হয় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করুন, নয়ত আত্মহতায় পাপমোচন করুন!

 

বাঙালি সমাজ কার্যত ঢাকাই ফিল্মি ‘আদর্শে’ গঠিত। এখানে সারা ছবিজুড়ে গ্রাম থেকে আসা সরল-সিধে ‘অত্যাচারিত’ স্বামী শেষ দৃশ্যে ধনীর দুলালী বউকে কষে থাপ্পড় মারার সাথে সাথে পুরো সিনেমা হল উল্লাসে ফেটে পড়ে! মুখ দিয়ে আরও কি কি বাণী বর্ষিত হয় তা নাই বা বললাম।
এই ‘ফিল্মি সমাজ’ সৃষ্টিকৃত দেশে যে মহামহিম প্রবল ক্ষমতাধর সরকার থাকে তাদের ক্ষমতার কোনো সীমা-পরিসীমা নাই, কিন্তু যেহেতু এই সিনেমা হলের (দেশে) প্রায় শতভাগ দর্শক ওই ফিল্মি কালচারের তাই এখানে সরকার ওই দজ্জাল ধনীর দুলালী। সব রকম অন্যাচার নিপীড়ন করেও ফিল্মি কায়দায়। পার্থক্য হল ফিল্মে শেষ দৃশ্যে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন হয়, বাস্তবে কিছুই হয় না।
 
কালকে প্রেসক্লাবের সামনে একজনের মাথা হাত সব আলাদা করে দিয়েছে রাস্তার প্রিডেটর বাসড্রাইভার। এটা গত এক মাসে চতুর্থ পিলে চমকানো দুর্ঘটনা।
 
সরকারের হাতে যে সব বাহিনী এবং তাদের রিক্রুটে যেসব কুল হেডেড ‘ক্রসফায়ার এক্সপার্ট’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে পারদর্শী’ আছে, সরকারের পেছনে দেশের প্রায় সকল মানুষের সমর্থন (বাপ বাপ করে) আছে। সরকারের হাতে যত ক্ষমতা আছে তার বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান শাসক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টেরও নেই! তাকে এমনকি হোয়াইট হাউসে ডিস্টেম্পার করাতে হলেও সিনেটের অনুমোদন নিতে হয়। জনগণের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ তো দূর কি বাত! সে তুলনায় আমাদের মহামহিম সরকারকে সাবমেরিন, স্যাটেলাইট, যুদ্ধ বিমান কিনতে হলেও কেবলমাত্র শীর্ষ নির্বাহীর ইচ্ছাই যথেষ্ট। এর পর অবশ্যি মন্ত্রিসভার বৈঠকে, একনেকে পাশ করিয়ে নেয়া হয়, যা জাউভাত রান্নার মতই সোজা! ইতিমধ্যে এই সরকার বিশ্বের বিভিন্ন রেটিংয়েও ক্ষমতাবান দশ বিশ্বেনেতার কাতারে আছে। এই সরকারের বিরুদ্ধে মিলাদ শরীফের মত দোয়া-দুরুদ পড়ে সামান্য পরামর্শ (সমালোচনা বললে কেটে ফেলবে) দিতে চাইলেও ঠ্যাঙ্গাড়ে পুলিশের অনুমতি লাগে।
 
স্টেট বা মহা ক্ষমতাধর এই সরকার হাতে গোণা দুয়েকটি শ্রেণির বা গোষ্ঠির কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আগে তিনশ’ ছাপ্পান্নবার ভাবে! শেষ পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নিতে পারে না। কারা সেই মহা ভাগ্যশালী শ্রেণি বা বিভাগ কিংবা গোষ্ঠি? তারা কি ভিন গ্রহের এলিয়েন? এক ফু-তে বিশ্ব জ্বালিয়ে খাক করে দিতে পারে?
 
সেই প্রিভিলেজড ক্লাস বা মহাসৌভাগ্যবান কিংবা আসমানী জজবাধারী শ্রেণির মধ্যে পড়ে সকল সশস্ত্র বাহিনী, ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত দলীয় নেতা-কর্মী, সূতোয় সূতোয় গিট্ঠু লাগা আত্মিয়-স্বজন, সকল কর্মকর্তা লেভেলের বরকন্দাজ, বেহেস্তি জওরসমৃদ্ধ নূরানী পবিত্র সৎ ব্যবসায়ী, সমাজের উপরিকাঠামোতে চেমো উকুনের মত লেপ্টে থেকে অনবরত জনগণের রক্ত নিংড়ে খাওয়া বুদ্ধিব্যাপারি-সুশীল-গুণিজন এবং সর্বক্ষেত্রের বিশিষ্টজন। এই টোটাল প্রিভিলেজড ক্লাসের জন্য সাধারণ মানুষের চামড়া দিয়ে চটি জুতো, হাড্ডি দিয়ে চিরুণী, ফ্যাপসা-কলিজা দিয়ে কুকুরে খাবার, চুল দিয়ে পরচুলা এবং মাংস পচিয়ে জৈব সার বানানো চলে। এদের সব্বাইকে সরকার এবং শাসকশ্রেণি ভালোবাসে। পেয়ার করে। স্নেহ করে। আসকারা দেয়।
 
এবং আর একটি শ্রেণি আছে যাদেরকে সেই ভালোবাসা, পেয়ার করা, স্নেহ করা, আসকারা দেয়ার পর আরও একটি বিশেষণে ভূষিত করা হয়, তা হল- ভয়! হ্যাঁ সরকার বা শাসকশ্রেণি এই পরিবহন মাফিয়াদের ভয় পায়। আক্ষরিক অর্থেই ভয় পায়! যদিও এদের যে কয়টি ফ্যাকশন রয়েছে তার সবগুলো শীর্ষ নেতা সরকারী লোক। হয় মন্ত্রি না হয় নিজেদের সংসদ সদস্য, আমলা, প্রাক্তন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা। তার পরও এদেরকে ভয় পেতে হয়। এই শ্রেণিটা যতদিন ‘শ্রমিক শ্রেণি’ হিসেবে পরিচিত ছিল ততদিন ভয় পেতে হয়নি। যখন থেকে এরা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার টুলস এবং ইন্সট্রুমেন্টস করায়ত্ব করে ‘মাফিয়া’ হয়ে উঠেছে সেদিন থেকেই সরকার ভয় করে। ভয় করানো হয়েছে। এরা কি কি অপরাধ করে বা কোন কোন মাস্তানি হুজ্জতি হার্মাদি শয়তানি-বজ্জাতি করে তার খতিয়ান দীর্ঘ। সেটা অন্য দিন বলা যাবে। শুধু একেবারে টাটকা একটি ঘটনা বলা যাক। বিআরটিসি বাস সরকারী ভর্তুকিতে চলত। তাতে করে সাধারণ মানুষ সামান্য হলেও কিছুটা কম ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারত।
 
তা গত ১০ বছর ধরে বন্ধ। এখন সকল বিআরটিসি বাস পাবলিকের কাছে লিজ দেয়া। পাবলিক ওই বাসের রস বের করে চামড়া তুলে হা্ড্ডি গুড়ো করে টাকা আয় করে নেয়। কম ভাড়ার রূপকথা শেষ হয়েছে বহু আগে। এখন কোন রুটে এই বাস চলবে সেটাও বিআরটিসি নির্ধারণ করতে পারে না! (এর প্রধান লোকটি আবার সামরিক কর্মকর্তা! বুঝুন অবস্থা!) ধরা যাক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে এসি বিআরটিসি চলবে। না, পারবে না। ওসমান সালতানাত নিজেদের গাড়ি চালানোর জন্য বিআরটিসি বাস চলতে দেবে না। দেয়নি। এ নিয়ে বিআরটিসির বক্তব্য কি শুনবেন? “ঘটনাটি আমার গোচরে আসেনি। তদন্ত করে দেখা হবে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত…..” (এরপর সেই খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা…)
 
আজকেই একটি বিআরটিসি ডিপোতে ১০ টি বাস পুড়ে ছাই হয়েছে। আগুনের পেছনের কথা জানার দরকার নেই। যার একটির দাম আড়াই কোটি টাকা। কল্যাণপুর ডিপোতে, মোহাম্মাদপুর ডিপোতে, জোয়ার সাহারা ডিপোতে ডজন ডজন বাস পড়ে আছে। কোনো কোনোটির হয়ত সামান্য ক্লাচপ্লেট নষ্ট হয়েছে, যার দাম অনুর্ধ ৫শ টাকা! এই বাসগুলো এক সময় স্ক্র্যাব হিসেবে ওজনদরে বিক্রি হয়ে যাবে। জনগণের রক্ত-ঘামের টাকায় কেনা বাসগুলো ওভারঅল কিছু শুয়োরের বাচ্চার জন্য ধোলাইখালে চলে যাবে।
 
তার পরও। হ্যাঁ, তার রপও এই পরিবহন মাফিয়াদেরকে সরকার সমীহ করে। আজীবন সমীহ করে চলবে, কেননা কখনোই কোনো ক্ষমতাবলয়ের স্টেকহোল্ডার বা কাছাকাছির লোক দুই বাসের চিপায় হাত বা মাথায় খোয়াবে না। তাদের জন্য বিশ্বের নামি-দামী গাড়ি আছে। বিনে পয়সার ফুয়েল আছে। সরকারী চালক আছে। বিনা সুদের লোন আছে।
 
ও হ্যাঁ, তা হলে প্রতিকার কিসে? না। কোনো প্রতিকার নেই। আত্মহত্যার জন্য রেডি হন। যেহেতু আমরা সকলেই এখন প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে ভুলে গেছি।
 
মনজুরুল হক
জুন ৯, ২০১৮
ঢাকা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s