিনী গড়ার অনুমোদন দেয়। গজিয়ে ওঠে বাংলা ভাই, জেজেএমবি। আইন-আদালত, নির্বাহী, আমলা-সাংসদ-মন্ত্রি-প্রেসিডেন্ট সবার সামনে তারা কমিউনিস্ট নিধন শুরু করে। হত্যা করে গাছের ডালে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে (আফগান স্টাইলে)।

তখন আবার ওই সেই প্রথম দিককার ‘ন্যায়ের প্রতীক এবং জাতির পথপ্রদর্শক’রা মিন মিন করে বলতে থাকে- “এ কিন্তু অন্যায় হচ্ছে”! “আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারো নেই”। আরও পরে ‘কিলিং ফেস্টিভেল’ আরও বিস্তৃত হলে সুশীল সমাজের শীতঘুম ভাঙ্গে। তারা নড়ে-চড়ে বসেন। তারা এবং ‘জাতির বিবেক’রা একটু চাপটাপ দিলে বিএনপি-জামাত সরকার ওই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে দমন করতে বাধ্য হয়।

সেই তেনারাই আবার ২০০২-২০০৩ সালের দিকে “দক্ষিণাঞ্চল ফের উত্তপ্ত হচ্ছে”, “কর্তৃত্ব নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড দলগুলোয় চলছে খুনোখুনি”। “মোটা অংকের চাঁদা না দেয়ায় চিংড়িঘের ব্যবসায়ী অপহরণ করেছে চরমপন্থীরা”। “দক্ষিণাঞ্চল এখন কার্যত চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে”…. ধরণের সংবাদ প্রসব করতে থাকেন।
এই ধরণের সংবাদের আবার বাচ্চা-কাচ্চা বাড়তে থাকে অনলাইন মিডিয়া তৈরি হওয়ায়। সেই সঙ্গে বড় বড় শহরে ইতালীর মাফিয়া পরিবার বা কুর্ণী পরিবারের আদলে এখানেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় মাল্টি মিলিওনিয়ার ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতালিপ্সু সাংসদদের আসকারায় বিভিন্ন গ্যাং/বাহিনী/গ্রুপ গড়ে ওঠে। তাদের দৌরাত্ম বেড়ে খানিকটা অসহনীয় (কারো কারো জন্য) হলে ২০০৪ সালে ১৬ ডিসেম্বর জাতির বিজয় দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে মাঠে নামানো হয় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা ‘র‌্যাব’।

প্রথমদিকে কয়েকজন ছিঁচকে চাঁদাবাজ নিকেশ করে হাত দেয়া হয় ‘আসল’ কাজে। কমিউনিস্ট বিপ্লবী নির্মূলকররণ। সে কাজ সেই থেকে আজ অব্দি চলছে। কত জন্যকে হত্যা করা হয়েছে সেই সংখ্যাটা এখন আর ফ্যাক্টর নয়। ফ্যাক্টর হলো এর পরে ‘সশস্ত্র সংগ্রাম’ ব্যাপারটা মাঠ থেকে কাগজে, ফেসবুক-এ, আলোচনায় উঠে এসেছে। তার মানে ‘ওষুধে’ কাজ হয়েছে!?

এর পরের ধাপ উগ্রবাদীদের বিধর্মী, নাস্তিক কিলিং। সেই কিলিংটাও যতদিন কর্তৃপক্ষের কাছে ‘সহনীয়’ ছিল ততদিন তারা ট্যাঁপোঁ করেননি। যখনই হোলি আর্টিজান ঘটনা ঘটেছে, বিশ্বে চাউর হয়েছে, তখন সরকারের ‘কানে পানি গেছে’। আবার সেই পুরোনো পদ্ধতি- ‘ক্রসফায়ার’। সেই পুরোনো শিরোনাম- “তাদের কাছে জিহাদী বই, দেশি অস্ত্র এবং বিদেশি পিস্তল ও গুলি পাওয়া গেছে”। সমাজ, রাষ্ট্র, সুশীল, ধমর্ভীরু, সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু কেউই উচ্চবাচ্য করেনি।

এখনকার মত শেষ ধাপে দেখা যাচ্ছে ভিকটিমের বদল হয়েছে। এবারকার টার্গেট মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী। এবারও সেই জাতির বিবেকরা ইয়াবা নিয়ে, মাদক নিয়ে সিরিজ রিপোর্ট করে চলেছে…..। সেই সব রিপোর্ট স্তুপিকৃত হতে হতেই শুরু হল ‘ক্রসফায়ারের’ নতুন ভার্সন। ধর্ষণ ব্যাপারটা যখন প্রায় ‘উৎসব’ হয়ে উঠল তখন সরকার আবারও সেই ‘ধনন্তরি’ ব্যবস্থা গ্রহণ করল- ‘ক্রসফায়ার’। এখন ধর্ষক, মাদক ব্যবসায়ীরা ‘অস্ত্র উদ্ধারে’ যাচ্ছে!

গত শুক্রবারের ঘটনাটিই দেখা যাক। সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে নাবালিকা দুটি মেয়েকে ধর্ষণ নির্যাতন শেষে হত্যা করে স্থানীয় ইসমাইল হোসেনের পুত্র আবুল হোসেন ও তার সঙ্গীরা। এরকম ঘটনা প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নিয়মিত ঘটছে। সংবাদপত্রেও এ নিয়ে ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ নেয়ার দাবী করে প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে।

দৃশ্যটি হৃদয়বিদারক। দুটি মৃত সন্তানের পাশে বসে অসহায় পিতা কাঁদছেন। সারা দেশের মানুষ কত কিছুতেই প্রতিবাদী হন, এখানে হচ্ছেন না সেভাবে, কারণ মেয়ে দুটি পাহাড়ি! মানবাধিকার কর্মীরাও তেমন একটা নড়চড় করছেন না, কারণ আততায়ী বাঙালি সেটেলার। সংবাদে জানা গেছে আততায়ী একজন ধরা পড়েছে, এবং এরই মধ্যে কেউ কেউ তাকে নিয়ে ‘অস্ত্র উদ্ধারে’ যাওয়ার আবেদন (‘ক্রসফায়ারে’ দেয়ার আবেদন আসলে) জানাচ্ছেন। এই আবেদন বা মতামত কিংবা মনোভাব সারা দেশে খুব দ্রুত সংক্রমতি হয়েছে। কেন হয়েছে? কারণ আইন তার দায়িত্ব পালন করেনি। পুলিশ দায়িত্ব পালন করেনি। আদালত যথাযথ এবং কার্যকর উপায় বাতলে তা মানতে বাধ্য করার রুল জারি করেনি। সংবাদপত্র তার লেখনির মাধ্যমে গণ সচেতনতা তৈরি করতে পারেনি। সংবাদপত্র/মিডিয়া অপরাধ দমনের, অপরাধী আসলে কে, কিভাবে সে অপরাধী, কেন এই সমাজে এ ধরণের অপরাধী তৈরি হয় সে সবের ব্যাখ্যায় না গিয়ে চটজলদি সমাধান হিসেবে সেই ‘ক্রসফায়ার’কেই কার্যত কার্যকর উপায় বলে মৌনব্রতে মেনে নিয়েছে।

না। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে; এটা সংবাদপত্রের দায়িত্ব নয়।

২০মে, ২০১৮
ঢাকা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s