কমরেড চারু মজুমদারের শহীদ দিবস ইভেন্ট নয় নীতি-আদর্শ হিসেবে পালন করুন।

ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে কমরেড চারু মজুমদারই ছিলেন প্রথম শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা যিনি খোদ পুলিশ প্রসাশনের হেড কোয়ার্টার্সেই প্রাণ দিয়েছেন ২৮ শে জুলাই ১৯৭২ সালে। ধরা পড়ার মাত্র এগার দিনের মাথায়। তাঁর মৃত্যু আজ আর রহস্যাবৃত্ত নয়। তাঁকে ঠান্ডা মাথায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বন্ধ করে দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। মাত্র ৫৪ বছর বাঁচতে পেরেছিলেন। যে মানুষটির কার্ডিয়াক অ্যাজমায় প্রায়শই মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হোত। অক্সিজেন সিলিন্ডার ও পেথিড্রিন ইঞ্জেকশনসহ দু:সহ আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন কাটিয়েছেন ৩টি বছর।

এতবড় মাপের মানুষ , যিনি একটা ঐতিহাসিক সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তাঁকে সামগ্রিক উপলব্ধি নিয়ে অনুধাবন করতে গেলে যে দক্ষতা ও সময় প্রয়োজন ছিল তা আমাদের নেই। তবে আশা এইটুকু যে, মুক্ত ভারতের তথা মুক্ত উপমহাদেশের যে স্বপ্ন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছিলেন তাকে সফল করতে হলে অনেক কাজের মধ্যে চারু মজুমদারকে উপলব্ধির স্তরকে উন্নত করাটাও একটা কাজ, আশার কথা এই বোধ ক্রমশঃ সঞ্চারিত হচ্ছে। আর তাঁকে জানা মানেই তাঁর দুর্দমনীয় স্পিরিট ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝা।
কমরেড চারু মজুদারকে নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত তৈরি হতে পারে, হচ্ছেও। তাকে নিয়ে শিল্প-সাহিত্য এবং মিথও হতে পারে, কিন্তু উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আর এমন একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম করা যাবে না যিনি শত্রুর হাতে বিপ্লবের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য প্রাণ দিয়েছেন। মুজফ্ফর আহমেদ, ডাঙ্গে, রণদিভে, অজয় ঘোষ, রাজেশ্বর রাও, নাম্বুদ্রিপাদ কেউই নন।

নক্সালবাড়ি আর কমরেড চারু মজুমদার অভিন্ন- এই কথার মধ্যেও ফাঁক আছে। নক্সালবাড়ি আর কমরেড চারু মজুমদার এক কিংবা অভিন্ন নয়, যেমন এক নয় চাঁদ ও সূর্য। চারু মজুমদার একটি চেতনা এবং সেই চেতনারই প্রকাশ দেখা যায় নক্সালবাড়ি নামক একটি স্থানের নামে। নক্সালবাড়ি একটি প্রতীক মাত্র, অপরদিকে কমরেড চারু মজুমদার কাণ্ডারি -পথ প্রদর্শক , শ্রেণি সংগ্রামের মহান শিক্ষক। স্থানটা নক্সালবাড়ি না হয়ে অন্য কোথাও হতে পারত। আর তাই নক্সালবাড়ি আর চারু মজুমদার এক নয়। চারু মজুমদারের উজ্জ্বলতায় নক্সালবাড়ি উজ্জ্বল।

সূর্যের আলোয় যেমন করে চাঁদ আলোকিত হয়। আর তাই, নক্সালবাড়ির শিক্ষা বলতে চারু মজুমদারের শিক্ষাকেই বুঝতে হবে। চারু মজুমদারকে বাদ দিয়ে , অমান্য করে, কিংবা খণ্ডন করে ‘নক্সালবাড়ি আন্দোলন’ পালন করার অভিসন্ধির মধ্যে স্পষ্ট প্রতারণা রয়েছে। যেটা ভারতে যেমন হয়েছে, এপারে বাংলাদেশেও হয়েছে এবং হচ্ছে!
নক্সালবাড়ির আন্দোলন টুপ করে গাছ থেকে পড়েনি। কয়েকজন বিপ্লবাকাঙ্খী একরোখা মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টা, ধনুর্ভঙ্গ পণ থেকে নিঃশর্ত আত্মত্যাগ দিয়ে তিলে তিলে নক্সালবাড়ির কর্ষিত জমিনে মুক্তির বীজ রোপিত হয়েছে।

বাংলাদেশে যারা নকশালপন্থী আদর্শের পার্টি করতেন তারা ‘ক্রসফায়ার’সহ ত্রিমুখি আক্রমণে পর্যুদস্তু হয়ে প্রায় ছত্রভঙ্গ। নানা ভাগে, নানা ফ্যাকশনে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে এখন আর প্রশাসন বা শাসকশ্রেণিকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি রাখে না। এই অবসরে রঙ বেরঙের চারু মজুমদারপন্থী ঝাঁকের কৈ আসর মাতানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছে। তারা আজকে চারু মজুমদারকে যে জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন তাতে করে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই হয়ত দেখা যাবে চারু মজুমদারের নামে পূজো-অর্চনা হচ্ছে, মিলাদ-কুলখানি হচ্ছে! মাওবাদ, চারু মজুমদারের শিক্ষা, সশস্ত্র সংগ্রাম, শ্রেণি সংগ্রাম এমন এক ‘গ্যাঁজানো চোলাই’ হয়ে উঠেছে যে মাজারে মাজারে চারু মজুমদারের নামে সিন্নি বিলি হচ্ছে! যারা এই ফ্যাশনবাজী করছেন তারা চারু মজুমদারের মূল নীতি সশস্ত্র সংগ্রামের পধ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন, অথচ সামাজিক মাধ্যমে বেশ কলার উঁচু করে বলেন- ‘আমরা মাওবাদী, চারু মজুমদারপন্থী’! অথচ এই ‘ক্রসফায়ার’ শাসিত জমানায় তারা প্রশাসন বা পুলিশের চক্ষুশূল হচ্ছে না! অবাক করা ব্যাপার নয়?

বাংলাদেশে প্রকাশ্যে চারু মজুমদার, নক্সালবাড়ি নিয়ে কাজ করা সংগঠন বেশি নেই। যেখানে চারু মজুমদার এবং নক্সালবাড়ি, সেখানে সাধারণভাবেই ধরে নিতে হবে যারা চারু মজুমদারের লাইনকে উর্ধ্বে তুলে ধরেন তারাই নক্সালবাড়ি কৃষি বিপ্লবের লাইনকে উর্ধ্বে তুলে ধরবেন। অথচ এখানে তেমনটি ঘটেনি। যারা ‘নক্সালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থানের অর্ধশতবর্ষ’ পালন করেছেন তারা কেউই চারু মজুমদারকে ‘বিপ্লবের অথোরিটি’ মনে করেন না। বিভিন্ন সময়ে তাদের কেউ কেউ বলেছেন- ‘আমরা চারু মজুমদারের লাইনকে সমালোচনা সাপেক্ষে আংশিক গ্রহণ করি’! তারা নক্সালবাড়ির আন্দোলনকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে খণ্ডিত করতে চান। এটা হল স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির গুণকীর্তন করা! তারা যে মতাদর্শগতভাবে চারু মজুমদারের শিক্ষাকে গ্রহণ এবং প্রয়োগ করেন না সেটা তাদের বিভিন্ন বক্তব্য-লেখাজোকা দিয়ে প্রমাণও করা যায়, যদিও তা আবশ্যক নয়। তা ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রাম তথা বিপ্লবের মূল কাজ বাদ দিয়ে এইসব ‘দিবস’ পালন করার পাতি বুর্জোয়া লোকাচার, লোক দেখানো আয়োজন, দলাদলি, ‘সোল এজেন্সিশীপ’ জাহির করে নক্সালবাড়ির মুক্তির পথকে উর্ধ্বে তুলে ধরা যায় না এবং মহান কমরেড চারু মজুমদারকেও শ্রদ্ধা জানানো যায় না।

বিগত দিনগুলোতে চারু মজুমদারের মূল্যায়ন বহুবার হয়েছে।আগামী দিনগুলোতেও বহুবার মূল্যায়ন হবে। কাটাছেড়া হবে। চাপান-উতোর হবে। কেউ কেউ তাঁকে ‘অতিমানব’ বানানোর বিচ্যুতি করবেন। কেউ কেউ সমালোচনার নামে ব্যক্তি আক্রমণ শানাবেন। এসবই বাস্তবতা, কিন্তু যে মানুষটি সেই ১৯৬৭ সালে বলতে পারেন –
“তবুও নকশালবাড়ী ঘটেছে এবং ভারতবর্ষে শত শত নকশালবাড়ী ধূমায়িত হচ্ছে।কারণ ভারতবর্ষের মাটিতে বিপ্লবী কৃষকশ্রেণী যে মহান তেলেঙ্গানার বীর বিপ্লবী কৃষকের উত্তরসূরী। তেলেঙ্গানার বীর কৃষকদের সংগ্রামে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তদানীন্তন পার্টি নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল মহান স্তালিনের নাম করে।আজকে যাঁরা পার্টির নেতা হয়ে বসে আছেন তাদের অনেকেই তো সেদিনকার বিশ্বাসঘাতকতার অংশীদার।তেলেঙ্গানার সেই বীরদের কাছে আমাদের নতজানু হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে শুধু বিদ্রোহের লাল পতাকা বহন করার শক্তির জন্যই নয়, তাঁদের কাছ থেকে শিখতে হবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কর্ত্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্যও।কী অসীম শ্রদ্ধা তাঁদের ছিল আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রতি, কমরেড স্তালিনের নামে তাঁরা নির্ভয়ে নিজেদের জীবন তুলে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের হাতে।এই বিপ্লবী বিশ্বস্ততা সব যুগে সব কালে প্রয়োজন বিপ্লব সংগঠিত করতে।তেলেঙ্গানার বীরদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে-যারা স্তালিনের নাম নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিরোধিতা করে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে।তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে শত শত শ্রমিক ও কৃষকের রক্তে রঞ্চিত লাল পতাকা, তারা ঐ পতাকাকে কলঙ্কিত করেছে তাদের বিশ্বাসঘাতক হাতের স্পর্শে।“

নকশালবাড়ী বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। কারণ এ যে অজেয় মাকর্সবাদ লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ বিচারধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানি সামনে আছে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক বিশ্বাসঘাতকতা, অনেক বিপর্য্যয়, কিন্তু তবু নকশালবাড়ী মরবে না, কারণ চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর উজ্জল সূর্যালোকের আর্শীবাদ এসে পড়েছে। যখন মালয়ের রবার বন থেকে ২০ বছর ধরে সংগ্রামরত বীররা অভিননন্দন জানান নকশালবাড়ীকে, যখন নিজেদের পার্টির সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাপানী কমরেডরা অভিনন্দন জানান, যখন তা আসে অষ্ট্রেলিয়ার বিপ্লবীদের তরফ থেকে, যখন মহান চীনের সৈন্যবাহিনীর কমরেডরা অভিনন্দন জানান, তখন অনুভব করি: দুনিয়ার শ্রমিক এক হও-এই অমর বাণীর তাৎপর্যে, তখন একাত্মতা অনুভব করি, দেশে দেশে আমাদের পরম আত্মীয়দের জন্য বিশ্বাস দৃঢ় হয়। নকাশালবাড়ী মরে নি, আর নকশালবাড়ী কোনদিন মরবেও না।

 

মনজুরুল হক
২৮ জুলাই, ২০১৯

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s