আবারও স্তালিনবিরোধীতার দালালি খ্যাপ নিয়ে নাটকের প্রদর্শনী!

স্তালিনকে নিয়ে তামাম পুঁজিবাদী বিশ্বের গাত্রদাহের একাধিক কারণ পাওয়া যায়। তারা মোটা দাগে এক ছোটখাট কম শিক্ষিত ‘বংশ মর্যাদাহীন’ আধা এশীয় জর্জিয়ান স্তালিনের বিশ্বনেতৃত্ব মেনে নিতে পারেন না। তাদের ইউরো-মার্কিন শ্যেভনিজমে ঘা লাগে। কমিউনিস্ট স্তালিনের হাতে দোর্দন্ড প্রতাপশালী বিম্বজয়ী হিটলার পরাস্ত হলে যুদ্ধজয়ের নিয়ম অনুযায়ী স্তালিনই বিম্বজয়ী নেতা। সেট তারা হজম করেন কিভাবে? সেই থেকে আজও তারা কোটি কোটি ডালারে বাজেট করে স্তালিনের বিরুদ্ধে গোয়েবলসীয় প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছে। যদিও বহুবার সেই সব মিথ্যাচার খণ্ডন করা হয়েছে।তার পরও ‘তালগাছ’ তাদের!

সে না হয় হলো, কিন্তু বাঙালি বুদ্ধিব্যাপারিরা কোন সুখে পশ্চিমা পুঁজিবাদের পা-চেটে স্তালিন বিরোধীতা করে মর্ষকামী সুখ পায় সে এক রহস্য বটে! এরকম ডজন ডজন আফলটপকা ম্যান্দামারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এর উপর খানা কতক ‘চটি’ পড়া পাবলিকের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে একটা বই লিখেছি। সেখানে প্রমাণও করেছি; কীভাবে পরিকল্পনা করে স্তালিনবিরোধীতা করা হয়েছে? কবে থেকে করা হয়েছে? কারা কারা করেছে? পেছনের উদ্দেশ্য কী ছিল? কিভাবে কোন কোন সেক্টর দেদার পয়সা খরচ করে আলেকজান্দার সেলঝোনেৎসিনের মত ভাঁড়কে কিনে নিয়ে নোবেল দিয়ে তাকে দিয়ে স্তালিনের চরিত্রে কালিমা লেপন করার চেষ্টা হয়েছে। সব। সেই সব তথ্য-প্রমাণ আমাদের বুদ্ধিব্যাপারিরা পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

আর তাই এনজিওর টাকা গিলে তাদের কথা মত এবং নিজেদের বিকৃত প্রগতিশীল জ্ঞানগম্মি নিয়ে কেউ স্তালিনবিরোধী বই লেখেন, কেউ নাটক বানান। এবার তেমনই একটি নাটক বানিয়েছেন কামাল উদ্দীন নীলু। নাম দিয়েছেন স্তালিন (আমি ইচ্ছে করেই নাটকটির পোস্টার এখানে ছাপছি না। কমেন্ট বক্সে দেয়া হলো)

সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (ক্যাট) ‘স্তালিন’ শিরোনামে একটি নাটক নামিয়েছে। গত (১০ মে) শিল্পকলা একাডেমীতে এর প্রথম শো ছিল। প্রদর্শনী শেষে তুমুল হট্টগোল শুরু হয় কারণ, নাটকের কাহিনীতে স্তালিনকে লেনিন-বিরোধী ও স্বৈরতন্ত্রী এবং নানা পন্থায় খাটো করে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপস্থিত সাধারণ মানুষ নাটকটি প্রতিহত করার ঘোষণা দিলে পাল্টা নির্দেশকও বলেছেন; তারা এই শো’টি আবার করবেন।

পুরো প্রজেক্টটা যে পরিকল্পিত তা বোঝা যায় কার্ল মার্কস, ভ.ই. লেনিন, জোসেফ স্তালিন এবং মাও সেতুঙকে নাটকের পোস্টারে মাথায় জোকার ক্যাপ পরিয়ে তৃতীয় শেণির ব্যঙ্গ করা হয়েছে।

স্তালিনবিরোধী এইসব বক্তব্য কিভাবে অন্তসারশূণ্য, কেন এই সব আরোপিত প্রপাগান্ডা তা সবিস্তারে খণ্ডন করা যায়। কিন্তু এই পরিসরে স্থান সংকুলান হবে না। তাই সংক্ষিপ্তাকারে বলা হলোঃ

আমাদের দেশে শ্যাওলা পড়া শোল মাছের মত একপেশে ইতিহাসসমৃদ্ধ কমিউনিস্টরা জেনে-না জেনে ভোল পাল্টানোর মচ্ছবে আশির দশকে স্তালিনকে ‘ত্যাগ’ করেছে। বলা বাহুল্য তাদের কাছে সেই ‘ত্যাগের’ শক্তিশালী কোনো ‘কারণ’ও নেই! তার বিরুদ্ধে অভিযোগেরও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। তার পরও সেই ত্রিশের দশকের ইবলিস বুর্জোয়াদের মত এরাও ঢালাওভাবে স্তালিনের বিরোধীতা করে চলেছেন।
এতকিছুর পরও খোদ রাশিয়ায়, যেখানে স্তালিনকে ত্যাগ করা হয়েছিল সেখানেই তিনি কিছুটা হলেও স্বমহিমায় প্রত্যাবর্তন করেছেন।

আজ সোভিয়েত আমলের সমস্ত গোপন নথিপত্রই ঘেঁটে দেখে খুব সহজেই বের করা সম্ভব, ঠিক কতজন সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নে বন্দী ছিলেন, কে কত বছর সেখানে বন্দিশালায় কাটিয়েছেন, কতজন বন্দী অবস্থায় মারা গেছেন, বা ঠিক কতজনকে সেদিন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৃত সংখ্যা জানার ক্ষেত্রে আজ আর কোনো বাধা নেই। কিন্তু কী পাওয়া গেল সেখানে? দেখা গেল, এতদিনের বহুল প্রচারিত গল্পের সাথে প্রকৃত সত্যের মিল নেই। কারা এই গল্পগুলো রটিয়েছিল তা খুঁজলে দেখা যাবে, হিটলার থেকে হার্স্ট, কনকোয়েস্ট থেকে সোলঝেনিৎসিন, সকলেই এর সঙ্গে যুক্ত।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওই সব বন্দিশিবিরে লক্ষ লক্ষ বন্দীকে অনাহারে উপবাসে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ রকমই আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে সেদিন সেখানে হত্যা করা হয়েছিল, শুধু এই কারণে যে তারা ক্ষমতাসীনদের বিরোধী। স্তালিন আমলের সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে এইসব কাহিনিও বহুল প্রচারিত। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এইসব গল্প বারে বারে নানা বইয়ে, খবরের কাগজে, রেডিওতে, টেলিভিশনে, চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের সরবরাহ করা এইসব মনগড়া তথ্যে গত ৬০ বছরে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার তথাকথিত হৃদয়হীন নিষ্ঠুরতার শিকার এইসব মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

কেউ হয়তো স্মরণ করতে পারেন ১৯২০ সালের কাছাকাছি যখন বার্ট্রান্ড রাসেল ঝটিকা সফর সেরে “দ্য থিয়োরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস অব বলশেভিজম” নামে একটি সমালোচনামূলক বই লিখেছিলেন, তখন সেই বইটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে সুপরিচিত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক কার্ল র্যায়ডেক লিখেছিলেন, যখন সোভিয়েত জনগণ ও তাঁদের নেতৃবৃন্দ সমস্ত অসুবিধাকে জয় করে কঠিন কাজ করে চলেছেন তখন রাসেলের পক্ষে খুবই সহজ ও স্বাভাবিক, দেশে ফিরে গিয়ে নিজের বাড়ির ঘরের মধ্যে চুল্লি¬র উত্তাপের সামনে আরামে বসে হাতে তৈরি পানীয়র পাত্র নিয়ে পাইপ টানতে টানতে বলশেভিকদের দুষ্কর্মের রোমন্থন করা। এমনকি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সাবেক আমলের ইট দিয়ে সাহসী নতুন বিশ্বকে গড়ে তুলতে হয় সেখানে বলশেভিকদের কাছে পরিপাটি করে কাজ করা সম্ভব ছিল না। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন যিনি ট্রটস্কি ও জিনোভিয়েভের মতো নন, লেনিন ও তাঁর শিক্ষার প্রতি সর্বদাই বিশ্বস্ত ছিলেন, খুব দ্রুতই সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম স্থানে উঠে যান। এর কারণ, ট্রটস্কির মতে, স্তালিন ছিলেন “নিঃসঙ্গ নেকড়ে”, আশপাশের মধ্যে সবসময়ই উদ্ধত, “মাঝারি ধরনের ব্যবস্থা”। কিন্তু সেটাই যখন ছিল হাতের কাছে একমাত্র ব্যবস্থা তখন আর কোনো উপায় ছিল না। এটা এই নয় যাকে বলা হয় “ন্যায্যতা প্রতিপাদন করা”, অর্থাৎ যাই ঘটকু না কেন তাই যথার্থ বলার প্রয়াস। এটা সেই রকমই হতো যদি মহান অক্টোবর বিপ্লব হতো একটা দুর্ভাগ্যজনক ভ্রান্তি, যদি মানব ইতিহাসে সোভিয়েত হতো একটি নেতিবাচক ঘটনা। তবে যে চরম ক্ষতিকর প্রচার বছরের পর বছর ধরে চলছে তা ইতিহাসের রায় নয়, হতেও পারে না। এমনকি আইজাক ডয়েটশার কখনো কখনো স্তালিনকে ভেবেছেন ‘প্রাচ্য জাতীয়’ ধূর্ততায় (এমনকি তাঁর মতো সংবেদনশীল লেখককেও ‘পশ্চিমা’ পক্ষপাতমূলক মনোভাব ত্যাগ করা কঠিন হয়েছে) সজ্জিত এক গভীর প্রতারণাপূর্ণ রাজনৈতিক চালক, যিনি অসীম ধৈর্যের সঙ্গে একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন এবং অবশেষে শীর্ষ অবস্থানে উঠে গেছেন।

অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শত্র“তার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব গড়ে তুলতে ও সংহত করতে। স্তালিনই সমাজতান্ত্রিক শিল্পায়ন ও কৃষির খামারিকরণের লাইনকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে সোভিয়েত পার্টি ও জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবার, স্তালিনই (যদি একজনের নাম উচ্চারণ করতে হয় যদিও তিনি বলতেন “একজন ব্যক্তি কখনই স্থির করতে পারেন না।”) পরে পার্টি ও জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন যখন সোভিয়েত লাল ফৌজ এক অকল্পনীয় কঠিন লড়াইয়ে (১৯৪১-৪৫) জয়ী হয়েছেন এবং ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট অক্ষশক্তিকে পরাজিত করে এক বিশ্বব্যাপী ঐতিহাসিক বিজয় সংগঠিত হয়েছে। এই দায়িত্ব পালনের মধ্যবর্তী সময়ে স্তালিনই পার্টিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন যখন পার্টি সর্বপ্রকার সুবিধাবাদ ও বিকৃতিবাদ-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ট্রটস্কি, জিনোভিয়েভ ও কামেনেভ এবং পরে বুখারিন ও রাইকভ পরিচালিত গোষ্ঠীর কার্যত পরাজিত মনোভাব ও বিভেদকামী কার্যকলাপকে উচ্ছেদ করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে রক্ষা ও বিকশিত করেছে। সাফল্যের এই প্রেক্ষাপটে (কেউ কেউ সমাজতন্ত্রের বিজয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে এবং তাঁর নাম হৃদয়ে ও ঠোঁটে নিয়ে যোদ্ধারা

স্তালিনগ্রাদে, বার্লিনের মুখে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত ফ্রন্টে ইতোপূর্বে অজেয় বলে কথিত ফ্যাসিস্টদের কণ্ঠনালি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে।

বারে বারে ফিরে ফিরে এসেছে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষেল মৃত্যুর কথা। ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলা হয়েছে দুর্ভিক্ষের কথা। তাঁর ভয়াবহতার গপ্পটি সাজানো হয়েছে যথেচ্ছা এলোমেলোভাবে। কনকোয়েস্ট হাস্ট বা প্রতিষ্ঠিত স্তালিনবিরোধীরা অবশ্য এধরণের বালখিল্যতা করতেন না। করেননিও। তারা বিরোধীতা করেছিলেন যথেষ্ট আটঘাট বেঁধেই।

এইসব রূপকথার গল্পের প্রধান উপজীব্য ছিল গুজব, পরনিন্দাচর্চা এবং অসমর্থিত জনশ্রুতি। একটা বিপুল সমর্থিত জনশ্রুতি আছে ইতিহাস নিয়ে। ‘ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক ইতিহাস লেখা যায় না যতক্ষণ ইতিহাসবিদ কোনো না কোনোভাবে যার বিষয়ে বা যাকে নিয়ে লিখছেন তার সাথে মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন।’ আর নির্মম সত্য হচ্ছে অধিকাংশ মানুষ এই পরামর্শটি অবজ্ঞা করেন!

স্তালিনকে নিয়ে লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা নিন্দা, বিষোদগার, হিংসা বর্ষণ, সমালোচনা করা হয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কোনো একজন মানুষকে নিয়ে এত এত নিন্দুকের তীর ছুটে গিয়েছে যা রীতিমত অভূতপূর্ব। স্তালিন পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পরও তাকে নিয়ে কমিউনিজমবিরোধীরা এতটা সরব ছিল না। কিন্তু স্ত্যালিনের হাতে জার্মানির পতন হলে সকল কৃতিত্ব স্ত্যালিনের হাতে ওঠাটা মেনে নিতে পারেনি রুজভেল্ট, চার্চিলরা। জার্মান অগ্রগামী বাহিনী যখন মস্কো দখলের জন্য তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তখনো প্রতিআক্রমণের বদলে ‘কৌশলগত পশ্চাদপসারণের’ নাটক করতে চেয়েছে রুজভেল্ট, চার্চিল।

বিশ্বযুদ্ধের আয়ুষ্কাল ৫ বছর ৮ মাস। এই দীর্ঘ সময়ে একের পর এক জনপদ দখল করে নিয়েছিল জার্মান বাহিনী। প্রায় ৬ কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। যার মধ্যে ৬০ লাখ মানুষকে বন্দিশিবিরে প্রাণ দিতে হয়েছিল। একদিকে জার্মান বাহিনীর অগ্রাভিযান অন্যদিকে জাপানের অগ্রাভিযান। বিশ্বের দুই প্রান্ত থেকে দখলদারিত্ব কায়েম হতে থাকলে সে সময়কার ব্রিটিশ শাসনাধীনের ভারতকেও ২৫ লাখ সৈন্য সরবরাহ করতে হয়েছিল ইয়োরোপ, এশিয়ায়। তাদের মধ্যে অনকে বাঙালিও ছিল। তাদের কে কোথায় শহীদ হয়েছে সেই পরিসংখ্যানটিও আমাদের হাতে নেই। পুঁজিবাদীরা সোভিয়েত ইউনিয়ন আর সমাজতন্ত্রের সবকিছুর বিরোধিতা করলেও এটা স্বীকারে কুণ্ঠাবোধ করে না যে বিপুল বিক্রমে অগ্রসর হওয়া জার্মান বাহিনীর হাতে রাশিয়ার পতন হলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অর্ধেকটা হিটলারের অধীনে চলে যেত এবং বিশ্বের মানচিত্র নতুনভাবে আঁকতে হতো। সেই ভয়াবহ বিপদ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করেছিলেন জোসেফ স্তালিন। তার বিচক্ষণ আর সাহসী নেতৃত্বে জার্মান বাহিনীর অগ্রাভিযান রুখে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ। ইয়োরোপ-আমেরিকা যুদ্ধজয়ের এবং আত্মত্যাগের যে বড়াই করে সেটিও বাতিলযোগ্য, কারণ ওই যুদ্ধে সোভিয়েত সৈন্য মারা গিয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ! তার বিপরীতে বাকি মিত্র বাহিনীর নিহত সৈন্য সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ!

কিন্তু স্ত্যালিনের সেই কৃতিত্বকে খাটো করার দুরভিসন্ধী সমালোচকদের এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যেখান থেকে তারা কেবলই পশ্চিমা কৃতিত্ব দেখে। কখনোই আসল বীরত্ব দেখে না। এমনকি কখনো কোনো আলোচনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলা হলেও স্ত্যালিনের অবদানের প্রসঙ্গ কৌশলে বাদ দেয়া হয়। স্ত্যালিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য রীতিমত আমেরিকা ব্রিটেনে ফান্ড তৈরি করা হয়। শত শত লেখক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ ভাড়া করা হয়। তাদের একমাত্র কাজ হয়ে ওঠে যে যেখান থেকে পারে স্তালিনবিরোধী নোট, ঘটনাবলির বর্ণনা, বিবরণ, দলিল, চিঠিপত্র যোগাড় করে তার সাথে মনের মাধুরী মিশিয়ে রূপকথার গল্প তৈরি করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া।

স্তালিনবিরোধী মিথ্যাপ্রচার শুরু হয় হিটলারের হাত দিয়েই
১৯৩৩ সালে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থানের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। পরবর্তী কয়েক দশক জুড়ে সারা পৃথিবীর উপরই এর প্রভাব পড়ে। ওই বছর ৩০ জানুয়ারি হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন এবং নতুন সরকার গঠন করেন। প্রচণ্ড হিংসা ও প্রচলিত বিভিন্ন আইনকানুনের প্রায় কোনোরকম তোয়াক্কা না রেখেই এই সরকার শুরু করে তার কাজ। দেশের সমস্ত ক্ষমতা পুরোপুরি নিজেদের কুক্ষিগত করতে ৫ মার্চ তারা নতুন করে নির্বাচনের ডাক দেয়। তার আগেই অবশ্য তারা সমস্ত প্রচারযন্ত্রকে নিজেদের কব্জায় এনে ফেলেছিল। এইভাবে নিছক প্রচারের জোরে তারা নির্বাচনে নিজেদের জয়কে সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে, ২৭ ফেব্রুয়ারি নাৎসিরা নিজেরাই জার্মানির পার্লামেন্ট ‘রাইখস্টাগ’ ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রমাণ সাজিয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের সমস্ত দায়ভার চাপিয়ে দেয় কমিউনিস্টদের ওপর। এই অবস্থায় যে নির্বাচন হয়, তাতে সারা জার্মানির প্রায় ১ কোটি ৭৩ লক্ষ ভোট পায় নাৎসিরা, যা ওই নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৪৮ শতাংশ। রাইখস্টাগে তাদের ২৮৮ জন ডেপুটি নির্বাচিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নাৎসিদের আক্রমণ এরপর পরিচালিত হয় সোস্যাল ডেমোক্র্যাট ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দিকে। প্রথম দিকে যেসব কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলো গড়ে ওঠে, নারীপুরুষ নির্বিশেষে বামপন্থি কর্মীসমর্থকদের ধরে ধরে এসব বন্দিশিবির ভর্তি করা হয়।

এদিকে ওই একই সময়ে অন্যান্য দক্ষিণপন্থিদের সহায়তায় রাইখস্টাগে হিটলারের ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। ২৪ মার্চ, সেখানে একটা আইন পাস করানো হয়, যার বলে পরবর্তী চার বছরের জন্য হিটলারের হাতে দেশের সর্বময় ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়। এই ক্ষমতার বলে তিনি তখন থেকে পার্লামেন্টের অনুমতি ছাড়াই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হাতে পান। এই সময় থেকেই শুরু হয় খোলাখুলি ইহুদি নিধন। তাদেরকেও দলে দলে ধরে চালান করা হয় ওই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপর বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে যেসব সামরিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে, সেগুলোকেই অজুহাত করেন হিটলার। সওয়াল করা শুরু হয়, তার সর্বময় ক্ষমতার সময়সীমা আরও বাড়ানো হোক। প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে শুরু হয় নতুন করে জার্মানির সামরিকীকরণের কাজ। নতুন করে জার্মান সেনাবাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। জার্মানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্তালিনের রাশিয়া। ব্রিটেন-আমেরিকা-ফ্রান্স তখন সোভিয়েতের বিরুদ্ধে হিটলারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। গোটা সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার লুঠের পথে কাঁটা সোভিয়েত ইউনিয়ন। এ রকম একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হিটলারের প্রচারদফতর সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে এমন সমস্ত ভয়াবহ গল্পকাহিনি তৈরি করে যা বিশ্বব্যাপী প্রচার করার দায়িত্ব নিয়েছিল মার্কিন দেশের সেইসব সংবাদপত্র, যারা চটকদার চাঞ্চল্যকর খবর ছেপে ব্যবসা করে।

১ মে, ১৯৪৫ কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত লালফৌজ বার্লিনের রাইখ্স্ট্যাগে রক্তপতাকা উড়িয়ে মানবজাতির চরমতম শত্রু ফ্যাসিবাদের পরাজয় ঘোষণা করেছিলেন।

ফ্যাসি-বিরোধী যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল প্রথম স্থানে। এই যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন ২ কোটি সোভিয়েতবাসী। যুদ্ধের সময় শিশুসহ ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে জার্মানিতে দাস শ্রমিক হিসেবে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন সোভিয়েতে ৫৩ লক্ষ যুদ্ধবন্দির মধ্যে যুদ্ধের শেষে মাত্র ১০ লক্ষকে জীবিত পাওয়া গিয়েছিল। ফ্যাসিস্টদের আক্রমণে চরম ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল সোভিয়েতের ছোট-বড় মিলিয়ে ১ হাজারেরও বেশি শহরকে, ৭০ হাজার গ্রামকে, ৩২ হাজার শিল্প সংস্থাকে এবং ৯৮ হাজার যৌথ ও রাষ্ট্রীয় খামারকে। যুদ্ধ যখন চলছে, মিত্রশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতকে ৬০০ কোটি ডলার ঋণ দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। তখন রুজভেল্ট ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রুজভেল্টে’র জীবনাবসানের পর ট্রুম্যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়েই সেই প্রতিশ্রুতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। অবশ্য কমরেড স্তালিন তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে সমস্ত যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রমাণ করে দিয়েছিল তার সমাজতান্ত্রিক দৃঢ়তা। শুধু তাই নয়, পূর্ব ইয়োরোপের সদ্য মুক্ত হওয়া দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যেও সোভিয়েত তার সমগ্র শক্তিকে ব্যবহার করেছিল। এইভাবে যুদ্ধে বীভৎসতা কাটিয়ে কমরেড স্তালিনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে দুনিয়ার তাবৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিল।

যুদ্ধে তাঁর প্রিয় পুত্রকে বন্দী করে জার্মানরা। বন্দী বিনিময় করতে চায় তাদের ফিল্ড মার্শাল ফ্রেডরিখ পউলাসের সাথে। তিনি রাজি হননি! এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে দেয় স্তালিনের কাছে দেশ আর নিজের সন্তানের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ? লাল ফৌজের সর্বাধিনায়ক স্তালিন বললেন : I will not trade a Marshal for a Lieutenant!

যারা গড় চিন্তাধারায় তাঁর ‘স্বজনপোষণ’ নিয়ে কুৎসা করে তাঁরা অবশ্য কল্পনাও করতে পারেননি যে দেশের জন্য স্তালিন উৎসর্গ করে দেবেন নিজের ছেলেকেই!দুনিয়ায় শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের সংগ্রাম যতদিন ধরে চলবে, নিপীড়িত হৃদয়ের প্রতি স্পন্দনে অনুপ্রেরণার স্ফুলিঙ্গ হয়ে রইবেন কমরেড স্তালিন।

পুনশ্চঃ স্তালিনকে নিয়ে এইসব মেঠো শয়তানি করা বদমাশদের মুখোস খুলে দিন।
তাদের এইসব অপকর্মের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিন।
তাদের এই বিদ্বেষপ্রসূত নাটক বর্জন করুন। প্রদর্শনী বন্ধ করে দিন।
তাদেরকে রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে বর্জন করুন।
স্তালিনের সত্য ইতিহাস তুলে ধরুন নতুন প্রজন্মের কাছে।

লেখার সহায়তাঃ
১। ‘স্তালিন মিথ্যাচার এবং প্রাসঙ্গিকতা’। মনজুরুল হক (ঢাকা, ২০১৭) ঐতিহ্য প্রকাশন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s