নষ্ট সময়ে নষ্ট সমাজের নষ্ট উপাখ্যান – ১

 

আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন বিনয় ঘোষ সেই চল্লিশের দশকে যুক্তিতক্কো আর সমাজবিজ্ঞানের যুপকাষ্ঠে মেপে ‘বাংলার বিদ্ব্যৎ সমাজ’ লিখেছিলেন। বাংলার নব জারগরণ নিয়ে গর্ব করেছিলেন। সত্তরের দশেকে এসে সেই কথপোকথনকে ‘অতিকথন’ও বলেছিলন! কেন বলেছিলেন, সেটা আমরা প্রতি মুহূর্তে অস্থি-মজ্জায়, শিরায় শিরায় অনুভব করলেও প্রকাশ করতে পারি না। বাংলাদেশের সমাজ আসলে একটা বালের (পত্রিকার জন্য লেখা হলে জগাখিচুড়ি বা গোজামিলের বলা হতো) সমাজ। এই সমাজের ক্রনোলজি বর্ণনা করতে গেলে এই লেখকসহ তামাম শর্মা দিগম্বর হয়ে যাবেন।

 

যে ছবিটি দেখছেন সেটি এই রাজধানী শহরের প্রাচীনতম, অন্যতম, প্রধানতম রমনা পার্কের গেট।‌ গেটের গ্রিলে যে সাইনবোর্ডটি দেখতে পাচ্ছেন তাতে লেখা রয়েছেঃ

“পার্কের অভ্যন্তরে যে কোনো রকম আপত্তিকর অবস্থান করা নিষেধ।“

 

এখন একে একে প্রশ্ন তোলা যাক। ‘আপত্তিকর অবস্থান’ মানে কি? অবস্থান মানে থাকা বা মজুদ থাকা। অর্থাৎ পার্কে থাকতে নিষেধ করা হচ্ছে। ‘আপত্তিকর’ মানে কি? বাংলাদেশের তথাকথিত সোসাল কন্টেস্টে এর মানে হচ্ছে- যা দেখলে আপত্তি জানাতে হয়। অর্থাৎ প্রতিবাদ করতে হয়। সোজা বাংলায় তারা বলতে চেয়েছিল- “পার্কে যৌন সঙ্গম করা যাবে না”। যেহেতু এটা তাদের ভাষয় ভদ্র সমাজ তাই তারা স্বাভাবিক বিষয়টাকে ‘আপত্তিকর’ বলে ঘোষণা দিয়েছে।

 

আবার প্রশ্ন তোলা যাক। ‘আপত্তিকর’ ঠেকছে কার কাছে? কর্মকর্তাদের কাছে। কি দেখে? নারী-পুরুষ অন্তরঙ্গ বসে আছে, অথবা জড়িয়ে ধরেছে, কিংবা চুমু খাচ্ছে। আপত্তিকর বলছেন যারা তারা কারা? পার্কের মালি থেকে সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট। এই পুরো টিম হলো এশটাবলিশমেন্ট। এরা মাঝে মাঝেই দেশের বিভিন্ন পার্কে ছেলে-মেয়ে বসে থাকলে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে নেয়। তারপর তাদের বাবা-মাকে ডেকে আনে। প্রকাশ্যে সেই বাবা-মাকে ভর্ৎসনা করে। ছেলে-মেয়েদেরকে কান ধরিয়ে মাফ চাওয়ায়। শেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। কেউ প্রতিবাদ করলে চালান করে দেয়।

 

এই ধরণের ঘটনা একটি দুটি নয়। প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো পার্কে, উদ্যানে, নদীতীরে, ভ্রমণকেন্দ্রে, বিনোদনকেন্দ্রে ঘটানো হয়। এবং ফলাও করে পত্রিকায় ছাপানোও হয়। সেই দৃশ্যে দেখা যায় কম বয়সী মেয়েগুলো ওড়নায় মুখ ঢেকে রেখেছে! ছেলেগুলো মাথা নিচু করে আছে। সংবাদপত্রের ধীমানদের বিবেচনায় আসে না এতে ওই ছেলে-মেয়েগুলোর মর্যাদাহানী হচ্ছে!

 

এই যে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব গ্রেপ্তার করালেন। কোন আইনে? বাংলাদেশের সংবিধানে এরকম কোনো আইন নেই। ভদ্র সমাজে কি কি করতে হবে আর কি কি করা যাবে না সেটা সংবিধানের মত গ্রন্থে লেখা থাকে না। থাকা শোভন নয়। তার পরও ম্যাজিস্ট্রেট কোন অধিকারে ক্ষমতা ফলায়?
ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা দেখে নেয়া যাক।

 

কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (১৮৯৮) এর তৃতীয় অধ্যায় অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সাধারণ ক্ষমতাসমূহ:

১। ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে অপরাধ করলে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা অথবা হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা। (ধারা ৬৪)

২। কারও উপস্থিতিতে তাকে গ্রেপ্তার অথবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ক্ষমতা। (ধারা ৬৫)

৩। অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুমোদন বা বাতিল করা। (ধারা ৮৩,৮৪,৮৬)

৪। পোস্টাল ও টেলিগ্রাফ বিভাগের দলিলাদি তল্লাসি ও জব্দ করার ক্ষমতা। (ধারা ৯৫)

৫। কোন ব্যক্তির অবৈধ সম্পদ যাচাই করার জন্য তল্লাসি পরোয়ানা জারির ক্ষমতা। (ধারা ১০০)

৬। সরাসরি তল্লাসির ক্ষমতা, তার উপস্থিতিতে যে কোন স্থানে তল্লাসির পরোয়ানা জারির ক্ষমতা।(ধারা ১০৫)

৭। শান্তি বজায় রাখার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী দাবির ক্ষমতা।(ধারা ১০৭)

৮। ভবঘুরে ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সদাচরণ নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনী দাবির ক্ষমতা।(ধারা ১০৯)

৯। নিয়মিত অপরাধীদের সদাচরণ নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনী দাবির ক্ষমতা।(ধারা ১১০)

১০। জামিন খারিজ করার ক্ষমতা।(ধারা ১২৬)

১১। বেআইনি সমাবেশ ভঙ্গ করার ক্ষমতা। (ধারা ১২৭)

১২। ভঙ্গ করতে নাগরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা।(ধারা ১২৮)

১৩। বেআইনি সমাবেশ ভঙ্গে সামরিক বাহিনী দাবি করার ক্ষমতা।(ধারা ১৩০)

১৪। স্থানীয় সমস্যারোধে নির্দেশদানের ক্ষমতা।(ধারা ১৩৩)

১৫। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিতাদেশ জারির ক্ষমতা। (ধারা ১৪২)

 

তাহলে কি দাঁড়াল? ছেলে-মেয়ে বা নারী-পুরুষ পার্কে ঘনিষ্ট হয়ে বসলে, জড়িয়ে ধরলে, চুমু খেলে (এর বেশি কিছু কখনও হয় না। হওয়ার সুযোগ নেই) ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার আওতায় পড়ে না। বিচারিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তারপরও কেন তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন? ওই সেই এক নম্বর ক্ষমতা- “ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে অপরাধ করলে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা অথবা হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা। (ধারা ৬৪)”। তার মানে ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই বলবে ‘আমার সামনে করেছে, আমি দেখেছি’। ব্যস সেটাই আইন হয়ে গেল এবং ৬৪ ধারায় পড়ে গেল।

 

এই সচিব, ম্যাজিস্ট্রেট, কর্মকর্তা, কেরাণী, চাপরাশী, দারোয়ান-এর যে সার্কিট সেটা কোন সমাজ থেকে জন্ম নিয়েছে, কোন সমাজে এরা বেড়ে উঠেছে এবং কোন সমাজে শিক্ষাদীক্ষা পেয়ে আইন প্রণয়ন, বলবত এবং প্রয়োগের অধিকার পেয়েছে?

 

*যে সমাজে বাবা তার কিশোর ছেলেকে নিয়ে গাই গরুকে, ছাগীকে ম্যাটিং করাতে যায়।
*যে সমাজে কিশোরী মেয়েটিকে দামড়া একটা লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে পরদিন সতিচ্ছেদ ছেড়ার রক্তমাখা তুলা দেখতে চাওয়া হয়।
*যে সমাজে ছেলেকে বিয়ে কারতে নিয়ে মেয়ের যৌবন দেখে পাগল বাপ নিজেই বিয়ে করে আনে।
*যে সমাজে তিন-চারজন স্ত্রীকে এক ঘরে নিয়ে মোলবীটাইপ জোতদার ধণী গ্রাম্য পুরুষ গ্রুপ সেক্স করে।
*যে সমাজে গ্রামের প্রায় ৯৫ শতাংশ ছেলের পায়ূকামের অভিজ্ঞতা হয়ে যায়।
*যে গ্রামীণ সমাজের ৭০/৮০ ভাগ কিশোরী চাচাতো,মামাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাই দ্বারা ধর্ষীতা হয়, এবং তা প্রকাশ করলে মেয়েটিকে চরম গঞ্জনা সইতে হয়।
*যে সমাজে পুরুষ যেখানে সেখানে মুততে বসে, মোলবীরা ঢিলা নিয়ে লুঙ্গির তলে লিঙ্গে ঘসে আর ৪০ কদম হাটে প্রকাশ্যে ছেলে-মেয়ে-বউ-ঝিদের সামনে।
*যে সমাজে একই খাটে বা মাটিতে প্রায় কৈশোর পেরুনো ছেলে-মেয়ের উপস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রী সঙ্গম করে। স্ত্রীর পরিতৃপ্তির কোনো ব্যাপার নেই, স্বামী তৃপ্ত না হলে গর্জন দিয়ে যৌনপথের আকার নিয়ে বিশ্রী গালাগাল করে যা ছেলে-মেয়ে পষ্ট শোনে।
*যে সমাজে সন্তান না হলে অবধারিতভাবেই নারীকে দোষারোপ করে তালাক দেয়া হয়।
*যে সমাজে একই ঘরে বাঁশের বেড়ার ওপাশে বাবা-মা, এপাশে ছেলে, ছেলের বউ সঙ্গম করে।
*যে সমাজে শিক্ষিত জনরাও তালাপ্রাপ্ত মেয়েটিকে বলে ‘ভাতারের ভাত খাইতে পারে নাই’।
*যে সমাজে রগড়-কৌতুক, চুটকি, প্রবাদ আর শিক্ষামূলক বাণী বক্তব্যের বেশির ভাগই যৌনাঙ্গ নির্ভর এবং তা নারীর যৌনাঙ্গ। ‘কচু দেব’ বলতে যে মান কচু যৌনাঙ্গে প্রবিষ্ট করানোর ইচ্ছাকে বোঝায় সেটাও ৫% মানুষ জানে না।
*যে সমাজের উচু তলায়, বনেদি পাড়ায় শত শত রেস্তোরায় নিবু নিবু আলোয় টিনেজরা মিলিত হয়। টাকা দিয়ে পাশের রুম খুৃলে দেয়।
*যে সমাজে একজন গার্মেন্ট নারী শ্রমিককে বাসার দারোয়ান থেকে ফ্যাক্টরি মালিক পর্যন্ত সিরিয়াল রেপ করে। কখনও কখনও সেটা রেপ না হয়ে গিভ এন্ড টেক হয়।
*যে সমাজে রচিত পল্লিগীতি, ভাবগীতির অর্ধেকই যৌনতাকেন্দ্রিক।
*যে সমাজে যোনী-শিশ্ন শব্দ দিয়ে কবিতা না লিখলে ‘নাম ফোটে’ না।

 

মোটামুটি এইরকম একটি সমাজ থেকেই ওই সচিব, কর্মকর্তা, পিয়ন-দারোয়ান লেভেলের প্রশাসনিক গ্রুপ উঠে আসে। এখানে কেবলমাত্র যৌনতা বা যৌনকেন্দ্রিক ঘটনাবলি কথা তোলা হলো। অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন তো বিরাট কলেবরের শয়তানী। ম্যাজিস্টেটরা আরও কত কত জায়গায় কি কিভাবে ক্ষমতার দাম্ভিকতা দেখায় সেটা তো প্রায়শঃই পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয় ছবিসহ! স্কুল শিক্ষক ম্যাজিস্ট্রেটের পা-ধরে মাফ চাইছে- এই দৃশ্যটা যে দেশে প্রচার হয় এবং তেমন কোনো প্রতিকার হয় না। সে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থাটাও একটা বালের ব্যবস্থা (পত্রিকায় হলে অকার্যকর ব্যবস্থা বলা হতো)!

 

অথচ এই দেশটা সভ্যদের দেশ হলে, সমাজটা সভ্য-ভব্য এবং শিক্ষিত মানবিকতার সমাজ হলে ওই ম্যাজিস্ট্রেটকেই আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখিন করা যেত। এই ম্যাজিস্ট্রেট, কর্মকর্তা, কেরানীকুল, পিয়ন-চাপরাশি, দারোয়ান-ড্রাইভারের দঙ্গল রাজনৈতিক কোটায় ক্ষমতাধর হওয়া লোকজন। ছিল গরু চরাবার যোগ্যতা, হয়ে গেছে শিক্ষক। ছিল চিটেগুড়ের দোকানদারির মেন্টালিটি, হয়ে বসেছে ম্যাজিস্ট্রেট! এরা বেসিক্যালি যৌন অতৃপ্তি থেকেই পার্কে ছেলে-মেয়েকে বসে থাকা দেখলে পার্ভারশন ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়। ক্ষমতা প্রয়োগ করে ধরে এনে সামন্ত জমিদারের মত বাবা-মাকে ডেকে নসিয়ত করে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দেয়। আর এই রাষ্ট্র সেই সব মেঠো বজ্জাতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই বুঝি এ ধরণের সাইনবোর্ড দেখেও তা ঝুলতে দেয়! আমরা শুনি, দেশে নাকি এখন শিক্ষার হার ৬৫% ছাড়িয়েছে!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s