বুকপকেটে রাঙতামোড়া কাঠিলজেন্স – ০৩

প্রথম দেখাতেই আন ইম্প্রেসিভ ছেলেটাকে ভালো লাগল না। ঢ্যাঙা পাতলা, ওপরের পাটির একটা দাঁত নেই! দেখেই মনে হয় এই বয়সে ওপরের পাটির দাঁত খোয়ানো মানে হয় কোনো দেওয়ালে গুঁতো খেয়েছে, নয়ত পা হড়কে পড়ে গেছে! এরকম নেগেটিভ ভাবনার কারণও বোধ করি ওর সেই সাদাসিদে আনইম্প্রেসিভ চেহারা। হাবিব। হ্যাঁ, ছেলেটির নাম হাবিব। আমার একটু সিনিয়রই হবে।
 
কেন যে ওর মনে হয়েছে- এই মোনুষটার বন্ধুত্ব পেলে সে বর্তে যাবে, সেটা রহস্যই হয়ে রইল। সময়টা ১৯৮০।
 
একটা সওদাগরি অফিসে চাকরি করত। আমাদের দেখা হতো সিটি কলেজের সামনে, পিটিআই মোড়ে, কখনও পিকচার প্যালেস মোড়ে। একদিন দুম করে বলে বসল-
‘বস আমাগে বাড়ি যাবেন?’
আমি চকিতে ঘুরে তাকাতেই খানিকটা ভড়কে গেল। তারপর ওর বাড়ি যাওয়ার কারণ হিসেবে যা বলল তা কিন্তু বলার কথা নয়! বলল-
‘বাড়িতে মা আছে আব্বা আছে। যাবেন বস?’
হাসি পেলেও চেপে নিলাম। ভালো করে লক্ষ্য করলাম- মাথা নিচু করে আছে। আচ্ছা ও মাথা নিচু করে আছে কেন? পরক্ষণেই মনে পড়ল, আমি যে এই শহরে বাইশ পরিবার কিটাত্মিয় থাকার পরও একটা মেসবাড়িতে থাকি। ওই বাড়ির একটা কামরায় রাতের বেলা নিঃশব্দে গুমরে কাঁদি, ও কি সেটা অনুমান করতে পেরেছে? তাই কি বলেছে- ‘বাড়িতে মা আছে বাবা আছে!’ ও কি বুঝতে পেরেছে এই দুটি মানুষের অনুভব আমার সর্বাঙ্গ শিহরিত করে! আমার ঠিক ওই মুহূর্তে একুশ-বাইশ বছরের ছেলেটিকে পরিপক্ক দার্শনিক মনে হল! বললাম- ‘যাবো’।
 
এতক্ষণে সে মুখ তুলে সলজ্জ চাইল। হাসল। আবার সেই ফোকলা দাঁত বের হলো। এবং আবার তাকে আনইম্প্রেসিভ লাগল। রাগ হলো। ও হাসে কেন?
 
পরের শুক্রবার সকাল সকাল তৈরি হয়েছি। একটা কালো গ্যাবাডিনের প্যান্ট, তার উপর সাদা টি-সার্ট। রিকসা ডেকে জেলখানা ঘাট। চেনা পথ। খুব চেনা। খেয়া নৌকার পাশ গোলুইয়ে বসে দুলছি। প্রবল ভাটির টানে ভৈরবের পানি জেলখানা ঘাটে এসে রূপসা নাম নিয়ে আরও দক্ষিণে ছুটছে….। গোলপাতা বোঝাই গওনা নৌকাগুলোয় তিন তিন ছয়টা দাঁড় ঝপ ঝপ পড়ছে আর হাল ধরা প্রধান মাঝি আরামে হাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে মনে হবে এক চুলও নড়ছে না। সারি সারি কার্গো জাহাজ, স্টিমার, হ্যাংবোট, টাগ বোট নোঙ্গর ফেলে স্থির।
 
 
ওপারে সেনের বাজার। স্থানীয়ভাবে ‘স্যানেরবাজার’। মানে জায়গাটা যে সেন পদবীর কোনো এক ক্ষমতাবান বা ধনাঢ্য ব্যক্তির নামানুসারে, সেটা বিস্তৃত। খেয়া ঘাটে ভেড়ার পর সেই চিরচেনা হুড়োহুড়ি। কার আগে কে নামবে। যেন নামতে পারাটাই মোক্ষ! এবড়ো থেবড়ো ইতস্তত ভাঙ্গা ইটের টুকরো বিছানো পথ। হোচট খেথে খেতে খানিকটা দূর গিয়ে এক চিলতে পাকা সড়ক। সেখানে ছোট ছোট রিকসা ভ্যান দাঁড়ানো। এতই ছোট যে কোনোওমতে চার জন গাদাগাদি করে বসা যায়। এর অন্যতম সুবিধে হলো অমন কিপটে চিকন রাস্তায় কম জায়গা নেয়।
 
ভ্যান চালকরা একঘেয়ে স্বরে ডেকে চলেছে ‘রিজাব’ ‘রিজাব’ ‘রিজাব’…। আজগড়া আজগড়া… পালেরহাট পালেরহাট….। একটা ভ্যান রিজার্ভ নেওয়াই যেত। খুব বেশী ভাড়া নয়, কিন্তু কে যেন পাশ থেকে অযাচিত বলল- ‘ওদ্দা রিজাব নেবেন্না, ঝাহির চোটে বসতি পার্বেন্নানে’। আইনিস্টানীয় তত্ত্ব। ভ্যান যত লোডেড হবে, ঝাঁকি তত কম হবে। পালেরহাটের উদ্দেশ্যে ভ্যান ছেড়ে দিল। সহযাত্রী বাকি তিনজনের একটি নারী। সিঁথির সিঁদুর আইডেন্টিফিকেশন দিয়ে দিল। রাইসমিল, ঘিঞ্জি বাজার, বঙ্গবন্ধু কলেজ পেরিয়ে ভ্যান ছুটছে। নিঃশব্দ। রাস্তায় ভ্যান আর দুচারটে বাই সাইকেল ছাড়া আর কোনো বাহন নেই। রাস্তাটা একটানা একশ গজও সোজা নয়। প্রতি ত্রিশ-চল্লিশ গজ পর পরই বাঁক। কোনো কেনো বাঁক পুরো নব্বই ডিগ্রি। এর দুটো মানে হতে পারে। এক. এ অঞ্চলের বাসিন্দারা একরোখা গোঁয়ার, তাই নিজেদের জায়গা ছাড়েনি। দুই. প্রত্যেকেই চেয়েছে তার বাড়ির পাশ দিয়েই যেন রাস্তা যায়। পাকিস্তান আমলের কাচা হাঁটা পথটি স্বাধীনতার পর পিচ পড়ে পাকা সড়কের পরিবাভুক্ত হয়েছে বটে, তবে এর কোন কোন জায়গায় পিচ ছিল সেটা বুঝতে ম্যাগনিফাইং গ্লাস হাতে নিয়ে দেখতে হবে।
 
 
দুপাশে অজস্র ঘন বৃক্ষরাজি আর ছোট ছোট সুন্দর ঘরবাড়ি। খুব ছোটবেলা এক-দুবার এই পথে পালেরহাট ছাড়িয়ে আরও দূরে গেছি বটে, তবে তা তেমন মনে নেই। বেশীর ভাগ সময় লঞ্চে যেতাম।
 
 
যখন পালের হাট বাজারে পৌঁছুলাম তখনও রোদ চড়ে পারেনি। ঠিক মোড়ের উপরেই হাবিব। সেই আনইম্প্রেসিভ হাসি। একটা ভাঙ্গা দাঁত বেরিয়ে যাওয়া। ওর সাথে আরও আধা মাইল হেঁটে ওদের বাড়ি পৌঁছুলাম। আপ্যায়ন হল ডাবের পানি দিয়ে। বেশ উঁচু মাটির দেওয়ালের ঘর। ছনের ছাউনি। স্বভবতই ঠান্ডা। এরপর সারাটা দুপুর কাটল এবাড়ি সেবাড়ি ঘুরে আর খেয়ে। দুপুরে ভাত খেয়ে একটু দূরে একটা ঘন গাছের বাগান। তারই পাশে বাঁশের মাচা পাতা। অন্তত সাত-আট জন বসা যায়। ঝিরি ঝিরি বাতাস আর নাম না জানা সব বুনো ফুলের গন্ধ। বিকেলে পালের হাট বাজারে এসে গরম গরম জিলাপি। বাজারে যাকে পাচ্ছে তাকেই ধরে ধরে হাবিব বলছে- ‘আমার বন্ধু। খুলনে থাহে। ম্যালা বই আছে উনার’। এই যে ‘ম্যালা বই আছে উনার’ কথাটা এমনভাবে বলছে যেন জগতে আর কারো এই বস্তুটি নেই। এবং এই ‘ম্যালা বই’ থাকার আর একটা মানে আমি বেশ কেউকেটা কিছু একটা!
 
 
চা পর্ব চলতে চলতেই হঠাৎ হাবিব বলল- ‘ভাই গান শোনবেন?’ আমি বেকুবের মত বলে বসি- ‘ক্যাসেটে’? হাবিব হাসে। হাসলেই সেই ভাঙ্গা দাঁত।
 
প্রায় এক মাইল ছোট ছোট বাড়ি গাছাগাছালির ভেতর দিয়ে হেঁটে একটা মন্দির পার হলাম। এই পালের হাটের হাবিবদের অঞ্চল পার হয়ে এই অঞ্চলে বেশীর ভাগই হিন্দু বাড়ি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। শাঁখ বাজা শুরু হয়নি তখনও। তবে এখানে ওখানে চরতে থাকা গরু-ছাগল ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। আ আ আ তই তই শব্দে হাঁসগুলো ঘরে ডেকে নিচ্ছে বউ-ঝিরা। প্রকান্ড প্রকান্ড নারকেল গাছ আর ঘন অন্ধকার অন্ধকার জমাট বাঁশের ঝাড় পেরিয়ে হাঁটছি। যখন প্রথম শাঁক বেজে উঠল ঠিক সেই সময়ে আমরা গোবরের ঘুটে দেওয়া একটা চত্তর পার হয়ে প্রায় ঘরের ডোয়ার সাথে চালাটা মিশে গেছে এমন এক ঘরের সামনে হাজির হলাম।
 
 
হাবিব জোরে হাঁক দিল- ‘হরেন দা বাড়ি আছোনি?’ … ‘ও হরেনদা’…’কিডা’? আওয়াজটা ঘরের ভেতর থেকে আসেনি, এসেছে আমাদের পেছন থেকে। হরেন গামছায় মুখ মুছতে মুছতে এসে দাঁড়াল। কত হবে? প্রয়ত্রিশ বা চল্লিশ। কিন্তু দারিদ্রের কষাঘাতে বুড়িয়ে গেছে লোকটা।
 
 
‘ও জবা ছার আইসে, বসতি দে’।
জবা হরেনের বউ। মোটেই সলজ্জ নয়। স্বাভাবিক। সপ্রতিভ। একটা ছেড়া পাটি এনে দাওয়ার পাশে উঠোনে বিছিয়ে দিল। আমরা পা ছাড়িয়ে বসলাম। হরেন কি কারণে ‘ছার’ বলল জানতে উৎসুক হতেই হরেন যেন মুখস্ত করে রেখেছিল- ‘হাবিব বাই আফনার কতা কয় ছার। কয়,আফনি গান গাতি পারেন, ম্যালা ম্যালা বই ফড়েন, বইতি যিরাম ল্যাহা সেইরাম কইরে কথা কন….’ এবার আমার কানের নিচে লাল হবার পালা। আমার এত্ত এত্ত গুণ!
 
হরেনের বউ এনামেলের বাটিতে জল দেয়। সাথে আর একটা বাটিতে খই।… হারান ব্যাখ্যা দেয়- ‘ও ছার, কাইলকে মন্দিরি পূজো ছেলো। ছোট্ট এট্টা মেলা বইছেলো…’ গুড়ির বাতাসা আর খই কিনিলাম, বাতাসা নাই…’ বলে হো হো করে এমনভাবে হাসল যেন বাতাসা খেয়ে মহা অন্যায় করে ফেলেছে। হারান আরও কি কি বলার চেষ্টা করছিল… ওকে কথায় পেয়েছে। থামিয়ে দিল হাবিব।
 
 
‘হরেনদা, ভাইরে গান শুনোও। গান শুনতি আইছি’।
হরেন লজ্জা পেল না। বোঝা গেল এমন অনুরোধ পেয়ে সে অভ্যস্ত।
 
‘জবা দোতরা দে’। ছোট্ট কথা।
পরমুহূর্তে দুই তারের যন্ত্রটিতে ঝংকার উঠল। হরেনের অভিজ্ঞ হাত যন্ত্রের মত চলছে… বউটা এরই ফাঁকে বাম হাতে শাঁখ রেখে ডান হাতের চেটো দিয়ে থপ থপ দুবার মেরে পোওওওও করে শাঁখ বাজাল। হারান এক মুহূর্ত থামল।
 
 
হরেনকে তো বলা হলো না, কী গান গাইবে? আমরা কোন গান শুনতে চাই? একবার ভাবলাম বলি। তা না হলে হরেন হয়ত ‘পিরিতি কাঁঠালের আঠা’ শুরু করে দেবে….কিন্তু আমাকে বিস্মিত করে হরেন গেয়ে উঠল- ‘আর আমারে মারিসনে মা…’ চমকে উঠলাম! সাধারণত এইসব অজ পাড়াগাঁয়ে এমন গান কেউ গায় না। যারা পেশাদার শিল্পী তারাই কেবল গায়। হাবিব আমার মুখ দেখে বুঝেছে আমার ভালো লেগেছে। আমি খুশি। আর আমাকে খুশি করতে পেরে ওর মুখটাও একটু চকচক করে উঠল, সন্ধ্যের ম্লান আলোয় যা দেখা গেল না।
হরেন গেয়ে চলেছে-
 
আর আমারে মারিস নে মা ।
বলি মা তোর চরণ ধরে
ননী চুরি আর করব না ।।
ননীর জন্যে আজ আমারে
মারলি গো মা বেঁধে ধরে
দয়া নাই মা তোর অন্তরে
স্বল্পেতে গেল জানা ।।
পরে মারে পরের ছেলে
কেঁদে যেয়ে মাকে বলে
সেই জননী নিঠুর হলে
কে বোঝে শিশুর বেদনা ।।
 
 
গানটা থেমে যাবার পর কতক্ষণ কেটেছে মনে নেই। শুধু মনে হলো হরেনের কি শেষ দিকে গলাটা ধরে এসেছিল? হরেনের কি আগেও এই গানটা গাওয়ার সময় এমন করে গলা ধরে আসত? আরও গান হবে। হাবিব আশ্বস্ত করল। আমি বললাম- থাক না। হরেনদা কোথায় না কোথায় খাটাখাটনি করে এসেছে। থাকুক, আর গাইতে হবে না। জবা তিনটে বিড়ি আর মুঠের আগুন দিয়ে গেল। আমরা বিড়ি ধরালাম।
 
 
এরপর অদ্ভুতভাবে হরেন বলে বসল- ‘ছার, ও ছার, এট্টা লাইন গান না ছার?’ চোখ পিট পিট করে তাকালাম। না। হরেন মোটেই কৌতুক করছে না। সে সিরিয়াস। আমি একবার ভাবলাম, একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে হরেন কি বুঝবে? পরে মনে হলো না বুঝলেও হরেন আকাশ থেকে ড়বে না। সে শিল্পী। কোনো ভূমিকা না করেই গাইতে শুরু করলাম-
 
 
‘আনন্দধারা বহিসে ভূবনে…’। কথা ছিল দুলাইন গাইব, কিন্তু হরেন বা হাবিব কিংবা জবা কারো অনুরোধ ছাড়াই পুরোটা গেয়ে ফেললাম। হরেন মিটি মিটি হাসছে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি- ‘কী হরেনদা, ভাল্লাগল না, তাই না?’ হরেন কথা বলে না। আমি আবারও বললাম- ‘এ হলো গিয়ে তোমার আনন্দের গান….’ এবার হরেন আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল- ‘ছার, গান কোনোদিন আনন্দের হয় না!’ চমকে উঠলাম! কি বলে হরেন!
‘হ ছার, গান মানেই কষ্ট। গান হলো গিয়ে আফনার দুঃখ। এই যে আফনি কলেন না- আনন্দধারা বহিছে ভূবনে…আমাগে আনন্দ নাই ছার!’ কোনো দিন আনন্দ বয় না। এই যে দোচালা দেকতিছেন, ইডা হলো গিয়ে আফনার সুবল ঠাউরির জাগা। আমারে থাকতি দিছে। মন ভালো থাকলি গাঁজা খায়, আমার গান শোনে, জবার সাথে ফাইজলেমি করে, তারপর বাড়ি চইলে যায়…। সুবল ঠাউরির ম্যালা টাহা।‘
 
 
হাবিব এতক্ষণ চুপ করে ছিল। হরেনের মুখে গাঁজার কথা শুনে ভয়ে ভয়ে বলল-‘ভাই হরেনদার কাছে ওই জিনিস আছে, বানাতি কবো?’ আমি কি মনে করে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। আমাদের গাঁজা টানা শেষ হলো যখন ততক্ষণে রাত ১০ টা বেজে গেছে। হরেন হাবিব দুজনই বলল – ভ্যান হয়ত পাবেন কিন্তু সেনের বাজারে খেয়া পাবেন না। হরেনের দোচালা ঘর থেকে বিদায় নিয়ে ফেরার সময় গাছের ঝোপঝাড় এত বেশী অন্ধকার আর ছম ছমে মনে হলো যেন অচেনা কোথাও এসে পড়েছি।
 
 
আঠারো বেকি নদীর পানি ভৈরবে মিশে আরও দক্ষিণে অব্যহত নেমেছে। সেনের বাজারের ইতস্তত ভাঙ্গা ইটের টুকরো আরও একটু মাটিতে দেবেছে। একচিলতে পিচের রাস্তা দোকানপাটে আরও সংকুচিত হয়েছে। হাবিবের সেই ভাঙ্গা দাঁতের ফাঁকটা যেন আরও একটু বড় হয়েছে। অনেকদিন পালের হাটে যাইনি। একদিন দুপুর থেকেই অঝোরে বৃষ্টি ঝরছিল। হঠাৎই মনে হলো পালের হাট যাব। হরেনদার বারান্দায় বসে গান শুনব। গাঁজা খাব। ঘন্টা দুয়েক পর পালের হাট মোড়ে ভ্যান থেকে নেমে দৌড়ে একটা দোকানে উঠতে হলো বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। এই সময় হঠাৎই মনে হলো হাবিবকে বলব না। হরেনদাকে সারপ্রাইজ দেব! হরেনদা জবা চমকে উঠবে! পরে এসে হাবিবকে জানাব।
 
 
আরও পরে বৃষ্টি ঝরে আসতে হাঁটতে শুরু করলাম। তখন প্রায় শেষ বিকেল। ঘন মেঘের কারণে এখনই সন্ধ্যে সন্ধ্যে মনে হচ্ছে। মন্দির পার হয়ে সেই ঘন বাঁশের ঝাড় বা-হাতে রেখে গোবরের ঘুটে দেয়া চত্তরের পর হরেনদার সেই দোচালা কুড়ে ঘর। চত্তরে ঘুটে নেই। হরেনের কুড়েটা দেখতে পাচ্ছি। আরও একটু এগিয়ে ডাক দিলাম- ‘হরেনদা…. ও হরেনদা…দেহো কিডা আইছি…’ কোনো সাড়াশব্দ নেই। উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে আবারও ডাকলাম। এবারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। মাথা নিচু করে চালের নিচ দিয়ে ঘরের দরজা দেখতে চাইলাম। হা-করে খোলা। কেউ নেই! মরা বাড়ির মত সুনসান। একটা কুকুর কিংবা একটা হাঁসও নেই। হরেনের এই কুড়ে ঘরের পাশে আর কোনো ঘরও ছিল না। নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছি। কতক্ষণ খেয়াল নেই। একটা বাচ্চা ছেলে জামার কোণা ধরে টান দিল- ‘ও কা, কাউরে খুজদিছেন?’ সম্বিৎ ফিরে তাকালাম ছেলেটির দিকে-
‘হ্যাঁ, এই বাড়িতে হরেনদা থাকত না? তুমি চেনো তাগের?
‘হ চিনি তো, সে তো কবে চইলে গেছে..
‘কোথায়? কোথায় গেছে জানো?’
‘জানি না। শুনিছি ইন্ডিয়া’।
 
 
ওই উঠোন থেকে কখন কিভাবে হাবিবের বাড়িতে ফিরেছি জানি না। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। এত রাতে আর খুলনা শহরে ফেরা হবে না। রাতে জাম গাছের নিচে সেই বাঁশের মাচাঙে হাবিব জানাল-
 
সুবল ঠাকুর এক রাতে হরেনদাকে ওভার ডোজ গাঁজা খাইয়ে উঠেনেই ফেলে রেখেছিল মাথায় ছোট্ট একটা বাড়ি মেরে। জবা সে রাতে ক্ষতবিক্ষত হয়। সারারাত ধরে। মাঝ রাতে হরেনের জ্ঞান ফেরে। বউকে জড়িয়ে ধরে হরেন ডুকরে কাঁদে। খুব ভোরে হরেনের ঘুমন্ত শরীর আর কাদা মাখা পায়ে প্রণাম করে জবা বেরিয়ে যায়। পালের হাটের তেমাথা মোড়ের পরই আটারো বেকি নদী। পাশেই শ্মশাণ। জবা সটান নদী বরাবর হাঁটতে থাকে….
 
 
হরেন ব্যথায় কোকিয়ে উঠে দেখে ঘরে জবা নেই। হরেনের শিল্পী মনে কামড় দেয়। হরেন বুঝেত পারে জবা কোখায়। গোঙাতে গোঙাতে হরেন নদী মুখো ছুটতে থাকে। শেষ বার সমস্ত শক্তি দিয়ে হরেন নদীতে ঝাঁপ দেয়। জবা তখনও ডুবে যায়নি। দুজন তখন ঘরে ফেরে তখনও আজান হয়নি। কেবলই পুব দিকটা হালকা রাঙা হয়েছে। হরেন-জবা কেউ কোনো কথা বলে না। ভেজা কাপড় ছাড়ে। কোনো সম্পদ নেই ওদের। হরেনের দোতারা আর জবার একটা টিনের বাক্সো। ওরা শেষ বার ঘরটার দিকে তাকায়। হাঁসগুলো প্যাক প্যাক করে না। কোথাও শাঁখ বাজে না। ওরা তেমাথায় এসে ভ্যানে চড়ে বসে। সূর্য উঠবে। আরও একটু রাঙা হয়েছে পুব দিকটা। হরেন জানে। ভ্যান থেকে খেয়া। খেয়া থেকে রিকসা। তারপর রেলগাড়ি। যশোর। সেখান থেকে বাসে বেনাপোল। ওপারে পেট্রপাপোল। খুব ভোরে আঁধার থাকতে থাকতেই ২০ টাকা দিলে পার করে দেয়। তারপর বনগাঁ লোকাল। কলকাতা।
 
 
হরেনের নাড়ি পোতা জায়গাটাতে গানটা লেগে থাকে না। গানের ধর্মই এমন বাতাসে মিলায়ে যায়। তা সে ‘আর আমারে মারিসনে মা’ হোক, কিংবা ‘আনন্দধারা বহিছে ভূবনে’ই হোক। হরেনদার শেষ কথাটা মনে আছে তো?
 
‘ছার, গান কোনোদিন আনন্দের হয় না! হ ছার, গান মানেই কষ্ট। গান হলো গিয়ে আফনার দুঃখ। এই যে আফনি কলেন না- আনন্দধারা বহিছে ভূবনে…আমাগে আনন্দ নাই ছার! আর যতই কই-‘আর আমারে মারিসনে মা, ননী চুরি আর করব না’…. তাও মারে। নিজির ছেলে হলি কি মারত কন ছার?
পরের মাকে ডাকবে লালন
তোর গৃহে আর থাকবে না মাগো
তোর গৃহে আর থাকবে না….
বলি মা তো চরণ ধরে-
আর আমারে মারিসনে মা..
 
 
………………….
৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s