বুকপকেটে রাঙতামোড়া কাঠিলজেন্স – ০৮

#বুকপকেটেরাঙতামোড়াকাঠিলজেন্স_০৮

একফোটা বাতাস নেই। গুমোট। দরদর করে শরীর ঘামছে। বাতাস সত্যি আছে কি-না বোঝার জন্য গাছের পাতা নড়া দেখতে চাইলে মনটা আরও বিমর্ষ হয়ে উঠল। আশেপাশে একটাও গাছ নেই! এমনকি কারও বাড়ি বা দোকানের সামনে একটা ফুলের টবও নেই। বৃক্ষহীন, লতাপাতাহীন, টবহীন, সবুজহীন এই অনার্য জায়গাটার নাম গুদড়ি বাজার! কী জঘন্য নাম! অধিবাসীরা অবশ্যি নতুন নাম দিয়েছে- চকবাজার।

দিনাজপুর শহরের একেবারে মধ্যিখানে এই বাজার। গালামালের দোকান, মোনহরী, মুদি, পাইকারী দোকান। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশভাগ দোকানের মালিক মাড়োয়ারি। এই বাজরটা থেকে বেরুতেই পেল্লাই ঝকঝকে কোটি টাকার শাড়ি-গহনার দোকান নিয়ে যে রোড তার নাম মাড়োয়ারিপট্টি। ‘পচ্চিয়া’রা (ভারতের উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে আসা রিফিউজি) কাঁথাকে গুদড়ি বলে এই বাজার কাম লোকালয়ের সত্তর-আশিভাগ অধিবাসী পচ্চিয়া। ওদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়ির দেওয়ালে সারাদিন একটা না একটা কাঁথা মেলে দেওয়া থাকত। সেই থেকে কাঁথা সমৃদ্ধ বাজার বা গুদড়ি বাজার!

-‘হা রে নরেন, হামার লাগি দুইটা চা ধরি আন কেনে…’
-‘যাছো… দুই টাত চিনি হবি, না এক টাত? কাচা পাত্তি মারি দিবার কহিম?
-‘কহিস। কহিবু ঢাকা থাকি বোন্দু আইসে, চা জানি ভালো করি বানাই দেয়, বুঝা পাইছি?’

চা আনার আদেশদাতা এই তেলকলের মালিক। মান্নান। যাকে বলা হলো সে পিয়ন বা দারোয়ান নয়। তেলকলের শ্রমিক। গুমোট ভ্যাপসা সর্ষের তেলের ঝাঁঝঅলা একটা তেলচিটচিটে ঘরে বসে আছি। বনবন করে ফ্যান ঘুরছে। খামাখা। সর্ষে জিনিসটাই ভীষণ ভীষণ দাহ্য আর গরম। সর্ষে নিয়ে জালিয়াতির গল্প আছে। পাকিস্তান আমল। তখনকার মানুষ চুরি-দারি-ধাপ্পাবাজীতে এখনকার মত এলেম অর্জন করেনি। বেশ অ্যামেচার। তো সেই সময়ে এক ঝানু সওদাগরের ইন্সুরেন্স ক্লেইম করার কাহিনী এই সর্ষেকাহিনী।

জাহাজভরে সর্ষে এনে সেই সওদাগর চট্টগ্রাম পোর্টের টিনশেড গুদামে রেখেছে। রেখেছে তো রেখেছেই। মালামাল খালাশ করে না। সে সময় চড়া রোদের জ্যৈষ্ঠ মাস। সিমেন্ট ঢালাই মেঝে, টিনের চাল, টিনের বেড়া… বস্তাভরা সর্ষে। থাকতে থাকতে একদিন দপ করে জ্বলে উঠল। পুড়ে গেল সেই সময়কার ২০ লক্ষ টাকার সর্ষে! ইন্সুরেন্স ক্লেইম করে পেল ৪০ লক্ষ!

সর্ষে গরমের রুমে বসে চা শেষ করে কোনোমতে ওখান থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপর ঘুমটি চা-দোকানে বসেছি। রাস্তায় একটা গাড়ি চলে গেল। কয়েকটা রিকসা। তার বাতাসে কিনা বোঝা গেল না, কয়েক টুকুরো কাগজ নড়ে উঠে জানান দিল একটু বাতাস ছেড়েছে।
আমরা আবার চা খেলাম। এবার বাইরের সিয়ারামের দোকানে। অবিরত পুরোনো হিন্দি গান বেজে চলেছে…।

আরও পরে রাত সাড়ে দশটা এগারটার দিকে নরেন মিলের চাবী দিতে এলো। চাবীর ছড়া দিয়ে মৃদুভাষী নরেন ঘাড় নিচু করে তার জং ধরা চটা ওঠা এবড়ো-থেবড়ো এখানে-সেখানে দড়ি বাঁধা টায়ার দিয়ে বানানো সিটের সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে চলল।

নরেন বাবুদের সামনে সাইকেল চড়ে না। অনেকটা দূর ঠেলে নিয়ে যায়। যখন আর বাবুদের দেখা যায় না, তখন নরেন সাইকেল চাপে। ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে সাইকেলটা আপত্তি জানায়। নরেন নিষ্ঠুরের মত সাইকেলটাতে প্যাডেল মারতে থাকে। মাড়োয়ারিপট্টি, চূড়িপট্টি, বড়বন্দর পার হয়ে নরেনের সাইকেল চলে…। বেল নেই। কাউকে রাস্তা থেকে সরানোরও দরকার নেই, কারণ নরেন প্রায় হাঁটার গতিতে সাইকেল চালায়। ওই ঘুটঘুটে রাতে রাস্তায় আর কেউ তেমন একটা থাকেও না। নিঃশব্দ রাতে সাইলেকটা ঝন ঝন করে বাজতে বাজতে চলে। এক সময় রাজবাড়ির কাছে আসে। রাজা দীননাথ। সন্ন্যাস বিদ্রোহের সময় এই রাজাই মুর্শিদাবাদের নবাবের অনুরোধে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুরোধে বিদ্রোহ দমনের জন্য হাজার হাজার সৈন্য আর বিশাল হস্তি বাহিনী দিয়ে সাহায্য করেছিল। রাজবাড়ি নিয়ে নরেনদের মনে শত শত গল্প আছে। নরেনরা ভয়ে সে সব কাউকে বলে না। কাকে ভয় কেন ভয়, সেটাও নরেন গুছিয়ে বলতে পারে না।

পরদিন আবার আমরা সন্ধ্যেবেলা আড্ডা দিতে বসেছি। আজ আরও জনা চারেক পুরোনো বন্ধু হাজির। স্বভাবতই নরেনের ডিউটি বেড়ে গেল। বিশেষ ভাবে বানানো চা, হাকিমপুরী জর্দা দেওয়া পান, কারো খয়েরসহ কারো খয়ের বাদে, কেউ দামী সিগারেট, কেউ সেই ঐতিহাসিক কাগজের বিড়ি! অদ্ভুত সেই গন্ধ! বিড়িতে আগরবাতির গন্ধ!

আমরা যে নরেনকে দিয়ে অবলীলায় চা আনাচ্ছি, সিগারেট আনাচ্ছি, যে নরেন আমাদের সামনে সাইকেলে চড়ছে না, যে নরেন সর্বদা একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে, যার মাথাটা কোনোদিনও উঁচু হতে দেখেনি কেউ, সেই নরেন এবার ৬৫ পার হয়েছে! ভারতবর্ষের এই অঞ্চলের আদিবাসী সাঁওতালদের একটা অংশ উত্তর থেকে আসা আর্যদের সংমিশ্রণে অন্য একটা ‘নিম্ন জাতি’র উদ্ভব হয়েছিল। পলিয়া। স্থানীয়ভাবে বলা হয় পেলিয়া। অস্ট্রোলয়েড, মঙ্গোলয়েড আর পিকিংম্যান এর শঙ্কর যেন। নাকটা একটু বোঁচা, চাকমাদের মত চুল খাড়া, দেহের তুলনায় মুখ-মাথা বড়।

এদিনও আমাদের আড্ডা শেষ হলে নরেন মিলের চাবী দিয়ে সেই একইভাবে মাথা নিচু করে সাইকেল ঠেলে চলে গেল।

তার পরের দিন কি কাজে যেন ওখানে যাইনি। মান্নান ফোন করেছিল। পরদিন ওই সন্ধ্যেবেলা আবার গিয়েছি। বেশ কিছুক্ষণ পার হলেও চা আসছে না। মান্নানের দিকে উৎসুক নিয়ে তাকাতেই বুঝল। বলল- চলেন, বাইরে গিয়ে খাই। নরেন আসেনি। চা খাই। পুরোনো হিন্দি গান শুনি। সিয়ারাম মুঙ্গেরের গল্প বলে। এই এক গল্প সে কুড়ি বছর ধরে বলে চলেছে…

সামঝা কি নাই? ইউপিমে যাব হম ভহিষ চারাতি থি.. তাব ক্যায়া হুয়ি তেরে কো মালুম? ছুন…বলে শুরু হওয়া গল্প সেই ২০ বছর আগে যেখানে শেষ হতো, এখনও সেখানেই শেষ হয়। সিয়ারাম বুড়িয়ে যাওয়ায় সময় একটু বেশী লাগে।

পরেরদিন ফের একই সময়ে গিয়ে বাইরে যেয়ে চা খেতে খেতে জানতে চাই, নরেন আসেনি? জগতের এত কিছু রেখে নরেনের খোঁজ নেওয়ায় মান্নান একটু অবাক! কানাই হুট করে সিনে আসে। কানাই লাল গুপ্তা। একটা ঘর। মা আর চার ভাই তিন ভাবী আট ভাতিজা-ভাতিজি নিয়ে থাকে। সাথে দুইটা রামছাগল। কানাইয়ের মা উল্টো প্যাচে শাড়ি পরে উত্তরপ্রদেশের কায়দায়। চশমার একটা ডাঁটি ভাঙ্গা। সূতো দিয়ে বাঁধা। এরই মধ্যে পাপড় বেলেন। পাপড় বেললে দিনে কুড়ি টাকা আয় হয়।

মাসিমা সেই পুরোনো ঢঙে বলতে থাকেন- ‘মান্নাওয়া মানজুওয়া আব ছহরপে গেইনি লাট বন গয়ি। হামারি পাপর খাইবে?’ আমরা হাসি। কি বলেন মাসিমা? আপনার হাতের পাপড় তো অমৃত! নোলক দুলিয়ে হাসেন মাসিমা। খুশি হয়ে বলেন- ‘হেইন্নে আ বেটা, বায়েঠ, হেইন্নে বায়েঠ। হম দেখা তানি…’

কানাই ‘পাড়া’য় যায়। ওখানে ‘পাড়া’ বললেই কাফি। বেশ্যাপাড়া বলতে হয় না। কানাই একটা মেয়ের কাছে নিয়মিত যেত। একদিন সাহস করে বলল-
-‘হম উসকো সাদি কারনা চাহতা, কোমরেট বাতাও, সহি ইয়া গলাত?’
ডিক্লাস ডিক্লাস শুনে শুনে কান পাকিয়েছি। আমরা বলি-
-‘আলবাত ইয়ারো! কিঁউ নেহি?’
-‘সাহি তো?’
-‘বিলকুল, তুম কা সামাঝ রাখখি…চালো, হমভি সাত দেঙ্গে…’

কানাই এক সুন্দর রাতে সানাইয়ের ক্যাসেট বাজিয়ে বিয়ে করে। কানাইয়ের অনেক টাকা হয়। পরের বছর কানাই অন্য পাড়ায় বাসা ভাড়া করে। ২০ বছর পর কানাই বাড়ি বানায়। বাড়ির মধ্যে পেতলে বানানো মা চন্ডির প্রতিমা আনে। কানাই এখন শ্রীকানাইলাল গুপ্তা আগারওয়াল।

বাসায় ফেরার সময় মনে হয়, নরেন কেন আসে না? খুব স্বাভাবিক ঘটনা। নরেনের জ্বর হতে পারে, ছেলে-মেয়ে কেউ অসুস্থ্য হতে পারে, বউ অসুস্থ্য হতে পারে।
তার পরের দিনও যখন নরেনকে দেখলাম না তখন মনটা কেমন করে উঠল। মান্নানও চিন্তিত। নরেনের ফোন নেই। তার বাড়ির পাশের কারো ফোন নেই্। মান্নান তার বাড়িও চেনে না। শুধু গ্রামের নামটা জানে।

২০১৬ সাল। দিনাজপুর শহরজুড়ে ব্যাটারি চালিত থ্রিহুইলার অটো চলে। শব্দ নেই। শুধু বাতাস কাটার শো শো শব্দ। একাট অটো রিজার্ভ করে আমরা চললাম নরেনের খোঁজ নিতে….!

লংপ্লে রেকর্ডটার শেষ মাথা থেকে পিন লাগানো হেড আলতো করে তুলে একেবারে প্রথমে সেট করলাম। ঘ্যাস ঘ্যাস শব্দ। রিওয়াইন্ড রিওয়াইন্ড… ফ্ল্যাশব্যাক… নরেন এন্ড ফ্যামিলি। রিওয়াইন্ড রিওয়াইন্ড….

২০১০। নরেনের একটাই মেয়ে সতী। বয়স ১৩ কি ১৪। বুনো চেহারা। সাঁওতালদের মত সুঠাম। পেটানো। এক প্যাঁচে পাছাপেড়ে শাড়ি পরে। ক্লাস ফাইভে পড়ে। সারাদিন বাড়ির কাজ করে। সন্ধ্যেবেলা ধানুয়া চৌধুরীর বাড়ির কল থেকে জল আনতে যায়। সেই জলই খাবার জল। রান্না-স্নান সব ডোবার জলে চলে। সেদিন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। একটু ধরে আসতেই নরেনের বউ সতীকে জল আনতে পাঠায়। পা টিপে টিপে সতী কলের কাছে গিয়ে জল ভরে। কলসি কাঁখেও নেয়। একটু পরেই আবার বৃষ্টি নামলে ওই বাড়ির বারান্দায় উঠে দাঁড়ায়। কেউ একজন একটা গামছা দেয় গা মুছতে। তারপর কিভাবে যে গামছাটা ওর মুখে আটকে যায় ও জানে না। যখন জ্ঞান ফেরে তখন রাত দুপুর। বাড়ির পাশের এক চিলতে ফাঁকা জায়গায় কাদার মধ্যে সতী শুয়ে আছে। তলপেটের নিচে প্রচন্ড ব্যথা। একটু নড়ে চড়ে আবার জ্ঞান হারায়।

এই ঘটনার কথা নরেন আর তার বউ ছেলেরা কাউকে জানায়নি। গোপনে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ১৫/১৬ দিন পর মেয়েকে বাড়িতে এনেছে। লোকজন জিজ্ঞেস করলে বলত- ‘সাগাই বাড়িত গেইছে’!

পরের বছর নরেন তার শেষ জমিটুকু বিক্রি করে দূর গ্রামে মেয়ের বিয়ে দেয়। তখনও নরেন শহরের ওই তেলকলে কাজ পায়নি। মেয়ের বিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই ছেলে পক্ষ জানতে পারে সতী আসলে ‘অসতী’। ছেলের বাপ সতীকে নরেনের বাড়ি রেখে যায়। এইসব গ্রামে এই ঘটনাগুলো খুবই স্বাভাবিক ছন্দে আর নিষ্পাপ অনুভূতিতে ঘটে। কারোরই কোনো বেগড়বাই নেই।

এর পরে প্রত্যেক বছর নরেনদের অবস্থা একটু একটু খারাপ হতে থাকে। নরেন চকবাজারে মান্নানদের কলে চাকরি পায়, কিন্তু ওর ছেলে, ভাইয়ের ছেলেরা কোথাও কোনো কাজ পায় না। এর ওর দালালি করে আর রাতদিন মহেশপুরের তাড়িভাট্টিতে গিয়ে পড়ে থাকে।
সতী নরেনের মত মাথা নিচু করে থাকে না। তার কাছে রাতে নরেন বাড়ি ফেরার আগের সময়টাতে পাড়ার গ্রামের ছেলেরা আসে। সতীর হাতে মোবাইল ওঠে। সতী মোবাইলে ভিডিও দেখে। সেই বৃষ্টির রাতের মত ভিডিও দেখলেই সতী মোবাইল বন্ধ করে দেয়।

নরেনরা মোট ২৮ ঘর মানুষ এই অঞ্চলে টিকে আছে। ওদের কিছু জ্ঞাতিগোষ্ঠি ভিটে মাটি বিক্রি করে শহরে এসে বস্তিতে থাকে। শহরেই এটা সেটা করে তাদের দিন কেটে যায়। এই পলিয়া সম্প্রদায় আগে শুধুই চাষবাস করত। ধান উঠে গেলে মুড়ি ভেজে সেই মুড়ি হাটে নিয়ে বেঁচত। এদের মেয়েরা শাক পাতা তুলে বিক্রি করত। নির্বিবাদী নিরীহ গোবেচারা এই মানুষগুলো কাউকে কোনোদিন জোরে কথা বলেছে এমন রেকর্ডও নেই।
তার পরও নরেনদের ওই ২৮টা পরিবারকে উচ্ছেদ করার জন্য আশেপাশের কয়েকজন উঠে পড়ে লেগেছিল। ধানুয়া চৌধুরীর ছেলে ঢাকা থেকে কয়েকজন বন্ধু বান্ধব নিয়ে এসেছে। তারা অঞ্চলটা দেখে রায় দিয়ে গেছে –জায়গাটা ইকো পার্ক করার জন্য বেস্ট!
সেই থেকেই চৌধুরী বাড়ির এক একটা বম্ব শেল নরেনদের পরিবারগুলোর উপর আছড়ে পড়ছে। ধানের জমি যা ছিল সব শেষ। দখলের সিস্টেমটা পুরোনো। প্রথমে ওদের জমির পাশের জমি কেনে। তার পর একটু একটু করে আল তুলে এগোতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যেই পুরো জমি দখল সম্পন্ন।

যেদিন থেকে নরেন মিলে যায়নি তার ঠিক ১০ দিন আগে থেকে ওদের ২৮টা পরিবারের মাতব্বর হারাধন পলিয়া সবাইকে বলে রেখেছিল, কাউকে কিচ্ছুটি বলা যাবে না। ওরা দেশ ছেড়ে চলে যাবে। সব ব্যবস্থা হচ্ছে। নরেন গা করেনি। ওর যেতে মন টানেনি। তাই চুপ করে আছে। গেলে গেলাম, না গেলে না গেলাম এর মত।

২০১৬ সালে আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ। প্রচণ্ড গরমে নরেনের ঘুম আসছিল না। ছেলেরা অনেক রাত পর্যন্ত মালপত্র গোছগাছ করেছে। মালপত্র আর কি? কিছু কাপড়-চোপড় আর কয়েকটা থালা বাটি। নরেনের বাপের আমলের একটা পেতলের ঘটি। শত অভাবেও নরেন ঘটিটা বিক্রি করেনি। বাপের ওই ছোঁয়াটুকুই নরেন আঁকড়ে ধরে রেখেছে। সতী এসে একবার নরেনকে বকে গেছে। খুব ভোরে রওনা হতে হবে। তাই নরেন যেন একটু ঘুমিয়ে নেয়। নরেন অবাক হয়! ওইটুকুন মেয়ে কী করে যে সব বোঝে….! রাতের শেষ প্রহরে শেষবার কুহক ডেকে ওঠে কুহক কুহক কুহক… রাতের আঁধার থাকতেই ত্রিশ-চল্লিশ জন মানুষ গুড়গুড় করে বাড়ি ছাড়ে। গরিবের সব কিছুই অনড়ম্বর। এই যে এই মানুষগুলো চিরদিনের জন্য জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তাতে যেন এদের কোনো বিকার নেই! এই যে মাটি থেকে টান মেরে ছোট গাছ তোলার মত তুলে ফেলা হচ্ছে তাতেও এদের কোনো উচ্চবাচ্য নেই। দুঃখ তাপ নেই! চাবি দেয়া পুতুলের মত সার বেঁধে চিকন আল ধরে ওরা হাঁটা শুরু করে।

অনেকটা দূর ওই চিকন আল ধরে হাঁটার সময় কেউ একটি বারের জন্যও পেছন ফিরে তাকায় না। কে জানে, হয়ত ওদের বুকের ভেতর কোথাও দগদগে ঘা হয়ে আছে। পেছন ফিরলেই সেই ঘা তাজা হয়ে যাবে। কষ্টে যদি হাঁটা বন্ধ হয়ে যায়!

চিকন আলের পথটা বড় রাস্তায় যেখানে মিশেছে সেখানে গিয়ে চকিতে নরেন ফিরে তাকায়! দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের বাড়িগুলো একটু ছোট দেখায়। বাঁশ ঝাড়ের দুটো বাঁশ হালকা বাতাসে একবার ঘরের চালে গিয়ে মেশে আবার উঠে আসে…একটা বেওয়াশি কুকুর চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে। অগ্রগামী দল থেকে হাক ছাড়ে কেউ-
‘নরেন খাড়াই আছি কেনে তে? বেলা উঠি গেইল যাবা পারিবু? ফাস করি আয় কেনে….’
নরেন তবুও নড়ে না। দৌড়ে আসে সতী। সেও শেষবার বাড়িটা দেখে। তার পর বাপের হাত ধরে জোরে ঝাঁকি দেয়-
‘বাপ হাটেক…’
নরেন বাধ্য ছেলের মত মাথা নিচু করে সতীর পেছন পেছন হাঁটতে থাকে।

নরেনরা ওদের গ্রাম ছেড়ে শহরে ঢোকে। তখনও রাত। শহরের এক মাথা দিয়ে ঢুকে আরেক মাথায় দিয়ে বেরিয়ে কাঞ্চন নদী পার হয় হেঁটে। নদীতে পানি নেই। ওপারে উঠে পাকা রাস্তা ধরে ৩ মাইল হাঁটতে হবে। তার পর বিরল। ছোট্ট বিরল বাজার ছাড়িয়ে বিরল রেলস্টেশনে উঠতে হবে। সেখান থেকে আরও পশ্চিমে রেললাইন ধরে হাঁটলে শেষে চেকপোস্ট। এখানে দালাল ঠিক করা আছে। তাদেরকে জনপ্রতি ৫ শ টাকা দিতে হবে। তারা বিএসএফ আর বিজিবি ম্যানেজ করবে। তারপর ওপারে আর এক দালালের হাতে সোপর্দ করে দেবে। এসব নরেন বোঝে না। সব ঠিক ঠাক করেছে হারাধন।

নরেনরা যখন বিরল স্টেশনে পৌঁছেছে তখন কেবল পশ্চিম দিকটা লাল হয়েছে। তখনও নরেনের হাতটা ধরে রেখেছে সতী। এই সময় হারাধন শেষবারের মত সবাইকে কিভাবে কি করতে হবে, কি জিজ্ঞেস করলে কি বলতে হবে সব বলে দেয়। সবাই মাথা নেড়ে বুঝতে পেরেছে জানায়। কেবল নরেনের কোনো রা নেই। সে নির্বিকার। দালাল এসে মাথা গুণে হুকুম করে- আগে বাড়ো….

একে একে সবাই চেকপোস্টের বাঁশ পার হয়ে যায়। বাকি আছে নরেন আর সতী। নরেনের তিন ছেলে, দুই ছেলের বউ আর তার বউ পার হয়ে গেছে। দালাল ফিরে এসে দাঁত খিচে যায়। হারাধন বাঁশের ওপাশ থেকে চিৎকার করে। নরেন কাঁপা কাঁপা গলায় সতীকে বলে-

-মাগো, মুই এ্যাঙনা জল খামো…
-মোর ঠে তো জল নাই!
-থাইলে মুই ওই ডোবা থাকি খাই আইসো?
মাথা নাড়ে সতী।
নরেন ধীর পায়ে জল খেতে নেমে যায়।

বাঁশকলের ওপাশ থেকে একটা তীক্ষ্ণ বাঁশী বাজে! সময় শেষ। আর কেউ ওপারে যেতে পারবে না আজকের মত। বাঁশীর শব্দ মিলিয়ে যাবার আগেই সতী বাঁশ পার হয়ে গেছে। নরেন জল খেয়ে উঠে দেখে কেউ নেই! অনেক দূর থেকে সতী চিৎকার করে-

-বাপ তুই দৌড়া.. বাপ দৌড়া….
দালাল চিৎকার করে থামাতে চায়-
-যাইন্না! টাইম নাই। এলায় গুলি করি দিবে….

পেছন থেকে বিজিবি রাইফেল কাক করেছে। দালাল দৌড়ে চলে যায় স্টেশনের অন্য পাশে। এখন নরেন একা অবৈধ। ব্লাকার!

হাবাগোবা নরেন দূর থেকে সতীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে করে বসে এটা তার নিজের গ্রাম, নিজের শহর… মাথা নিচু করে তার সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে নির্বিকার হাঁটতে থাকে…পেছন থেকে কেউ বন্দুক তাক করে। সামনে থেকেও কেউ বন্দুক তাক করে। নরেন যেন স্বর্গ আর নরকের মাঝামাঝি সেই কল্পিত চিকন দড়ির ওপর হাঁটছে…
কড়াৎ করে একটা শব্দ। তারপর ঠাস! শব্দটা প্রতিধ্বনি করেতে থাকে ঠাসসসস ঠাসসসস ঠাসসসস..

নরেন অবাক হয়ে নিজের পেটের দিকে তাকায়! তার পর কাউকে যেন নালিশ করবে সেভাবে ঘাড় কাত করে বলতে চায়…. বলতে পারে না। একবার শেষ বারের মত পেছন ফিরে দেখে….তারপর হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে। রেল লাইনের কালো পাথরের ওপর প্রথম চোটের রক্ত ঘন হয়ে জমে যায়… হাবাগোবা নরেন চিৎ হয়ে আকাশ দেখতে থাকে…আকাশে প্রথম ওড়া সাদা বক আর কালো কাক কাউকেই নরেন দেখতে পায় না।

এই রিওয়ান্ড গল্পটা যে বলেছিল তার নামটা জানানো খুব বেশী জরুরি নয়। থাক না। জগতে কত কিছুই তো ধামা চাপা পড়ে থাকে। এটাও থাকুক।

………………….
২৪ অক্টোবর, ২০১৯

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s