আজকের দিনে প্রত্যুষে না হয়ে মাঝরাতে ফাঁসি হয়েছিল ভগৎ সিংয়ের

২৩ এ মার্চ ১৯৩১ সাল। ভুলে যাই…. ভুলে যাই আজকের দিনে প্রত্যুষে না হয়ে মাঝরাতে ফাঁসি হয়েছিল ভগৎ সিংয়ের। সাথে রাজগুরু ও সুখদেবেরও।

১৯৩১ সালের আজকের দিনে যে ক্লান্তিহীন বিপ্লবীকে ইংরেজরা কারাবিধি লঙ্ঘন করে ফাঁসিতে লটকে দেয়, তখন তার বয়েস ছিল ২৩ বছর ৫ মাস ২৭ দিন। শহীদের জীবনকালের হিসাব সামান্য পাটিগণিতে বা বলিউডি সিনেমায় পাওয়া যায়না, যতদিন পৃথিবীতে থাকবে অন্যায়, থাকবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তিনি জ্বলবেন পৃথিবীর রঙে।
কেউ তাকে বলবেন নৈরাজ্যবাদী, কারণ ফরাসী এনার্কিস্টের হুবহু অনুকরণে আইনসভায় বোমা ফেলেছিলেন ভগৎ সিং।

এই সেই ভগৎ সিং! যিনি বলেছিলেন; “বাহেরেকো জাগনেকি লিয়ে ধামাকেকি জারুরৎ পাড়তি!” অর্থাৎ বধিরকে জনসাধারণকে জাগানোর জন্য বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। আজকের দিনে বামপন্থীরা যে লাইন থেকে সরে এসে নির্বাচনের কানাগলিতে ঘুরেই চলেছে… ঘুর্টে চলেছে…!

প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে যখন বাকি সব নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা মাথা কুটে মরবে, নিপীড়িত জনজাতি যেখানে যে প্রান্তে শেষ সম্বল হিসাবে তুলে নেবে রাইফেল, কান্না জ্বালাবে সর্বগ্রাসী দাবানল, সেখানে তিনি আসবেন ‘সন্ত্রাসবাদী’ রূপে। আমাদের ইতিহাসে ভগৎ সিং এইরূপে নেই। আছে নাম কা ওয়াস্তে একজন স্বাধীনতাকামী পাঞ্জাবী যুবক হিসাবে। মতলববাজ শাসকদের তল্পিবাহক ইতিহাসবেত্তারা এভাবেই এই মহান বীরকে চিত্রায়ণ করেছে!

আমরা এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচয়ের উর্ধে তাঁকে ভালবেসে ডাকব একটি বিশেষ নামে।
শহীদ – ই- আজম।

শহীদ ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেব- লাল সালাম
ভোর রাতে ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর করার প্রচলিত রীতি ভেঙে ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় লাহোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো বিপ্লবী ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেব-কে। হত্যার পর তটস্থ বৃটিশ শাসকেরা ঐদিন রাতেই কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে পাঞ্জাবের সুপ্রসিদ্ধ শতদ্রু নদীর তীরে তাঁদের দেহ পুড়িয়ে ফেলেছিলো।

পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক আকাশে ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন শহীদ ই আজম ভগৎ সিং। পাঞ্জাবের অকুতোভয় বিপ্লবী শহীদ সর্দার অজিত সিং-এর ভাইপো সর্দার ভগৎ সিং দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন কৈশোরেই। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল বর্ধমানের তরুণ বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্তকে সাথে নিয়ে দিল্লী অ্যাসেম্বিলি হাউসে ‘শব্দ বোমা’র বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উপনিবেশিক শাসকদের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন ভগৎ সিং। কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, পরাধীন দেশবাসীর ঘুম ভাঙাতে এবং বধির বৃটিশ শাসকদের কর্ণকুহরে স্বাধীনতার দাবি পৌঁছে দিতে দিল্লী অ্যাসেম্বিলি হাউসে বোমাবিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিলো। বিপ্লবী যতিন দাসের বানানো সে বিশেষ বোমায় সেদিন কেউ হতাহত না হলেও, আলোড়িত হয়েছিলো গোটা ভারতবর্ষ। প্রচণ্ড শব্দে বোমা বিস্ফোরণের পর নিজেদের দাবিসম্বলিত লিফলেট ছড়িয়ে দিয়ে এবং হাতের পিস্তল ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। উদ্দেশ্য ছিলো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার দাবি উচ্চারণ করা। আদালতে দাঁড়িয়ে ভগৎ সিং অসীম সাহসিকতায় সে কাজটা করেছিলেন। বিচারে তাঁদের যাবজ্জীবন দিপান্তরের সাজা হয়েছিলো।

অত্যাচারী বৃটিশ পুলিশ কর্মকর্তা স্যান্ডার্স হত্যা-মামলায় ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেব-এর বিরুদ্ধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণা করেছিলো আদালত। দেশমাতৃকার জন্যে আত্মোৎসর্গ করতে নির্ভীক বিপ্লবীরা প্রস্তুত থাকলেও, প্রতিবাদে আসমুদ্রহিমাচল সমগ্র ভারতবর্ষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো। তাঁদের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখার জন্যে গান্ধীজির প্রতি দাবি জানানো হয়েছিলো। কথা দিয়েও গান্ধীজি কথা রাখেননি। ফাঁসি কার্যকর করার পরদিন ২৪ মার্চ কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে প্রবল বিক্ষোভের মুখে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করলেও, ভগৎ সিং-সহ বিপ্লবীদের সম্পর্কে বিভিন্ন সময় অশ্রদ্ধাপূর্ণ মন্তব্য করেছেন গান্ধীজি।

এখনও প্রতিবছর ২৩ মার্চ পাঞ্জাবের ভারত-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী শতদ্রু নদীর তীরে লাখো মানুষ সমবেত হয় মহান শহীদ-ত্রয়ীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতে। জাতীয়তাবাদী চেতনার সীমা অতিক্রম করে সাম্যবাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন শহীদ ই আজম ভগৎ সিং। স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষের। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের আপোষহীন বিপ্লবাত্মক ধারার অগ্রগণ্য প্রতিনিধি, যার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগানটি ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো, সে মহান বিপ্লবী ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোদ্ধা রাজগুরু, সুখদেব-কে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি! এবার পরিবর্তীত বিশ্ব পরিস্থিতিতে হয়ত সবকিছু দায়সারা। হয়ত ভগৎ সিং সেভাবে স্মরিত হলেন না। তবুও তাঁর চেতনায় ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

রীতি ভেঙ্গে ভোররাতের বদলে সন্ধ্যায় ফাঁসি হয়েছিল অমর বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের। কি এসে যায় তাতে? আমাদের চারিপাশটা যখন মেনিমুখো দালালি, বশ্যতা স্বীকার আর স্বার্থের চোবালিতে ডুবতে থাকে… তখনই ভগৎ সিং-এর মত বীরের জন্ম হয়। তারা নতমুখের বশ্যতা, ভন্ডামির প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলাকে কষে লাথি মেরে নিজর জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে উৎসর্গ করে। বাঁচিয়ে যায় অগনিত মানুষকে। সেই মানুষদের একজন হয়ে আজ বিপ্লবী ভগৎ সিং-এর শহীূদ দিবসে শ্রদ্দাবনত হই।

কেন তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাতে হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারকে, আর কেনই বা সেই প্রহসনের বিচার এবং নিষ্ঠুর রায়কে প্রতিবাদ না করে বরং সমর্থন জানিয়েছিল মোহনচাৎদ করমচাৎদ গান্ধী? সে বড় করুণ ইতিহাস। আমরা ক্রমান্বয়ে সেই ইতিহাসের হাত ধরে এগিোয় যেতে থাকব……

ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
কমরেড ভগৎ সিং অমর রহে।
এই বিস্ময় কিশোরের শিক্ষা- বাহেরেকো জাগনেকি লিয়ে ধামাকেকি জারুরৎ পাড়তি!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s