একজন শিক্ষকের পা ধরে কাতর মিনতি…আমরা এইসব ব্যাভিচার অনুমোদন করেছি প্রতিবাদহীন নির্লিপ্ত থেকে।

একজন শিক্ষকের পা ধরে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নূরু। এটাই বাংলাদেশের স্থিরচিত্র। এরকম অপমানজনক দৃশ্য কি আমরা এটাই প্রথম দেখলাম? বহু বছর ধরে দেখছি, তাই তো? তাহলে প্রতিবাদ করিনি কেন? প্রতিরোধ করিনি কেন? আমাদের নিজস্ব বিষয় ছিল না বলে?

হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় শিশু মরে। আপনি প্রতিবাদে ভাংচুর করলে ডাক্তাররা ধর্মঘটে যায়। তাদের হুমকিতে প্রশাসন আপনাকে ছেঁচে দেয়।

পেনসনের ফাইলের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে আপনার অবসর জীবন শেষ হয়ে যায়। আপনি কারো কাছে সামান্য সান্তনাও পান না।

আপনি বাসে উঠে স্বাভাবিক গতিতে চালাতে বললে চালক আপনাকে মা-বাপ তুলে গালি দেয়। বাকি যাত্রীরা খ্যাক শিয়ালের মত খ্যাক খ্যাক করে হাসে।

আপনার বিক্রি করা আমে ফরমালিন মেলেনি। তার পরও ঈশ্বরতুল্য ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে সব আম রাস্তায় ফেলে পিষে দেয়া হয়। শত শত লোক তামাশা দেখে।

আপনার রক্ত ঘামের জমি শিল্পপতি পানির দরে কেড়ে নিতে চায়। না দিলে বুলডোজার দিয়ে আপনাকে হত্যা করে। পুলিশ সাত বছর ধরে কেস ফাইল করতে পারে না। সেই শিল্প পরিবার রাষ্ট্রের শীর্ষনেতাদের সাথে চা পান করে।

আপনার মেয়েটাকে শিল্পপতি বা সরকারী দলের নেতার ছেলেরা রেপ করে। পুলিশ স্বাক্ষী ছাড়া মামলা নেয় না। আপনার সামেনই মেয়েটির চরিত্র নিয়ে কদাকার কমেন্ট করে।

আপনার মেয়েকে সশস্ত্র বাহিনীর/পুলিশের/আইনরক্ষা বাহিনীর কারো পছন্দ হলে ধরে রেপ করে মেরে ফেলতে পারে। মিডিয়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে রিপোর্ট প্রসব করে। পাবলিক আহঃ উঃ করে। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী বলে-‘বেডরুম পাহারা দিতে পারব না’।

আপনার বেতন-ভাতা সম্মানজনক করতে হলে আপনাকে রাস্তায় অনশন করতে হয়। শহরের পৌনে দুই কোটি মানুষ নিত্য কর্ম করে। আপনাদের সামনে কয়েকটা মুভি ক্যামেরা অলস বসে থাকে। আর থাকে নেড়ি কুকুর এবং ছিন্নমূল কিছু শিশু। দেশের বিবেক তখন স্বমেহনে ব্যস্ত।

রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের বেতন-ভাতা বাড়াতে কেবল একটি মিটিং এবং কিছু হাস্যজ্জোল মুহূর্ত দরকার। তাপর সিদ্ধান্ত এবং গেজেট ছাপা শেষ বাস্তবায়ন।

আপনার মেয়ের দূরারোগ্য ব্যাধি। চিকিৎসার টাকা নেই। চাঁদা তুলছেন? রাষ্ট্রের কোষাগারের টাকায় সে সময় রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতা-নেত্রীরা বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আপনার এলাকায় বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে ফসল শেষ। আপনি প্রতিকার চাইতে রাজধানীতে এসেছেন? আপনার পাছার চামড়া তুলে দেয়া হবে এই ‘বেয়াদবীর’ জন্য। বাঁধের কোটি টাকা চুরির জন্য কে কি বলেছে?

আপনি সরকারের সমালোচনা করেছেন? গণতন্ত্রের মানসপুত্রদের বরকন্দাজরা দিনে-দুপুরে কিংবা রাত-বিরেতে আপনাকে তুলে নিয়ে গুম করে দেবে। ‘ক্রসফায়ার’ করবে। তখন প্রচণ্ড উত্তেজনাকর ম্যাচ চলছে টিভিতে। কারো সময় নেই ভাববার।

আপনার দুমাসের কারেন্ট বিল বাকি? ফট করে আপনার সংযোগ কেটে দেবে। ক্ষমতাবানদের শিল্পকারখানায় কত বাকি জানেন? কোটি টাকা। তাদের লাইন সচল।

গ্রামের শিক্ষকরা প্রেসক্লাবে সবাবেশ করছে। আপনি জ্যামে পড়া বাসে ঘামছেন আর শিক্ষকের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছেন? পরের মাসে আপনাকেও প্রেসক্লাবে বসতে হবে।

আপনার অসুস্থ বাবাকে বহনকারী বাসটা ফেরির লাইনে। দেখলেন কোনো এক কর্মকর্তার জীপ গাড়ি হড় হড় করে ফেরিতে উঠে গেল। আপনার ফেরি আসতে আরও ৪ ঘন্টা। কেউ প্রতিবাদ করল না।

‘উত্তরাঞ্চলে কমিউনিস্টরা একত্র হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনা করছে’! আপনি পত্রিকায় পড়লেন। পরদিন দেখলেন ধানক্ষেত্রে রক্তাক্ত লাশ কাদায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে। কোনো বাঞ্চোত প্রতিবাদ করেছেন? করেনিনি।

এই যে হাজার হাজার অন্যায় অবিচার অত্যাচার-নিপীড়ন-নির্যাতন, বিভৎসতা, ধর্ষণ-খুন-জখম, বলাৎকার, জবরদখল, ঘুষ-দুর্নীতি, ক্ষমতার আসফালন, প্রকাশ্যে ক্ষমতাহীনদের নিপীড়ন-নির্যাতন, দখল-উচ্ছেদ-বিতাড়নসহ শত শত মানবতাবিরোধী অপকর্ম, ‘ক্রসফায়ার’, ‘গুম’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ঘটে চলেছে…. আপনার ভাত খাওয়া, অফিস করা, ব্যবসা করা, সঙ্গম করা, পরনারী নিয়ে প্রমোদ বিহার করা, খেলা দেখা, রেটেড মুভি দেখে মাস্টারবেট করা, পত্রিকা পড়া, ফেসবুক-এ লেঙ্গিবাজী করা, মাঝে মাঝে সখের মানবতা মারানো কি বন্ধ হয়েছে?
না।

সারা দেশের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জায়গাগুলো যে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তা নিয়ে কি সরব হয়েছেন?

না।

যে গণতান্ত্রিক ইনস্টিটিউটগুলো গুড়িয়ে দিয়ে মানুষকে কেনা গোলাম বা তস্য সেবাদাস বানানো হয়েছে, তাতে কি প্রতিরোধ করেছেন?

না।

যে কোনো সামান্য দাবী আদায়ের জন্য পথে নেমে অপমানিত হতে হয়েছে। তা নিয়ে চিৎকার করেছেন?

না।

গার্মেন্ট নারী শ্রমিকদের সাথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন যে অসভ্য পাশবিক ইতরসুলভ আচরণ করে তাদের ন্যায্য দাবী আদায়ের আন্দোলন দমন করেছে, তাদেরকে বেশ্যা বলে গালি দিয়েছে। মালিকের ভাড়াটে গুন্ডারা তাদের তুলে নিয়ে গ্যাংরেপ করেছে। আপনি প্রতিবাদ করেছেন?

না।

এই ‘আপনি’ কে? এই ‘আপনি’ হলেন ছাত্র-শিক্ষক, শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবি, কবি-সাহিত্যিক, বিবেকবান-মর্যাদাবান, আমলা-প্রতিভূ, সরকারী-বেসরকারী তহশীলদার-তরফদার, গণতন্ত্রের মানসপুত্র, গণতন্ত্রের খাম্বা-খুঁটি, প্রগতিশীল-বামপন্থী, পাতি কমিউনিস্ট, সংশোধনবাদী, মানবতাবাদী, শিল্প-সাহিত্যে বেনিয়া ব্যাপারি….।

আপনাকে এখন এই যে নূর একজন শিক্ষকের পায়ের নিচে অমানবিক কাতর মিনতি করছে রক্ষা পেতে… অথবা গ্রেপ্তার হওয়া রাশেদ খানের ওপরকার অত্যাচার সহ্য করতে হবে। হার্ট শক্ত করে মেনে নিতে হবে। ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে যেতে হবে। কেননা আপনি এইসব ব্যাভিচার অনুমোদন করেছেন প্রতিবাদহীন নির্লিপ্ত থেকে।

 

ঢাকা

১, জুলাই, ২০১৮

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s