আবারও স্তালিনবিরোধীতার নামে স্থুল ব্যঙ্গ-তামাশার প্রত্যুত্তর- প্রথম কিস্তি।

65151_194948990629770_369614729_n
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পরশুরাম তাও কয়েকটা শাখা-প্রশাখা বাদ রেখেছিলেন, শিব্রাম চক্কোত্তি তাও রাখেননি। রম্য বা কৌতুক কিংবা হিউমার যাই বলুন তার শিরা-উপশিরা ফর্দিফাই করে গেছেন। তিনি প্রায়শঃই কথা প্রসঙ্গে বলতেন; আমার পর আর কোনো বাঙালির রম্য লেখার সুযোগ নেই। যদি লেখে, ধরে রাখবেন তা আদিরসাত্মক এবং আক্রমণাত্মক হতে বাধ্য।

এর পরও বেঁটে খাটো বাঙালি শচীন ভৌমিক লিখেছেন, এবং শিব্রামের অনুমান মতে তা সেই ১৮+ ই! ‘বেডসাইড শচীন’ বইখানা আশির দশকে রাজশাহীতেও পাওয়া যেত। বম্বেতে এই শচীনের বেশ তরিক্কি। স্ক্রিপ্ট লিখতেন, আর রসালো রম্য লিখতেন। খুশবন্ত সিংয়ের কথা থাকুক।

এর পর গুগল জম্মাবার পর সেখানে টোকা দিলেই আপনি সোভিয়েতস্কি কৌতুক পাবেন। রসালো, ১৮+, বিষোদগার, ঘৃণিত। গুগলে সার্চ দিলেই পাবেন। সে কারণে পরের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে হিউমার রাইটার পয়দা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো গুগল মামার কাছে চার্চিল, রুজভেল্প, হিটলারের কৌতুক নক্সা পাবেন না। পাবেন কার? স্তালিনের! একেবারে সাজানো আছে। টোকা দেয়া মাত্র হড় হড় করে বেরিয়ে আসবে বমির মত। আর সেখান থেকে এইসব টুকে নিয়ে এই বঙ্গভূমিতে বেশ কিছু ‘হিউমার রাইটার’ পয়দা হয়েছে।

তাদেরই একজন পাকিস্তান প্রবাসী বাঙালি সাংবাদিক কাম এনাউন্সার কাম রেডিও জকি।
তিনি নাকি এক সময় বাম রাজনীতি করতেন। এই ‘একসময়’ শব্দটি ভারি মজার। বমালসমেত ধরা খেলে- ‘ও সে এক সময় করতাম-টরতাম আর কি’। আর ধরা না খেলে তো তকমা লেগেই রইল।

এই প্রাক্তন বাম আহম্মকটিরও ভাড়া খাটা এনজিও কেপ্ট নীলুর ‘স্তালিন’ নাটক নিয়ে পণ্ডিতি প্রসবের খায়েশ হলো। ইনি ছোট্ট করে লিখলেন-

“এসেছে নতুন স্তালিন-অনুভূতি, তাকে
ছেড়ে দিতে হবে স্থান।“

এই পোস্টে স্তালিনের মৃত্যু নিয়ে একটা নিম্নশ্রেনির প্রপাগান্ডা জুড়ে দিলেন। সাথে আরও জুড়লেন ‘স্তালিন’ নাটকের বিরোধীতা করা বামপন্থীদের প্রতিবাদের ভিডিও। সেই সাথে ‘দেশরূপান্তর’ পত্রিকায় কামাল উদ্দিন নীলুর সাক্ষাতকার।

এখন প্রশ্ন হলো এই প্রাক্তন বামের (অসমর্থীত) কেন স্তালিন নামেই চুলকোনি শুরু হলো? প্রশ্নটা শুনতে সহজ মনে হলেও জটিল। প্রিয় পাঠক খেয়াল করবেন, প্রবাসী বাঙালি বুদ্ভিজীবী, বিশেষ করে এ্যাসাইলামপ্রত্যাশী নাস্তিক ব্লগার কাম এক্টিভিস্টরাই স্তালিনবিরোধী ভূমিকায় জান কুরবান! কিন্তু কেন?

কারণ আওয়ামী নাস্তিকদের একজন আইডল বা নেতা আছে- শেখ মুজিবুর রহামান। তারা তাকে কেন্দ্র করেই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন। বিএনপি ঘারানার নাস্তিকদের জিয়া আছে। তারা তাকে নেতা বানান, আউডল বানান এবং সেই চর্চা করেন। কিন্তু যে পতিত বামদের মার্কস-লেনিন-স্তালিন-মাও নেই তারা কি করবে? তারা কাকে আইডল বানাবে? তাদের তো একটা কেবলা লাগবে। তাদের প্রাক্তন নেতারা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের নয়। আবার মার্কস-লেনিন-স্তালিনকে মানতেও মর্যাদায় বাদে। তখন তারা পশ্চিমা এন্টি কমিউনিস্টদের আদর্শ হিসেবে তাদের পায়ের কাছে বসে পড়ে। চার্চিল-রুজভেল্টদেরকে বাপ ডাকে।

কেন? কারণ একমাত্র তারাই অর্থ শক্তি যোগ্যতা কূটতন্ত্র দিয়ে স্তালিনকে পর্যদস্তু করতে পারে। তারা সেই ১৯৪৫ সালের পর থেকেই রবার্ট হার্স্ট, কনকোয়েস্ট-এর পাঁড় ভাড়াটে শয়তানের মিথ্যাচার ফেরি করে চলেছে। কেন স্তালিনকে তাক করতে হবে? কারণ ওই জর্জিয়ান অর্ধ শিক্ষিত বদরাগি মানুষটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিসম্বাদিত নেতা। তিনি নেতৃত্বে না থাকলে হিটলার কয়েক মাসের মধ্যে পুরো ইউরোপ, এশিয়া এবং শেষে বিশ্বটাকেই জয় করে নিত। এবং তার পর এইসব পশ্চিমা ধেড়ে বজ্জাতদেরকে হিটলারে নবুয়ত মেনে রাতদিন কুর্নিশ করতে তো হতোই, সেই সাথে হিটলারের জার্মান শেফার্ড কুকুর ‘ব্লনডি’কেও কুর্ণিশ করতে হতো। স্তালিন বিশ্বকে সেই নরকদশা থেকে বাঁচিয়েছে। আর সে কারণে সেই সময়কার তো বটেই, এখনও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জোসেফ স্তালিনের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাকে মহান নেতা মানে।

কমিউনিস্টদের কাছে মার্কস-লেনিন-স্তালিন-মাও-সিএম এরা কেউ ‘বাপ; নন। নেতা। আদর্শীক নেতা। তাদের রেখে যাওয়া আদর্শ তাদের পাথেয়। কিন্তু যে পতিত বাম, সোস্যাল ডেমোক্র্যাট, আর বুর্জোয়া আদর্শের পরিত্যাক্ত গাদ, তাদের নেতা কই? নেই বলে তখন তারা চার্চিল, রুজভেল্ট, স্যাডিস্ট লম্পট আলেকজান্ডার সোলঝেনেৎসিন এবং ইুউরি চেশচেংকোর মত ভাঁড়দের নেতা মেনে স্তালিনবিরোধী আবর্জনা উগরে দেয়।

এই আহম্মকগুলোর মামাবাড়ির আব্দার হলো-

  • স্তালিন কেন গৌতম বুদ্ধ হলেন না? তাকে অহিংস বুদ্ধ হতে হবে।
  • অন্যেরা চেঙ্গিস হতে পারবে কিন্তু স্তালিন চেঙ্গিস হতে পারবে না।
  • হিটলার, মুসোলিনি, রুজভেল্ট, চার্চিল যুদ্ধের সেনাপতি হতে পারবে, নিষ্ঠুর হতে পারবে, যুদ্ধ জয়ের পর জার্মান সৈন্যদের হত্যা করতে পারবে, জার্মানিকে দুই ভাগ করে ফেলতে পরবে… শুধু স্তালিনই এসব করতে পারবে না। সে সাইবেরিয়া গিয়ে তজবীহ টিপবে।
  • জারের বশংবদ, পুজিঁবাদের দালাল, ফরাসী, ইতালীয়, ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রকারী হাজার হাজার কসাক দিয়ে সোভিয়েত ধ্বংস করে দিতে পারবে, কমিউনিস্টবিরোধী মেনশেভিকদের হাতে হাত মিলিয়ে ইউক্রেনে দুর্ভিক্ষ ঘটাতে পারবে…. শুধু স্তালিন তাদের হাত থেকে সোভিয়েতকে মুক্ত করার জন্য কঠোর হতে পারবে না!

ইতিহাসের সূত্রানুযায়ী তাঁর কাঠিন্য শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অত্যাবশ্যকীয় ছিল। যখন হিটলারের পঞ্চম বাহিনী ইউরোপের দেশে দেশে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হিটলারকে অদমনীয় করে তুলছিল, যখন ফ্রান্স-ইতালি প্যাক্ট হয়ে কসাকদের অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ দিয়ে অর্ন্তঘাত ঘটাতে চাইছল সে সময় স্ট্যালিনের পদক্ষেপ সোভিয়েতের মধ্যে পঞ্চম বাহিনীর ক্রিয়াকে সফল হতে দেয় নি। এতে কিছু নিরীহ মানুষ মারা গেলেও (যেটা স্ট্যালিন স্বীকারও করেছিলেন) ষড়যন্ত্রকারীরা রক্ষা পায়নি, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেই নিয়েছিল।

স্তালিনবেরাধী চুলকানি ছাড়াও এই মর্কটদের আরও একটা ইস্যু আছে। এরা এদেশের বামপন্থীদের দেখতে পারে না, তার পেছনে তেমন কোনো লজিকও নাই। তারপরও পারে না। সেই বামরা যখন স্তালিনকে নিয়ে সোচ্চার হয় তখন বামদের হেয় প্রতিপন্ন করতে গিয়ে স্তালিনকে টেনে এসে সোলঝেনেৎসিন এর মত পশ্চিমা টাকায় মগজ বিক্রি করা হারামজাদার সুরে সুর মিলিয়ে এইসব প্রবাসী ‘দেশহিতৈষী’রা অর্জীণ উল্টি বমি উগরে দেন।

পুনশ্চঃ জার্মানপ্রবাসী নিহত নারী ব্লগার অর্পিতা, অংশুমালী, নবযুগ, ডয়েচে ভেলে এসব পরের কিস্তিতে আসবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s