মৃত্যুদিনে ঋত্বিক কুমার ঘটককে স্মরণ

যে মানুষরা এপিটাফ বানায় তারা কায়মনবাক্যে প্রার্থণা করে তাকে যেন প্রিয় মানুষের এপিটাফ বানাতে না হয়। যারা লেখে তারাও প্রার্থণা করে যেন প্রিয় মানুষের অবিচ্যুয়ারি লিখতে না হয়…। তার পরও লিখতে হয়। এই যেমন আমাকে ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুদিনে শোকার্ত উপাখ্যান লিখতে হচ্ছে।

হ্যাঁ। আজ ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। এই একই বছর ৯ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান মাওয়ের মৃত্যু হয়েছিল। ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্প’তে যেমন ঋত্বিক বলেছিলেন- প্রাগ্রসর হও….আমিও লেখা নিয়ে প্রাগ্রসর হই…।

তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে এই এক সমস্যা! কোথায় থামতে হবে হুশ থাকে না। এই যেমন ধরুন তাঁর কিছু উক্তি-

“সিধু বাবু পুলিশকে গিয়ে বল, আমি ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক কারো দাসত্ব করে না। এবার বিড়ি দাও। আমার লাল … এই বাংলায় আর কোনো বাপের ব্যাটা নেই যে বলবে ঋত্বিক ঘটকের থেকে মানুষকে বেশি চেনে। মানুষের কোথায় সুখ আর কোথায় দুঃখ সেটা জানলেই…”

কী প্রবল দায়িত্ব নিয়ে বলতেন- “আর্ট মানে আমার কাছে যুদ্ধ”, পর্দায় ঋত্বিকের স্পর্ধা !
ঋত্বিক ঘটকের ছবি মানেই রূপক ৷ কখনও বেদনার ৷ কখনও বিচ্ছন্নতার দুঃখ ৷ দুই বাংলার ভাগ হওয়াকে যেন গোটা জীবনই মেনে নিতে পারেনি তিনি।

কী লিখব? লিখতে ভালোলাগে না। মাত্র কিছুদিন আগে ঋত্বিকের জমজ বোন প্রতীতি দেবী মারা গেলেন। তাঁকেও এই অভাজন জাতি মূল্যায়ন করেনি। প্রতীতি কতটা ক্ষোভ নিয়ে কী বলেছিলেন?
“ঋত্বিক ঢাকায় থাকতো পরীবাগের কাছাকাছি গ্রিন হোটেলে। আমি কিছুদিন অসুস্থ ছিলাম, একটু সুস্থ হয়েছি সবে, সময়টা ১৯৭৩ বা ৭৪ হবে, সেনাবাহিনীর দুজন আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল, তারা এসে আমায় বললো, তাড়াতাড়ি চলুন, ঋত্বিক ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি হোটেলে গেলাম, আরও কয়েকজনের বাড়িতে গেলাম। কোথাও সে নেই। আমি দৌড়ে এয়ারপোর্ট গেলাম। সেখানে ঋত্বিক আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না! সারা জীবন ও শুধু কেঁদেই গেল, কিছুই পেল না!”

প্রতীতি একটু দম নিয়ে বললেন-
“ঋত্বিকের জন্য মিসেস গান্ধী বিশেষ বিমানের আয়োজন করেছিলেন। ওর জন্য ওই বিমান এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ঋত্বিক কিছুতেই আমাকে ছাড়ছিল না। সন্ধ্যা হয়ে যায়, ঋত্বিক আমাকে ছাড়ে না, আমাকেও তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। তারপর আমি আমার ছেলেমেয়েদের কথা বললাম। তখন সে একটু শান্ত হলো। এদিকে বিমান থেকে ওকে তাড়া দেওয়া হচ্ছিল বারবার। ঋত্বিক বলে দিল্লিতে ফোন করতে। এয়ারপোর্ট থেকে দিল্লিতে ফোন করা হলো। দিল্লি থেকে বলা হলো, ঋত্বিক যতক্ষণ না যেতে চাইছে, ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। প্লেনের দরজায় দাঁড়িয়েও সে কাঁদতে থাকলো, আমি জোর করে ওকে প্লেনের ভিতরে পাঠালাম। আবারও তাকে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে, তার চোখ দিয়ে জল ঝরছে… ঝরেই যাচ্ছে… ঢাকায় ওকে শেষবার ওভাবেই দেখেছি, কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে দেখেছি।”

অবিচ্যুয়ারি লিখতে বসে বাপু ছবির কাশুন্দি কেন? না। তার পরও লিখতে হবে। যেমন- ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এই সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র। মূল চরিত্র একজন মাতাল বুদ্ধিজীবী নীলকণ্ঠ বাগচী,যে তাঁর বন্ধুদের মত সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে নিজেকে বিক্রি করে দেয়নি। নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন ঋত্বিক স্বয়ং। সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক হলেও এটা ১৯৪৭ এর দেশভাগ,রাজনৈতিক পরিস্থিতি,১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আর নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সময়ের একটি নির্মোহ-নির্মম সমালোচনা।

এই ছবিতেই তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি- “ভাবো,ভাবো,ভাবা প্র্যাক্টিস করো।” সুশীল লেখক সত্যজিৎ বসু যখন তাঁকে বলছেন বাংলাদেশ নিয়ে তার ভাবনার কথা,নীলকণ্ঠ বাগচীর কণ্ঠে তখন চরম উপহাস হিসেবে কথাটা এসেছিল।

তিনি আরও বলতেন- “সিনেমা বানিয়ে যদি জনগণের কথা না বলতে পারতাম, তাদের কাছে না যেতে পারতাম তাহলে কবেই সিনেমার পোঁদে লাত মেরে চলে যেতাম…”!

এরপরই ঋত্বিক ঘটক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। প্রায় তিন বছর মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মানসিক ভারসাম্য হারানো অবস্থাতেই ১৯৭৬-এর ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।

এই মানুষটিকে কলকাতার সুশীল বুদ্ধিজীবীরা গ্রহণ করতে পারেননি। তাদের কোথায় যেন সুপ্ত জাত্যাভিমানে চোট খেত! সৌমিত্রবাবু ঋত্বিককে থাপ্পড় মেরেছিলেন কেন? বাংলামদ খেয়ে মাতাল ছিলেন বলে? ট্রাম ভাড়া চাইছিলেন? এসব কিসসু না। তিনি সৌমিত্রবাবুদের প্রগতিশীলতা মার্কসবাদ বিষয়ে মূর্খতাগুলো মুখের ওপর উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। তিনি এমনই। তিনি যখন মতাদর্শীক বিতর্ক করতেন তখন রয়েসয়ে করতেন না। তীব্র শ্লেষাত্মক যুক্তি আর তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে আগ্রমণ করতেন। মার্কসবাদ অমনই। নির্মোহ। নিরাভরণ। নিঃশঙ্ক।

তিনি হাসতে হাসতেই বলতে পারেন- “আমি প্রতি মুহুর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো যে, এটা কোনো ভেবে বের করা গল্প নয়। বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। সিনেমার কাজ মন যোগানো না, মন জাগানো। ফিল্ম মানে ফুল নয়, অস্ত্র।”
ঋত্বিক প্রসঙ্গে যখন সত্যজিৎ বলেন- “ক্যামেরাটা কোথায় বসাতে হবে এই একটিই মানুষই ঠিকঠাক জানেন….আর অল্প অল্প জানি আমি”, তখন কি বুঝতে বাকি থাকে ভারতবর্ষ কাকে হারিয়েছে বড্ড অসময়ে?

আমারও ইচ্ছে করে রাতের পর রাত তাঁকে নিয়ে লিখি। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থানের বাঁকে বাঁকে যে আদর্শ আর দিকনির্দেশনা ছিল তা খুঁটে খুঁটে টেনে বার করা প্রিয় মানুষ ঋত্বিককে নিয়ে লিখতেই থাকি……

কিন্তু আমরা এতটা বছর পরও আর একটা ঋত্ত্বিক জন্ম দিতে পারিনি। এই মাটিতে আর একজন নীলকণ্ঠ বাগচী হেঁড়ে গলায় বলে ওঠেনি- ভাবো ভাবো, ভাবা প্রাকটিস করো…
……………
মনজুরুল হক
৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s