বুকপকেটে রাঙতামোড়া কাঠিলজেন্স- ০৫

#বুকপকেটেরাঙতামোড়াকাঠিলজেন্স_০৫
পলাশী স্টেশন থেকে রাতে লালগোলা লোকাল ছেড়ে দিল। রাত তখন কটা বাজে জানার উপায় নেই। কারো হাতেই ঘড়ি নেই। ১৯৭১ সালের মার্চের শেষে পলাশী স্টেশনেও কোনো ঘড়ি ছিল না। গন্তব্য বহরমপুর। খুব ভোরে ভোরে নামলাম বহরমপুরে। দুটো রিকসা নেয়া হল। ফাঁকা পিচঢালা পথ। দুপাশে উঁচু উঁচু শিরিষ নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। ফিন ফিনে বাতাসে ভেঁপু বাজিয়ে রিকসা চলছে…।

রেজাউল ইসলাম। বছর পয়তাল্লিশ হবে। ফর্সা লম্বাটে মুখ। কাটা কাটা। বুদ্ধিদীপ্ত চোখে দ্যুতি। কঠোর। বড় বড় কানের উপর আরও বড় বড় চুল সায়েন্স ফিকশন সিনেমা মনে করিয়ে দেয়।আমি আর রেজাউল মামা এক রিকসায়। হঠাৎ মামা ফোস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বিড়বিড় করে বলেন- ‘হায় বহরমপুর’! আমার বোঝার কথা নয়। বুঝলামও না। একটার পর একটা ভাস্কর্য পার হচ্ছে… কোট ভবন পেরিয়ে গেল। গোরা বাজার, সাত্বিক পার্ক, লালদীঘি হয়ে হুগলির ঘাটে ওয়াটার ট্যাংকি মোড়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে রিকসা থামে।সুন্দর পরিষ্কার ছিমছাম শহর-বহরমপুর।

রিকসা থেকে নেমে সটান লক্ষী হোটেল-এ ঢুকে পড়লাম। মামা নাশতার অর্ডার দিলেন। কোত্থেকে দুটো হনুমান এসে টেবিলের পাশে হাজির হল! মামা একটা পরোটা ভাঁজ করে দিতেই তেনারা এক হাতে নিয়ে সরে গেল।

আরও ঘন্টাখানেক পর আমরা কান্দি যাওয়ার বাসে চেপেছি। বাস ছেড়ে দিল। ব্রিজে উঠতে মামা ফের দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন- ফ্লাশব্যাক ফ্লাশব্যক….আবছা ধূসর হয়ে গেল মামার মুখটা। চোখদুটো একটু কুচকে একসময় মুদেই গেল….।

১৯৪৭ সাল। এরকমই বসন্তকালে সুন্দরপুর গ্রামের শান্ত ধীর স্থির যুবক রেজাউল কান্দির হিন্দু-মুসলি দাঙ্গায় জড়িয়েছিল। বাড়িতে সকলেই তাকে নিয়ে চিন্তিত। হিন্দু-মুসলমান রায়টে তখন গোটা বাংলা জেরবার। কলকাতা থেকে খবর আসছে রাজপথ রক্তে ভিজে গেছে। মহাত্মা গান্ধী শয়তানী করে দাঙ্গা থামানোর জন্য কলকাতা আসার কথা বলে চলে গেলেন নোয়াখালি। সেখান থেকে কয়েকদিন বাদে কলকাতা আসলেন বটে, তবে দাঙ্গা থামানো নিয়ে কারো সাথে কোনো কথা বললেন না। কলকাতার এক বাড়িতে লুকিয়ে থাকলেন সব শান্ত না হওয়া পর্যন্ত। সে সময় যে যাকে পাচ্ছে কাটছে। কলকাতার বাইরে মুর্শিদাবাদে, কৃষ্ননগরে আর খিদিরপুরে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা। সেরকমই এক দাঙ্গায় তরুণ রেজাউল জড়িয়ে গিয়েছিল। দাঙ্গায় কেউ সখ করে জড়ায় না। এক জড়ায় প্রাণ বাঁচাতে, দুই প্রাণ হরণ করতে। রেজাউল প্রাণ বাঁচাতেই জড়িয়েছিল। তার সাহসীকতায় অনেক মুসলিম পরিবার রক্ষা পেয়েছিল। সেখবর চাউর হতেও সময় লাগেনি। রেজাউলকে গরুখোঁজা করছে হিন্দু যুবকেরা। এ খবর পাওয়ার পর তার পরিবার কি করবে দিশা পায়নি। রাতভর তাকে পালাক্রমে পাহারা দেওয়া হয়েছে। খুব ভোরে ভোরে বাড়ির মাত্র কয়েকজন সদস্য জানল রেজাউল চলে যাচ্ছে! কোথায় যাবে? পাকিস্তান। মুসলমানদের জন্য ‘নিরাপদ জায়গা’। এমনটিই ভাবত ওখানকার অনেকে।

ভোরে কেমন যেন বসন্ত বাতাস। কানা ময়ূরাক্ষীতে জল নেই। তির তির করে একটা ক্ষীণ নহর বয়ে চলেছে। হেঁটে হেঁটে নদী পেরোনো যায়। কানা ময়ূরাক্ষীর পাড় পর্যন্ত পরিবারের সেই অল্প কজন সদস্য এলো। রেজাউল একটিবার পেছন ফিরে দেখতে চাইল প্রিয় জন্মভূমি, যার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে গর্বিত মা জননী! মুখে কাপড়চাপা দিয়ে কান্না ঠেকিয়ে রেখেছে। বাবা নিথর। বড় দুই ভাই তদারকি করছে। তারা চিন্তিত। সকালে হয়ে গেলে ভাইকে বাঁচানো যাবে না। ঝপ করে পানিতে ঝাঁপ দিল রেজাউল। যে নদী হেঁটেই পার হওয়া যায় সে নদীতে কেন ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে পার হচ্ছে তা শুধুই রেজাউল জানে। আমরা কেবল অনুমান করতে পারি- শেষবার কি শৈশবের নদীজল গায়ে মেখে নিল?
গরুরগাড়ি, ভিন্ন ভিন্ন বাস, রিকসা এভাবে রেজাউল বহরমপুর আসে। সেখান থেকে ট্রেনে পলাশী। পলাশী থেকে বাসে তেহট্ট। সেখান থেকে অটোতে বেতাই। বিকেল নাগাদ লালবাজার চেকপোস্ট দিয়ে পূর্বপাকিস্তানে প্রবেশ করে রেজাউল। লালবাজার চেকপোস্টে অমোচনীয় কালি দিয়ে ওর হাতে একটা উল্কি এঁকে দেওয়া হয়- ‘রিফিউজি’! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সদ্য কৈশোর পেরুনো রেজাউল। দূরে কোথাও একটানা ডেকে চলেছে ডাহুক। কুব্ব কুব্ব করা অদ্ভুত সে স্বর! সন্ধ্যের আঁধার ঘনিয়ে নামছে… একটু দূরে আর দেখা যায় না। রেজাউল চকিতে ঘুরে দাঁড়ায়। শেষবার দেখে নেয় তার দেশটাকে। রাতটা প্রায় ঝুপ করেই নেমে আসে অচেনা-অজানা মেহেরপুরে বর্ডারে।

মেহেরপুর এসে সারারাত থাকতে হয় রিফিউজি ক্যাম্পে। পরদিন সকালে যার যার মত ছড়িয়ে পড়ছে রিফিউজিরা। কেউ কেউ কাঠবডি কচ্ছপের মত মাথার বের করা বাসে চেয়ে আরও দূরের শহর চুয়াডাঙ্গা অভিমুখে রওনা দিয়েছে। রেজাউলের গন্তব্যও চুয়াডাঙ্গা।
দুপুর নাগাদ অচেনা অজানা শহরে এক তরুণ পা রেখেছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। এ শহরে তার কোনো আত্মিয় নেই। কোথায় থাকবে, কি করবে কিছুই জানে না। শেষে এক দোকানির পরামর্শে নদীর পাড়ে ভিক্টোরিয়া জুবলী স্কুলের পাশে সরকারী সদর হাসপাতালের বারান্দায় ওর ঠাঁই হলো।

আমরা এই জায়গা থেকে রেজাউলের গল্পটাকে ওভারল্যাপ করিয়ে নেব। এই দিন থেকে ঠিক পাঁচ বছর পর এক যুবক ভকেশনাল কম্পাউন্ডারি ট্রেনিং শেষ করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে কম্পাউন্ডা হিসেবে যোগ দিল। ফর্সা, বুদ্ধিদীপ্ত, দ্যুতি ছড়ানো কটা চোখ, কানের উপর বড় বড় লোম। প্রতিজ্ঞাবদ্দ চোয়াল আর গম্ভির ভরাট গলার সেই যুবকটির নাম রেজাউল ইসলাম।

কান্দি আসতেই বাসটা হার্ড ব্রেক করল। রেজাউল মামা চোখ খুললেন। ঠান্ডা গলায় বললেন- ‘মালপত্তর গুছিয়ে নে, নামতে হবে’।

আমরা নেমে এলাম। বাসস্ট্যান্ড থেকে দুটো রিকসা নিয়ে ডাকবাংলা মোড়। সেখানেই রিকসা ছেড়ে দেওয়া হল। দুপুর হয়নি। দূর থেকে আগুনের হল্কামেশানো বাতাস ধেয়ে আসছে। মামা বিড়বিড় করলেন- ‘ময়ূরাক্ষীতে পানি নেই! বালির গরম আসছে’।
একটা মাটির ঘরের ছাউনি দেওয়া বারান্দায় আমরা মালপত্র নিয়ে বসে আছি। আমাদের ঘিরে রয়েছে উৎসুক লোকজন। আমরা ‘জয়বাংলা’ থেকে এসেছি। পুরুষরা এসে রেজাউল মামাকে ঘিরে ধরলঃ ‘একটু পরিষ্কার করে বইলো দেকি ভায়া, উদিকটাতে কি হইলচে? আমরা তো শুইনতে পেলাম ধচ্চে আর কাটচে..’

মামা শুধরে দিলেন- ‘শুধু কি তাই নাকি? রক্ত গঙ্গা বইছে। পুরুষদের হত্যা করছে আর মেয়েদের হত্যার আগে রেপ করছে! স্তন কেটে নিচ্ছে!’ শ্রোতাদের বেশীর ভাগ মুসলমান। তারা অবিশ্বাসভরা চোখে তাকিয়ে আছে। তাদের বিশ্বাস এখনও আটকে রয়েছে- মুসলমান কেন মুসলমানকে মারছে, কেন মারবে? তারা জন্মাবধি দেখেছে মুসলমানকে হিন্দুরা মারছে। ওদেশে হিন্দুদের মুসলমানরা মারছে। কিন্তু পাকিস্তানী সেনারা তো মুসলমান! তব্বে?

মামা গজগজ করেন- ‘এখানে বসে বসে ওখানকার খবর জানবে কি করে? মুসলমান? ছোঃ’ মুখ ঘুরিয়ে নিলেন রেজাউল মামা। কে জানে হয়ত তার সাতচল্লিলশ সালের স্মৃতি মনে পড়ল কি না…।

ওখান থেকে গরুর গাড়িতে সুন্দরপুর। ময়ূরাক্ষী পার হওয়ার সময় মামা আবারও নীরবে কাঁদলেন। আমি এসব খুটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছি দেখে মামা লজ্জা পেলেন। বাড়ি পৌঁছে যেরকম হাউমাউ করে কাঁদবেন ভেবেছিলাম, সেরকম হল না। মামার বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। মা আছেন। নড়তে চড়তে পারেন না। মামা পায়ের ধুলো নিতেই বুড়ি টের পেলেন! কে রে? রিজু? মামা মাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমরাসহ আরও দুটি পরিবার এই বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন রেজাউল মামা। আমার মায়ের ধর্মভাই।
মাত্র দুটো দিন গেল। মামা হঠাৎই ফিরে যাবার কথা বললেন! আমরা চমকে উঠলাম। উনি চলে গেলে আমরা কার কেয়ারে থাকব? এখানে সবাই তো পর! মামা ফিরে যাবার কারণ যা বললেন, তা শুনে আর কেউ মানা করল না। ‘একজন ডাক্তারের কাজ রুগি সারিয়ে তোলা। সে রুগি শত্রু না মিত্র তা নিয়ে পার্থক্য করা নয়’!
পরদিন রেজাউল মামা ‘জয়বাংলায়’ ফিরে গেলেন।

যুদ্ধ আরও বেগবান হলে মে মাসের দিকে মামা ফের ভারতে ফিরে গেলেন। কিছুদিন বাড়ি কাটিয়ে সীমান্তের বিভিন্ন ক্যাম্পে ডাক্তারি করতেন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হল। আমরা চুয়াডাঙ্গায় ফিরলাম। আমাদের নিবাস হল বড়বাজার। মামার বাড়ি ছিল হাসপাতাল পাড়া। এটা নতুন হাসপাতাল যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে তৈরি হয়েছিল। পরদিন মামার বাড়ি গিয়ে তাকে পেলাম। এবাড়ি ওবাড়ি ফের যাওয়া-আসা শুরু হলো।

সময়ের হাত ধরে আমাদের পুরো পরিবার চুয়াডাঙ্গা ছাড়ে। মামা আবারও রেলস্টেশনে এসে মাকে আমাদেরকে বিদায় দিলেন। সেই ফর্সা, বুদ্ধিদীপ্ত, দ্যুতি ছড়ানো কটা চোখ, কানের উপর বড় বড় লোম। প্রতিজ্ঞাবদ্দ চোয়াল আর গম্ভির ভরাট গলার রেজাউল মামা। ট্রেন ছাড়ার সময় জানালার সিঁক ধরে বলেলেন- শামসুন, ফের আসিস। আমাকে দেখতে আসিস…. এক সময় মামাটা ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল।

আটজন ছেলে-মেয়ে ছিল মামার। বড় ছেলেটা রাজশাহী রেডিওতে তবলা বাজাত। বাকি ছেলে-মেয়ে কারোরই টাকা পয়সা হল না। মামার রিটায়ারমেন্ট হল। শেষ জীবনে মামা খুব করে চাইতেন বহরমপুর ফিরে যাবেন। কানা ময়ূরাক্ষীর জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকবেন। আষাঢ় আসার আগে হঠাৎ হটাৎই কোনো কোনো রাত ময়ূরাক্ষী প্রবল তোড়ে ফুঁসে উঠত। দুকুল ভাসিয়ে নিত। বালিয়াড়িতে ধেয়ে আসা জলের তোড়ে সাদা সাদা ফেনা উঠত। সেই ফেনা বালির ময়লা মেখে বাদামী রঙ হত। মামা খুব করে চাইতেন খেড়ি ক্ষেত থেকে খেড়ি তুলে বাড়ি ফিরে মাকে বলবেন-মাসকলাই ডাল দিয়ে রাঁধো মা! কিন্তু তার যাওয়া হল না। ছেলে-মেয়ে কারোরই অত টাকা নেই যে তাঁকে পাসপোর্ট, ভিসা করিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবে। মামা জানতেন এখানকার কোনো ট্রেন বহরমপুর যায় না। বর্ডার। কাটাতার। দুপাশে সঙ্গিণ হাতে শান্ত্রি। সেই একাত্তর নেই যে দুটো দেশের মানুষ গলায় গলায় মিলে গিয়েছিল। সেই একাত্তর নেই, যখন কলকাতা পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়েছিল পূর্ববাংলাকে।

মামা অসুস্থ্য শরীরটা টেনে টেনে মাথাভাঙার পাড়ে নিয়ে যেতেন। তার কি কখনও মনে হত, এই নদীটায় ঝাঁপ দিলে বাড়ি যাওয়া যাবে! তার জন্মস্থানে? কীভাবে? মাথাভাঙা নদী দর্শনা পার হয়ে ফের ভারতে ঢুকেছে। নদীতে ভেসেও তো রেজাউল ভারতে চলে যেতে পারে! তারপর খাড়ি নদী হয়ে হুগলি নদী। সেখানে থেকে জলে ভেসে ভেসে ময়ূরাক্ষী। কানা ময়ূরাক্ষী।

মামা মারা যাবার দিন শেষ কথা কী বলেছিলেন জানি না। আমি সেখানে ছিলাম না। তখন আমি সাড়ে তিনশ মাইল দূরে। ১৯৭১ এ যে মানুষটি বহরমপুর শহরে সেই খুব ভোরে ফিনফিনে বাতাসে চুল উড়িয়ে আনন্দাশ্রু বইয়েছিলেন… ‘হায় বহরমপুর’ বলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলেন, আমার কেন যেন মনে হয় রেজাউল মামা মৃত্যুকালে আরও একটিবার বহরমপুরকে দেখতে চেয়েছিলেন। ভরাট কণ্ঠে বলতে চেয়েছিলেন- ইনহাস্ত ওয়াতানম! এই তো আমার জন্মভূমি!

…………………..
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s