‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ এর জন্ম এবং কুমিরের শেয়াল ছানা প্রদর্শন!


অনেকদিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল দেশে দ্বিদলীয় একচেটিয়া ধারার অবসান ঘটানো দরকার। আর এ কাজটি করতে পারে বাম প্রগতিশীলরা। সমাজেও এই বাম প্রগতিশীলদের নিয়ে উচ্চাকাঙ্খার পাশাপাশি হতাশা এবং তীব্র শ্লেষও আছে। তার পরও সমাজে সবচেয়ে চালু বক্তব্য হচ্ছে- ‘এরা এক হইয়া যায় না কেন?’ কিংবা ‘বামরা দীর্ঘ মেয়াদে এক থাকতে পারে না, পারলে দেশের অনেক উপকার হইত’।
এই ভাবনাগুলো সমাজের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেয় না। গড় ধারণা থেকেই প্রাথমিক স্তরের আংশিক জ্ঞানসম্পন্ন বক্তারা এধরণের ভভিষ্যদ্বানী করে থাকেন। শেষ পর্যন্ত জনগণের আকাঙ্খা থেকে হোক বা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে হোক বাম সোস্যাল ডেমোক্র্যাট দলগুলো একটা জোট গঠনে সমর্থ হয়েছে। এটা এই মুহূর্তে অনেক হতাশার ভেতর খানিকটা আশাবাদ। কাদের জন্য? না, এতে জনগণের কোনো আশাবাদী হওয়ার উপলক্ষ হয়নি। আশাবাদী হতে পারে এই দলগুলোর নেতা-কর্মীরা।

অনেকেই বলে থাকেন সাম্রাজ্যবাদের দোসর বা লেজুর জোট-মহাজোটসহ শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী বাম ঐক্য গড়তে হবে। এই ঐক্য গড়ে তোলার ঘটনা দেশে নতুন নয়। বিভিন্ন বাম দলের একাধিক ঐক্য বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে। আবার তা ভেঙ্গেও গেছে। ঐক্যের লক্ষ্য কি? ঐক্যের উদ্দেশ্য কি? যাদেরকে নিয়ে ঐক্য গঠিত হওয়া দরকার তাদের চরিত্র এবং শেণী অবস্থানসহ আনুসাঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে উদাসীন থেকে শুধু বামপন্থী নামে পরিচিত বিদ্যমান কিছু দলের ঐক্যকেই আসল ঐক্য মনে করা। কাদের বিরুদ্ধে, কোন কর্মসূচির ভিত্তিতে, কোন মতাদর্শের ভিত্তিতে ঐক্য সেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিবেচনায় না রেখে কয়েকটি দল মিলে একটি ঐক্য, সেখানে মতাদর্শীক বিতর্ক শুরু হলে নিজ নিজ অবস্থানকে ‘সঠিক’ বিবেচনা করে তুমুল বাদ-বিসম্বাদ, শেষে আবার ঐক্য ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা এবং জাতীয়-আন্তার্জাতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতিতে আবার ঐক্য গড়ার প্রয়াস শেষ পর্যন্ত ‘ঐক্যবাদ’ হয়ে দাঁড়ায় এবং এই ‘ঐক্যবাদ’ বিপুল সম্ভবনা থাকা স্বত্বেও গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও বিপ্লবী আন্দোলনের অনেক ক্ষতি করে চলেছে।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত ৮টি বাম দল ঐক্যজোট গঠনে সমর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটি (সিপিবি) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) একসঙ্গে ঐক্যের প্লাটফরম তৈরি করে ৫ দলীয় বাম মোর্চা এবং আরও একটি দল মিলে ৮দলীয় জোট। যার নাম দেওয়া হয়েছে “বাম গণতান্ত্রিক জোট”। জোট গঠনের পর সাংবাদিক সম্মেলনে দেওয়া লিখিত বক্তব্য পড়ে মনে হতে পারে দলগুলি বেশ ভালোভাবেই দেশের মানুষের ‘পালর্স’ ধরতে পেরে সে অনুযায়ী নীতি-কৌশল নির্ধারণ করেছে? না।
কেন না, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে দেখে নেয়া যাক তারা কী কী বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে যাতে করে দেশের মানুষের মুক্তি ঘটবে!

তারা সরকার সংবিধান স্বীকৃত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ রুদ্ধ করে দমন-নিপীড়নের পথে জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার কথা বলেছেন। জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অত্যাচার, নির্যাতন, হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, রিম্যান্ডে শরীরিক-মানসিক নির্যাতন, অপহরণ, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করেছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিনত করার কথা, আইনের শাসনের কথা, বিরোধী দল ও মতকে গায়ের জোরে দমন করার কথাও বলেছেন। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ ও ভীতি প্রদর্শন,শান্তিপূর্ণ সভা, সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধনেও বাধা প্রদান ও আক্রমন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। পুলিশের পাশাপাশি সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন-ছাত্রলীগকেও সন্ত্রাসী হামলার কথা বলেছেন। মহাজোট সরকারের নজিরবিহীন দুর্নীতি আর দুঃশাসনে দেশের মানুষ আজ দিশেহারা। জবরদখল, ব্যাংক ডাকাতি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সীমাহীন চুরি, লুটপাট, অর্থপাচার, মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি, চরম স্বেচ্ছাচারীতায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নৈরাজ্যসহ এই সমুদয় অপতৎপরতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বিপদজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাও বলেছেন।

শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত যে কোন আন্দোলন, নির্যাতন-নিপীড়ন, ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষক আন্দোলন, সরকারী চাকুরীর কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার, ছাত্রদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দমন করতে সরকার নজিরবিহীন নৃশংসতা ও বর্বরোচিত হামলা-আক্রমণ, ছাত্রলীগকে সশস্ত্র পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করা সবই বলেছেন।

মানুষের জানমালের নিরাপত্তা আজ গুরুতর হুমকির মুখে। নারীর উপর সহিংসতা, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষদের আতংক, হেফাজতে ইসলাম ও ’৭১ এর ঘাতকসহ সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তিকে খোলাখুলি মদত দেয়াও বাদ যায়নি।

চালসহ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বাড়িভাড়া, গাড়ীভাড়া, চিকিৎসাসহ জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, বিশাল বেকারত্ব, অব্যাহত সড়ক দুর্ঘটনা ও পাহাড় ধস, মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ, গার্মেস্টস শ্রমিকসহ শ্রমিকদের মজুরি না বাড়ানো, জাতীয় বাজেটে জনপ্রশাসন, আইন শৃংঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করাসহ কথিত উন্নয়নের রাজনীতি লুটেরা ধনীদেরকে আরো ধনী করছে, বাড়িয়ে তুলছে ধনী গরীবের মধ্যে আয় ও সম্পদের সীমাহীন বৈষম্য- তাও বলেছেন।

এর পর একে একে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা, দেশের মানুষের মতামত উপেক্ষা করে দেশী-বিদেশী লুটেরা ও ভারতকে তুষ্ট রাখতে রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অব্যাহত রাখা, নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে ১ লক্ষ ১৪ হাজার কোটি টাকার রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু করা, বিরোধী দলসমূহের শান্তিপূর্ণ সভা, সমাবেশ, মিছিলসহ সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকেও রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে নানাভাবে দমন করার বিরোধীতা করেছেন।

শেষ দিকে বলেছেন সেই আবেগাক্রান্ত অধ্যায়টিঁ, যেটি হরহামেশা শাসক দলগুলোও ব্যবহার করে, সেই মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে।
“১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের অঙ্গীকার ছিল সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, সেক্যুলার মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে শাসকশ্রেণী সেই রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে; রাষ্ট্র ও সংবিধানসহ গোটা ব্যবস্থাকে চরম বৈষম্যমূলক, অগণতান্ত্রিক, নিপীড়নমূলক ও সাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। স্বাধীনতা উত্তর শাসক-শোষকশ্রেণী ও তাদের দলসমূহের প্রতারণা, নির্মম শোষণ, লুষ্ঠণ, দমন-পীড়ন আর হত্যা-খুনের রাজনীতির কারণে জনগণের স্বপ্ন-আকাঙ্খা বিপর্যস্ত হয়েছে।“

তার পর কোন কোন দগল নিয়ে জোট গঠিত হল তাদের নামোল্লেখ করা হয়েছে। জোটে শরীক রাজনৈতিক দলসমূহ হচ্ছে-বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন।

তারা জোট গঠনের যাবতীয় কর্মকান্ড শেষে আগামী কর্মসূচী সভা-সমাবেশ,মতবিনিময়, বিক্ষোভ প্রদর্শনের কথাও জানিয়েছেন।

এবার ফিরে যাই সেই প্রথমে যে কথা বলতে গিয়ে পজ নিয়েছিলাম- সেখানে।

“বাম গণতান্ত্রিক জোট” গঠনের পর সাংবাদিক সম্মেলনে দেওয়া লিখিত বক্তব্য পড়ে মনে হতে পারে দলগুলি বেশ ভালোভাবেই দেশের মানুষের ‘পালর্স’ ধরতে পেরে সে অনুযায়ী নীতি-কৌশল নির্ধারণ করেছে? একেবারেই না। এরা কোনো দিন বিপ্লব করবেন না। বিপ্লবের কথা বলেনও না। এই জোটের দলগুলো সকলেই নির্বাচনপন্থী বাম দল। তার মানে এরা জোট গঠন করে শক্তিশালী চারটি মহাজোটের সঙ্গে ভোটের লড়াই করবেন। যে লড়াইয়ের প্রধান সরকারের ১৪ দল, বিএনপি’র ২০ দল, ইসলামী দলগুলোর জোট এবং জাপা’র নেতৃত্বে একটি জোট, সেই সঙ্গে আরও একটি সম্ভাব্য জোট। এই সকল ‘হেভিওয়েট’ জোট বা দলের ‘নির্বাচনী ফেরেপবাজীতে’ পারদর্শী টাকাঅলা তথাকথিত সমাজসেবক, ক্ষমতাকেন্দ্রের টুলস বা পার্টস, দেশি-বিদেশী মদদের ‘গডফাদার’ আর সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসির আর্শীবাদপুষ্ট বেনিফিশিয়ারিদের সঙ্গে ডুয়েল লড়ে এই জোটভুক্ত প্রার্থীরা কোন তলানীতে পড়ে থাকবেন সেটা জানার জন্য জ্যোর্তিবিজ্ঞানী হতে হয় না। যাগগে। সেটা তাদের ব্যাপার। যে কথা বলতে চেয়েছিলাম সেটা বলে শেষ করি….

এই যে এত এত অভিযোগ, অনুযোগ, দাবী, অভিপ্রায়, অভিলাষ, আকাঙ্খা, প্রতিশ্রুতি, আশাবাদ, প্রতিজ্ঞা… এর মধ্যে কোথাও কি কৃষক আছে? কৃষকের দুঃখ-কষ্ট আছে? কৃষকের ফসল ফলিয়ে লোকসানের ব্যথা আছে? ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পারা কৃষকের আত্মহত্যার কথা আছে? মধ্যস্বত্ত্বভোগী ক্রিমিনালদের ক্রিমিনালিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও পেটের অন্ন যোগাড় করতে না পারার রক্ষক্ষয়ী কষ্টের স্বীকৃতি আছে? কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আছে? কৃষকের ছেলে-মেয়ের পড়াশুনো করার অধিকারের কথা আছে? সারা বছরের যে ৬ মাস তারা কাজ পায় না সে সময়কার নিদান আছে? মহাজনী ঋণ, এনজিও চিনে জোঁকদের তস্য ঋণ এবং সরকারী ঋণ মওকুফের আশ্বাস আছে? ঘরের টিন খুলে নেবে না সেই প্রতিশ্রুতি আছে?

……. নেই। এসব কিসসু নেই। কেন থাকবে? এরা তো কেউই কৃষকের মুক্তির রাজনীতি করেন না! কৃষককে বছরে একবার রাজধানীতে ডেকে এনে মাথায় লাল পট্টি বেঁধে দুই বেলা খিচুরি খাইয়ে বার কয়েক কোলাকুলি করে কমিটি গঠন করে দেয়াকেই এরা ‘কৃষকের মুক্তির রাজনীতি’ বলেন। যে দেশের প্রায় ১২ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষক এবং যাদের প্রায় চার থেকে সাড়ে চার কোটি ভূমিহীন কৃষিমজুর তারা এদের ভোট দেবে? কেন দেবে? তারা বরং বুর্জোয়া শোষকদের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হবে, তবুও এদের ভোট দেবে না।

এই সহজ-সরল কথাগুলো আর কবে বুঝবেন হে ‘পোড় খাওয়া বিদগ্ধ’ বামপন্থী নেতৃত্ব?

মনজুরুল হক
১৯ জুলাই, ২০১৮

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s