চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর ১২৬তম জন্মবার্ষিকী

mao ze dong

আজ ২৬ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর ১২৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৯৩ সালের এ দিনে জন্ম তাঁর। টিপিক্যাল আয়োজনে আমরা কখনই মাও-এর জন্ম-মৃত্যুবাষিকী পালন করি না। জন্ম বার্ষিকীতে চেষ্টা করি তাঁর রচনা থেকে কিছু অংশ তুলে ধরতে।

উপমহাদেশে ‘মাও’ এক বিস্ময়কর শক্তি! তাঁর চিন্তার গভীরে কিংবা তার দর্শনের অভ্রান্ততায় মাওকে এই অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষ আপন করে নিয়েছে। কমরেড চারু মজুমদারের কথার সূত্রে তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছে। আমরা বিশ্বাস রেখেছি- আজকের ওই পুঁজিবাদের পতন এবং সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংসের বিশ্বে ন্যুনতম গণতন্ত্রের কথা বলতে গেলেও আর আগেকার লাইনে এগোনো যাবে না। মাও এর তত্ত্ব প্রয়োগ এবং অনুশীলন ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক বিপ্লবও সম্পন্ন করা যাবে না।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ মতাদর্শকে সফল প্রয়োগ করে মাও সে তুঙ চীনের মত পশ্চাদপদ কৃষি নির্ভর দেশে বিপ্লব সম্পন্ন করেছিলেন। সেই সাথে যে তিনটি বিশেষ সংযোজন তিনি লেনিনবাদে সংযোজন করেছিলেন সেগুলোই মাওকে বিশ্বের সকল নেতা থেকে আলাদা করে। মাওয়ের সেই তিনটি অবদানের কারণেই মাও চিন্তা (পরবর্তীতে মাওবাদ) লেনিনবাদের মৌলিক সংযোজন হিসেবে বিবেচিত। যার প্রথমটি হচ্ছে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। মহামতি লেনিন এই সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন ১৯১৯ সালেই। তিনি বলেছিলেন- “যদি সমগ্র জনসংখ্যা সরকারের কাজে অংশগ্রহণ করে কেবল তাহলেই আমরা একেবারে শেষ পর্যন্ত, চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি।”

এবার আমরা সংক্ষিপ্তাকারে ‘মাওবাদ’-এর সূত্রায়ন উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর-মাওবাদঃ
৬০ এর দশকের যে মাও সেতুং চিন্তাধারার ভিত্তিতে ভারতবর্ষে এবং পূর্ববাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়েছিল সেই ‘মাও সেতুং চিন্তাধারা’ নিয়ে পার্টি অভ্যন্তরেই খুব একটা চর্চা ছিল না, জনগণের ভেতরে তো একেবারেই ছিল না ধরা যায়। তার পরও মাও চিন্তার আলোকে এখানে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল। কমরেড সিরাজ শিকদার, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড মোফাখখার চৗধুরী, কমরেড বদরুদ্দিন উমর, কমরেড ডাক্তার সাইফুদদাহার, কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, কমরেড দেবেন সিকদার প্রমুখরা সে সময় মাও চিন্তাধারাকে অবলম্বন করে পার্টি গঠন করে বিপ্লবের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পরবর্র্তীতে এদের অনেকেই বিশেষ করে বদরুদ্দিন উমর, দেবেন শিকদার, মোহাম্মদ তোয়াহা রাতারাতি ভোল পাল্টে মাওবিরোধী হয়ে উঠেছিলেন। যে ধারাবাহিকতায় একবিংশ শতকে এসেও তারা মাওবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আনেনি। নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক স্তরে ‘মাও চিন্তাধারার বদলে ‘মাওবাদ’ প্রতিষ্ঠা করে RIM (রেভ্যুলুশনারি ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট)।

ভারতে চারু মজুমদারের আদর্শে গঠিত পার্টিগুলো নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। বর্তমানে চারু মজুমদারের আদর্শে তাঁরই লাইন অনুসরণকারী পার্টি সিপিআই (মাওবাদী) বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) যে মাওবাদকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করে লক্ষ-কোটি মানুষ শত সহস্র বছরের গোলামি আর অত্যাচার নিপীড়নের পাহাড় সরিয়ে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি আনতে চাইছে সেই মাওবাদ কী?

বহু যুগের চীনা গণতান্ত্রিক ও জাতীয় বিপ্লব, সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগ্রাম এবং সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় মাও-সেতুঙ মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে এক সম্পূর্ণ নতুন স্তরে উন্নীত করেন তা হচ্ছে মাওবাদের স্তর। মাও দেখিয়েছেন যে দ্বন্দ্ববাদের একমাত্র মৌলিক সূত্র হলো বিপরীতের একত্বের নিয়ম। পরিমাণের গুণে রূপান্তরকে তিনি এই বিপরীতের একত্বের সূত্র দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। আর বলেছেন নেতিকরণের নেতিকরণ নিয়ম হিসেবে বিরাজ করে না। যা রয়েছে তা হচ্ছে ইতিকরণ ও নেতিকরণের বিপরীতের একত্ব। বিকাশের এতকাল ধরে চলে আসা ত্রয়ী মতবাদকে তিনি বাতিল করেছেন যা তিনটি সূত্রকে সমান গুরুত্বে পাশাপাশি উপস্থাপন করে, আর প্রতিষ্ঠা করেছেন অদ্বৈতবাদ। সুতরাং কমরেড মাওই মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদকে পূর্ণাঙ্গ ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বহুমাত্রিকভাবে দ্বন্দ্ববাদকে সমৃদ্ধ করেছেন।

তিনি এঙ্গেলসের স্বাধীনতার সূত্রায়ন সংশোধন করে দেখিয়েছেন স্বাধীনতা কেবল প্রয়োজনের উপলব্ধি নয় তার রূপান্তরও। জ্ঞানের তত্ত্বে তিনি বিকশিত করেন গভীর দ্বান্দ্বিক উপলব্ধি যার কেন্দ্র হচ্ছে এর নিয়ম রচয়িতা দুটি উলম্ফন (অনুশীলন থেকে জ্ঞান, আর তার বিপরীত, কিন্তুু জ্ঞান থেকে অনুশীলন হচ্ছে প্রধান)। তিনি দ্বন্দ্বের নিয়মকে পাণ্ডিত্যপূর্ণভাবে রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছেন এবং অধিকন্তু ব্যাপক জনগণের মধ্যে দর্শনকে নিয়ে গেছেন সেই কর্তব্য সম্পাদন করার মাধ্যমে যা মার্কসের বাকি ছিল।
মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিতে, চেয়ারম্যান মাও ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর মধ্যকার সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেন এবং “উৎপাদিকা শক্তি” সংক্রান্ত সংশোধনবাদী থিসিসের বিরুদ্ধে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সংগ্রামকে অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত টানেন যে উপরিকাঠামো তথা চেতনা ভিত্তিকে রূপান্তর করতে পারে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তিকে বিকশিত করা যায়। রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ, লেনিনবাদী এই ধারণাকে বিকশিত করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যে, রাজনীতিকে অবশ্যই কমান্ডে থাকতে হবে (সর্বস্তরে প্রযোজ্য) এবং রাজনৈতিক কাজ হচ্ছে অর্থনৈতিক কাজের প্রাণসূত্র যা স্রেফ এক অর্থনৈতিক পলিসি নয় বরং আমদের রাজনৈতিক অর্থনীতির সত্যিকার সমাধানে নিয়ে যায়।

ঐতিহাসিকভাবেই মাও চিন্তাধারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এক সম্পূরক ধারা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আজকের দিনে কোনো দেশের পক্ষেই আর আগেকার ঢঙে গণতান্ত্রিক বিপ্লব করা সম্ভব হবেনা। কৃষি ভিত্তিক শিল্পবিকাশ না হওয়া দেশগুলোতে মাও এর লাইন ছাড়া আর কোনোভাবে নয়া গণতান্তিক বিপ্লব করা সম্ভব নয়। চেষ্টা কম হয়নি, কিন্তু ফলাফল শূণ্য। বিশ্বের যদি একটি মাত্র দেশেও সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়তে থাকে তা নিশ্চিতভাবেই মাও নির্দেশিত পথে হবে, এর বত্যয় ঘটবে না, কেননা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ধারণা এখন আর তার হিংস্র নখ-দাঁত লুকিয়ে রাখতে পারছে না।

জন্ম দিবসে মহান শিক্ষক মাও সে তুঙ এর শিক্ষাটাই আমাদের পাথেয় হয়ে উঠুক। এই জনপদের বিপ্লবী মানুষ নিজেদের ভাগ্য গড়তে পুরোনো ধ্যান-ধারণা ভেঙ্গে বিপ্লবের গৌরবোজ্জল নতুন পথের সারথী হয়ে উঠুক। বিপ্লব অনিবার্য এবং অবসম্ভাবী।

…………………..
মনজুরুল হক
২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s