পাটকল নিয়ে তুঘলকী কারবারের পেছনে মূল উদ্দেশ্য কারখানাগুলো নিজেদের লোকের হাতে তুলে দেওয়া!

 বাঙালি অদ্ভুত এক জাতি! তার চরম সর্বনাশের ঘটনাও সে পয়ার করে বলে! ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে কাঁদে! নিজেদের দুর্দশা নিয়ে স্থুল রসিকতা করে! অনেক আগে যখন বাংলাদেশে পাট আর চা-পাতা ছাড়া আর কোনো রপ্তানি পণ্য ছিলনা সে সময় দেশের অর্থনীতি কার্যত পাটকেন্দ্রিক ছিল। সেই সূত্র ধরে দেশের মিডিয়াও পাটকেন্দ্রিক খবরা খবর বেশী প্রকাশ করত। সে সময় মাঝে মাঝেই পত্র-পত্রিকায় শিরোনাম হত- ‘সোনালী আঁশ গলার ফাঁস’! সে সময় না হোক, এখন যে সোনালী আঁশ তথা পাট জনগণের জন্য, বিশেষ করে পাটকলের শ্রমিকদের জন্য গলার ফাঁস সেটা দগদগে ঘা হয়ে চোখের সামনে ফুটে রয়েছে।

 

পাটশ্রমিকদের দুর্দশার খবর জানার আগে আমাদের জানা দরকার; সরকার আসলে পাট নিয়ে কি করতে চায়? এর উত্তরে তিনটি সম্ভবনা উঠে আসে। এক. সরকারের ঘোষণামতে পাটের উন্নয়ন ঘটাতে চায় (যার কোনো বাস্তব উপস্থিতি নেই)। দুই. সরকার সরকারী মিল-কারখানাগুলো বন্ধ করে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রি বা ব্যক্তিমালিকানার কারখানা বসাতে উৎসাহ দিতে চায়। এবং তিন. সরকার পাট শিল্পটাকেই তুলে দিতে চায়, যেমন গত টার্মের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল বলেছিলেন- সকল চিনিকল তুলে দেয়া হবে। আঁখচাষ একটি বাজে জিনিস।

 

এবার তলিয়ে দেখা যাকঃ

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জুটমিল আমদজী পাটকল অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও ঢাকার ডেমরায় হাতেগোনা কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল টিকে রয়েছে। কিন্তু সে পাটকলগুলোর শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা পরিসীমা নেই। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে শ্রমিকরা যে পরিমাণ টাকা ‘সপ্তাহ’ পান তা দিয়ে তাদেরকে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ এবং মাসের পর মাস ‘সপ্তাহ’ না পাওয়ায় মানবিকভাবে বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ে গেছে সারাদেশের পাটকলে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক। বাধ্য হয়েই তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের সাথে চলছে প্রতারণা। এ যেন শুভঙ্করের ফাঁকি।
বারবার বঞ্চনা আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির শিকার হয়ে ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে পাটকল শ্রমিকরা। দফায় দফায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ফলাফলও শূন্য। শ্রমিকরা ক্ষোভে বিক্ষুদ্ধ। রাজপথ-রেলপথে আন্দোলন অব্যাহত থাকায় জনদুর্ভোগ এখন চরমে। অথচ বিজেএমসি ঠুটোজগন্নাথের মত কেবলই সাক্ষী গোপাল। রামজানে পাটকল শ্রমিকদের সেহরি ও ইফতারীবিহীন মানবেতর জীবন কেবল শ্রমিক পরিবারেই প্রভাব ফেলেনি। বরং এই বেদনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে আমজনতার প্রতিটি ঘরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে পাটকল শ্রমিকদের রাস্তায় ইফতারি আর মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র এখন ভাসছে।

 

বকেয়া বেতন পরিশোধ ও মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে পাটকল শ্রমিকরা গত ২ এপ্রিল থেকে ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এরপর ১৫ এপ্রিল থেকে তারা ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু করেন। ১৫ এপ্রিল রাতে সচিবালয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও বিজেএমসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পর তাদের আশ্বাসে শ্রমিক নেতারা কর্মসূচি স্থগিত করেন। ওই বৈঠকে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে বকেয়া সব মজুরি পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

 

এ পর্যন্ত দেখার পর কি মনে হয়? সরকার পাটকল বাঁচিয়ে রাখতে আন্তরিক? মোটেই না। তাহলে শ্রম প্রতিমন্ত্রী এটা কি বললেন?

“শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, সার্বিক অবস্থা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কাজ চলছে। শিগগিরি এর সুষ্ঠু সমাধান হবে। শ্রমিকদের প্রতি আমাদের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই। কিছু দাপ্তরিক জটিলতার কারণে একটু সময় লাগছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর গোচরিভূত রয়েছে এবং তা দ্রুত সুরাহা হবে। আবার প্রতিমন্ত্রীর চেয়ে এককাঠি এগিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মিজানুর রহমান বলেন, ‘আসলে শ্রমিকরা যে দাবি করছে তা সঠিক নয়। কারণ সরকারের কাছে তারা বকেয়া মজুরী পায় না। শ্রমিকরা মজুরী পায় পাটকল মালিকদের কাছে। তার পরও সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও শ্রম ও কর্মসংস্বার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ শ্রমিক নেতারদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। ক্রমাগত লোকসানের কারণে সরকার এ খাতে অনেক ভর্তুকি দিয়েছে। আর কত দিবে সরকার।‘

 

বোঝা গেল ব্যাপারটা? ‘ক্রমাগত লোকসানের কারণে সরকার এ খাতে অনেক ভর্তুকি দিয়েছে। আর কত দিবে সরকার।‘ এর মানে হল; সরকার আর লোকসানের ঘানী টানবে না। মন্ত্রিটন্ত্রির বাণী কাজের কিছু না। সচিব যেটা বলে সেটাই এদেশে ‘আইন’। অর্থাৎ শ্রমিকরা যতই ধর্মঘট করুক, আন্দোলন করুক কোনো লাভ সেই। সরকার নমনীয় হবে না, কেননা সরকার বলেই দিয়েছে-‘আসলে শ্রমিকরা যে দাবি করছে তা সঠিক নয়। কারণ সরকারের কাছে তারা বকেয়া মজুরী পায় না। শ্রমিকরা মজুরী পায় পাটকল মালিকদের কাছে।‘

 

এখন রাষ্ট্রায়াত্ব কারখানার মালিক কি সরকার নয়? এই প্রশ্নটা কাকে করা যাবে? এই সচিব? তিনি কি করে বলে বসলেন-সরকারের কাছে তারা বকেয়া মজুরি পায় না? এটা মোটেই মেধার সংকট নয়, এটা হলো ক্ষমতাদম্ভি বক্তব্য। দেশটাকে বাপের তালুক মনে করা।

আসল ঘটনা কোথায়? সাধারণ শ্রমিকদের সংগঠিত করতে ৯ দফা দাবি কথা বলেছেন আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শ্রমিকরা। নিয়মিত সপ্তাহিক মজুরি ও বেতন প্রদান, সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি, উৎপাদন শীলতা কমিশন-২০১৫ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ-গ্র্যাচুইটি ও মৃত শ্রমিকদের বীমার বকেয়া প্রদান, সেটআপ অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ী করা, পাট মৌসুমে পাট কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করা।
কোনও রকমে সরকারকে যদি টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল করার দাবি বাস্তবায়নে রাজি করানো যায় তাহলে অন্য দাবি পূরণ না হলেও পাটকলে শ্রমিক আন্দোলন থেমে যাবে বলে মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা চলমান পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

 

অর্থ মন্ত্রণালয়ে সূত্র কী জানাচ্ছে? ‘সরকার বিজেএমসিকে ২০১২ সালে ১০৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ১৩৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ৬১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ৮০ কোটি ০৬ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ৪৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, ২০১৭ সালে ৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকা (সাময়িক), ২০১৮ সালে ১০৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা (সংশোধিত) ভর্তুকি বাবদ দিয়েছে। খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলে প্রায় ৩২৫ কোটি টাকার পাটজাত রফতানি পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের মূল বাজার সুদান, ঘানা, সিরিয়া, ইরান ও ভারত। কিন্তু প্রায় এক বছর এ সব দেশে পণ্য বিক্রি বন্ধ রয়েছে। ফলে মিলগুলো আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে।

 

মজুরী কমিশন বাস্তবায়নসহ ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে পাটকল শ্রমিকদের ডাকা ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করছে নরসিংদীর ইউএমসি জুট মিলস ও ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলসের শ্রমিকরা। ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘটের প্রথম দিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত নরসিংদীর সাটিরপাড়া-কামারগাঁও আঞ্চলিক সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে রাখে।
এছাড়া ইউএমসি জুট মিলের সামনে জামতলা পৌর শ্রমিক মঞ্চে অবস্থান ধর্মঘট করে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে পাটকল শ্রমিকরা। অন্যদিকে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলে শ্রমিকদের ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু হয়েছে। খুলনার খালিশপুরে সমাবেশ করে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে তারা। খুলনায় ১২ এপ্রিল থেকে পাটকল শ্রমিকদের ১০ দিনের আন্দোলন শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ এপ্রিল বিজেএমসির ২২ পাটকলে ৯৬ ঘণ্টা ধর্মঘট ও সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজপথ রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে আন্দোলনকারীরা’।

 

এবার দেখা যাক সরকারী কারখানা বন্ধ হলে কাদের লাভ?

পাটকে কেন্দ্র করে খুলনা অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটি পাটকল। ৫০ থেকে ষাটের দশকে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা এসব পাটকল দেশ স্বাধীনতার পর করা হয় জাতীয়করণ। বাংলাদেশ পাটকর্পোরেশন বা বিজেএমসির তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে এগুলো। কিন্তু আশির দশক থেকেই শুরু হয় লোকসান। এক পর্যায়ে পাটকলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হতে থাকে। ইতোমধ্যে পাটকলগুলো ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিতে দিতে এখন বিজেএমসির আওতাধীন চালু আছে মাত্র ৭টি। এরমধ্যে ৫টি খুলনায় ও দুটি যশোরের নওয়াপাড়ায়। বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতাধীন চালু থাকা এসব পাটকলের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারের পথে তা অনেকটা স্পষ্ট। পাটকল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা দূর করে যথাসময়ে অর্থাৎ পাট মওসুমে অর্থ ছাড় না দেয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারে লুটপাট বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া হলে পাটের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

 

সাম্প্রতিককালে বিদ্যুতের লোডশেডিং লোকসানের প্রধান কারণ হলেও দীর্ঘদিনের সমস্যার মধ্যে রয়েছে সরকারের অদূরদর্শীতা। বিশেষ করে পাট মওসুমে অর্থ ছাড় না দিয়ে একদিকে যেমন অসময়ে অধিক মূল্যে এমনকি দ্বিগুণ বা তিনগুণ মূল্যে পাট কেনার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আর যথাসময়ে টাকা ছাড় না দেয়ার পেছনেও এক শ্রেণীর পাট ব্যবসায়ী, গোডাউন মালিক এমনকি মধ্যসত্ত্বভোগী শ্রেণীর কিছু ব্যক্তির আঁতাত রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিজেএমসি ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাথে আঁতাত করে যথাসময়ে যাতে টাকা ছাড় না দেয়া হয় সে ব্যবস্থাকরণ আবার বাজার দরের চেয়ে বিজেএমসির রেট কমিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ বিজেএমসি বাজার দরের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় পাট চলে যায় সিপারদের কাছে। কিন্তু ঐ পাটই মাত্র ৪ থেকে ৬ মাস পর আবার বিজেএমসির নির্দেশে মিলগুলো অধিক মূল্যে কিনতে বাধ্য হয়। এটি যেমন সরকারি দূরদর্শীতা এবং সঠিক তদারকির অভাব তেমনি পাট স্ব-স্ব মিলের সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে পাট কর্মকর্তা, প্রকল্প প্রধান, বিজেএমসির কিছু কর্মকর্তা এমনকি পাট মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পার্সেন্টেজ চলে যাবার নজিরও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এ পার্সেন্টেজ মণপ্রতি ২% থেকে ৫% পর্যন্ত রয়েছে।বিষয়টি অনেকটা ওপেন সিক্রেট হওয়ার পরও কোন পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। যে কারণে বেশি দাম দেয়ার পরও নিম্ন মানের পাট মিলে প্রবেশ করানো হচ্ছে দেদারসে। এর ফলে উৎপাদনেরও বেশি সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে। পাটক্রয়ে দুর্নীতি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত লোকসান কমানো সম্ভব নয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পাটকলের সিবিএ নেতা, পাট কর্মকর্তা, প্রকল্প প্রধানদের আর্থিক বিষয়টি তদন্ত করলেই এর সত্যতা প্রমাণ করা যাবে। অনেক সময় কাগজে কলমে লাখ লাখ টাকার মালামাল কেনার কথা উল্লেখ করে বিল তুলে নেয়া হলেও বাস্তবে তা মিলে যায় না। আর এর সাথে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তি ঐ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। এভাবে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও দেখার যেন কেউ নেই। পাটকলের দৈন্যদশার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে শ্রমিক নিয়োগে ঘাপলা, সিবিএ’র অযাচিত হস্তক্ষেপ ও কাজ না করে মজুরী নেয়ার প্রবণতা, শ্রমিক কর্মচারী, কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় মেরামত না করা, যন্ত্রাংশের মূল্য অধিক দেখানো, মেশিনারীজের বিএমআরই না করা, যন্ত্রাংশ ও লোহালক্কড় গোপনে সরিয়ে ফেলা, ভুয়া হাজিরা দেখানো, নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার না করা ও নতুন পণ্য উৎপাদন না করা প্রভৃতি। এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলে প্রতিনিয়ত লোকসান হলেও খুলনার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে একাধিক ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকল।

 

আসলে সরকার তার মালিকানাধীন কলগুলো চালাতে পারছে না। কীভাবে? দেখো যাকঃ

লোকসান ও অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারি পাটকলগুলো প্রায়ই শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারে না। অবিক্রীত পণ্য গুদামে পড়ে থাকে। প্রতিবছরই পাটের মৌসুমে কাঁচা পাট কিনতে সরকারের কাছে হাত পাততে হয়।

 

পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ২৫টি। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও ৩টি নন-জুট। মিলস ফার্নিশিংস লিমিটেড নামের নন-জুট কারখানা ছাড়া বাকি ২৪ প্রতিষ্ঠান লোকসানে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিজেএমসির পাটকলগুলোর (জুট ও নন-জুট) লোকসানের পরিমাণ ছিল ৪৮১ কোটি টাকা।

 

সরকারি পাটকলের এই লোকসানের প্রবণতা অনেক পুরোনো। স্বাধীনতার পর দু-এক বছর ছাড়া প্রতিবছরই এসব পাটকল লোকসান দিয়েছে। সরকারের বোঝা কমাতে অতীতে বেশ কিছু পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ পাট খাতকে লাভজনক করার অঙ্গীকার করে। তারা ক্ষমতায় আসার পর বিজেএমসিকে লাভজনক করতে কর্মপরিকল্পনা করে। এটি বাস্তবায়নে সরকার বিজেএমসির দেনা পরিশোধ করতে ৫ হাজার ২৪১ কোটি টাকা দেয়। এই অর্থ দিলে ভবিষ্যতে বিজেএমসির জন্য আর কোনো আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হবে না—এ শর্তে পাট মন্ত্রণালয়, বিজেএমসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া খুলনার খালিশপুর জুট মিলস, দৌলতপুর জুট মিলস, সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাম কার্পেটস ফ্যাক্টরি ফিরিয়ে নিয়ে চালু করে সরকার।

 

কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। লোকসান হতেই থাকে। বেসরকারি খাত থেকে ফিরিয়ে নেওয়া মিলগুলোও বড় লোকসান দিতে থাকে। চলতে থাকে সরকারের কাছে হাত পাতা। ২০১৫ সালে পাট মন্ত্রণালয় বিজেএমসির জন্য ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালু করে মারাত্মক ভুল করেছে।’ এ বছরও কাঁচা পাট কিনতে সরকারের কাছে ১ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে বিজেএমসি।

 

জাস্ট একটা চিঠিতে ‘আমার মনে হয়, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালু করে মারাত্মক ভুল করেছে।’ বলে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল! তাহলে এখন যদি বলা হয়- সরকার নিজেই চাইছে সব পাটকল বন্ধ হয়ে যাক, তাহলে কি ভুল বলা হবে?

 

সরকার নিয়ন্ত্রিত পাটকলের ৭০ হাজার শ্রমিক অধিকার বঞ্চিত। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তারা প্রাপ্য ও ন্যায্য মজুরি পাননি। টানা দশ সপ্তাহ মজুরি না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাধ্য হয়েছেন আন্দোলনে নামতে। পাটকল শ্রমিকদের জন্য চার বছর আগে নতুন জাতীয় মজুরি স্কেল ঘোষণা করা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। গত ৪ বছরে পাটকল শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি বকেয়া পড়েছে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।

সরকার পাটকলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়, অথচ মজুরি পান না শ্রমিকরা। এ এক ভানুমতির খেল অথবা মাদারীর খেল! ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও বিজেএমসিকে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৭৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর লোকসান দিয়েছে ৪৬৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। কিন্তু বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং পাটকলগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দিতে কোনো সমস্যা না হলেও শ্রমিকদের মজুরি দিতে গিয়েই যত সমস্যা বিজেএমসির।

সরকারি পাটকলের সংকট ও শ্রমিকদের দুর্দশা জিইয়ে রেখে বিজেএমসির কিছু লোক ফায়দা নিচ্ছেন বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটশিল্পের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি পাটশিল্পের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। সেখানে বিজেএমসি হাঁটছে ঠিক তার উল্টো পথে। প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলোর বাস্তবায়ন করতে হলে তো সবার আগে বিজেএমসিকে জেগে উঠতে হবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কাঁচাপাট এবং বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে। এ চাহিদা পূরণে বেসরকারি অনেক মিলমালিক কিন্তু ভালো করছে, কোটি কোটি টাকা লাভ করছে।
আহা! কি অমৃত বাণী! সাফাই গাওয়া এইসব বাণী প্রদানকারীরাই সরকারের বৈমাত্রীয় নীতিকে সহনীয় করে গ্রহণযোগ্য করার হাতিয়ার বানিয়ে দেয়।
সরকারি মিলগুলো কেন লাভ করতে পারবে না? কেন বিজেএমসি তার মিলগুলোর শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারছে না? কেন সরকারি পাটকলের শ্রমিকদের মজুরির জন্য রাজপথে নামতে হবে? সরকারি শ্রমিকদেরই যদি রাজপথে নামতে হয় তাহলে বেসরকারি বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রকিরা কোথায় যাবে? এইসব ভাইটাল প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট কারো কাছে।

বিজেএমসি সূত্র মতে, ৩টি নন জুটসহ বিজেএমসির অধীনে সরকারি ২৬টি মিল রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে ৭টি, চট্টগ্রামে ১০টি ও খুলনা অঞ্চলে ৯টি রয়েছে। তবে বর্তমানে চালু রয়েছে ২৫টি।

এসব কারখানায় কর্মরত রয়েছেন ৭৫ হাজার ৫০০ জন শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা। এর মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যা হচ্ছে ৭০ হাজার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫ হাজার ৫০০ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়ে কোনো সমস্যা না হলেও ৭০ হাজার শ্রমিকের মজুরি নিয়েই যত ঝামেলা।

এ ছাড়া ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর পর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম খানকে চেয়ারম্যান করে ‘জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫’ গঠন করা হয়। কমিশন রাষ্ট্রায়ত্ত শ্রমিকদের এই বেতন ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করে। এই কমিশন গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম ৮ হাজার ৩০০ টাকা ও সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল।

এর আগে ‘জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন ২০১০’ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ মজুরি ৫ হাজার ৬০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৪ হাজার ১৫০ টাকা নির্ধারণ করে। বর্তমানে এই হারেই পাটকল শ্রমিকরা মজুরি পান, তাও আবার বকেয়া রয়েছে ১০ সপ্তাহ ধরে।

এরপর গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানার শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে সংসদে পণ্য উৎপাদনশীল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্রমিক (চাকরির শর্তাবলি) বিল-২০১৮ পাস হয়। এতে সরকারি শ্রমিকদের বেতন শতভাগ বাড়ানো হয়।

সবকিছু চূড়ান্ত হলেও বিজেএমসি ফান্ড ক্রাইসিসের কথা বলে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।

অবশ্য বিজেএমসি সূত্র বলছে- এতদিন নতুন মজুরি বাস্তবায়ন নিয়ে বিজেএমসি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলেও শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একটু নড়েচড়ে বসেছে। বিজেএমসি গত ২ এপ্রিল সরকারি সব পাটকলে চিঠি পাঠায়। ‘জাতীয় মজুরি স্কেল-২০১৫ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত’ শিরোনামের ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘সব মিলের আওতাধীন শ্রমিকদের ১ জুলাই ২০১৫ হলে জাতীয় মজুরি স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

বিজেএমসির এ নির্দেশের ওপরও আস্থা রাখতে পারছেন না শ্রমিকরা। মজুরি কাঠামো ঘোষণার ৪ বছর পর বিজেএমসি সবেমাত্র চিঠি চালাচালি শুরু করেছে। এ চিঠি অনুযায়ী পাটকলগুলোর জেনারেল ম্যানেজাররা কবে প্রক্রিয়া শুরু করবে, কবে সেগুলো হেড অফিসে পাঠাবে আর কবে বাস্তবায়ন হবে কেউ জানে না।

 

এবার আমরা একটা সারসংকলন দাঁড় করাতে পারি। এইসকল খবর, তথ্য-উপাত্য দেখে এটা বোঝা যাচ্ছে সরকার মুখে মুখে যতই সদিচ্ছার কথা বলুক, সরকারের নীতি পরিষ্কার। সরকার চায় সরকারী মালিকানাধীন কারখানাগুলো দ্রুত ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দিতে। তাতে করে লোকসান হলে তার দায় মালিকের ওপর বর্তাবে। লাভ হলে তার ভাগ সরকার পাবে। আর ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়ার সময় সেই ‘ব্যক্তিবর্গ’ কারা একথা খুলে বলার দরকার করে না। তো নিজেদের দলীয় বা শ্রেণির কিংবা ইজমের লোকজনের কাছে পানির দরে কারখানাগুলো ছেড়ে দেয়াই যে সরকারের ‘মূল’ এজেন্ডা সেকথা শ্রমিকরাও বোঝেন, জানেন। তার পরও তাদের করণীয় কিছু নেই। কেন নেই সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন। তাহলে কি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে যারা শ্রমিকদের নিয়ে সংগঠন করেছেন তারা শ্রমিকদের ভুল পথে চালিত করছেন? নাকি তারাও সরকারের ‘এজেণ্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি নিয়েছেন?

যে উত্তরে তিনটি সম্ভবনার কথা প্রথমেই বলা হয়েছে এক. সরকারের ঘোষণামতে পাটের উন্নয়ন ঘটাতে চায় (যার কোনো বাস্তব উপস্থিতি নেই এবং সেটা একেবারে খোলাখুলিই)। দুই. সরকার সরকারী মিল-কারখানাগুলো বন্ধ করে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রি বা ব্যক্তিমালিকানার কারখানা বসাতে উৎসাহ দিতে চায়, আর তার প্রমাণও বিভিন্নভাবে পাওয়া গেছে।

 

এসবের মধ্যে সরকার পাট শিল্প নিয়ে ভবিষ্যকে কি কি পদক্ষেপ নেবে তার ফিরিস্তি দেয়ার জন্য বিসিএস ক্যাডাররা তো বসে আছেই। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে সেসবের ফিরিস্তি দেবে। মাস গেলে বিদেশ ভ্রমণ করবে। পাট নিয়ে ঢাউস একটা মন্ত্রণালয় আর কোটি কোটি টাকা পয়মাল করবে, সেসবই তাদের উন্নয়নের রোডম্যাপে অঙ্কিত রয়েছে।

 

মনজুরুল হক

২২ মে, ২০১৯

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s