ঐতিহাসিক ‘নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান দিবস’ এর ৫৩তম বার্ষিকী রেড স্যালুট

২৫ মে, ১৯৬৭ সাল। নিছক একটি দিন নয়। একটি ইতিহাস। একটি অভ্যুদয়। একটি নির্ঘোষ। বসন্তের বজ্রনিঘোর্ষ। আজকের এদিনেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার ছোট্ট অঞ্চল নকশালবাড়িতে এই কৃষক অভ্যুত্থানের সূচনা হয়। খুব বেশি পেছনের ইতিহাস টানার সুযোগ নেই ছোট্ট পরিসরে।

১৯৪৬-এর তেভাগা আন্দোলনের আলোকে দার্জিলিং জেলার সমতলে শুরু হয় বর্গাচাষিদের আন্দোলন। গড়ে ওঠে কৃষকসভা। ১৯৫১ সাল থেকে মজুরি বৃদ্ধি ও বোনাসের দাবিতে চা শ্রমিকরা ধারাবাহিক জঙ্গি আন্দোলনে নেমে পড়েন। ১৯৫৯- সালে প্রাদেশিক কৃষকসবা জমিদারি বিলোপ আইনে উল্লিখিত ২৫ একরের বহির্ভূত জমি জোতদার জমিদারদের কবলমুক্ত করার ডাক দিলে দার্জিলিং জেলায় এই আন্দোলন গরিব ভূমিহীন কৃষক ও ভাগচাষিদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিন্তু আন্দোলন সংঘর্ষের রূপ নিলে ভীত হন প্রাদেশিক নেতৃত্ব। আন্দোলন গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নবগঠিত সিপিএম পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের এই সংশোধনবাদী ঝোঁক মেনে নিতে পারেননি চারু মজুমদার। ১৯৬৫ থেকেই সিপিএমের মধ্যে থেকে এই গণআন্দোলনবিমুখ নেতৃত্বের সংশোধনবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে রচিত হতে থাকল একের পর এক অতি মূল্যবান আটটি দলিল। ভিত নির্মিত হল এক ঐতিহাসিক কৃষক অভ্যুত্থানের।

লড়াইয়ের আশু ও দীর্ঘস্থায়ী কর্মসূচি শুরু হয় মূলত ৮মে তারিখে। তার আগে ২ মার্চ থেকে ঘটনার কলেবর বাড়তে থাকে। তারও আগে ১৯৬২ সালে ভারত-চীন সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকেই এটা স্পষ্ট হতে থাকে সি.পি.আই. প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত হতে চলেছে। একদিকে রয়েছে দক্ষিণপন্থী অংশ, তারাই সংখ্যাগুরু। সংসদমুখি। নির্বাচনকেন্দ্রিক। স্তালিনবিরোধী। ক্রুশ্চেভপন্থী। রুশ-চীন মহাবিতর্কে তারা রুশপন্থী তথা ক্রুশ্চেভপন্থী এবং ক্রুশ্চেভের ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতারোহণ’ সমর্থক। আর অপর অংশ চীনপন্থী তথা মাওপন্থী। স্তালিনপন্থী। নির্বাচনবিরোধী। সংসদীয় পন্থাবিরোধী। বিপ্লবকামী। ক্রুশ্চেভের ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা দখল’ এর ঘোর বিরোধী। সশস্ত্র সংগ্রামমুখি।

দক্ষিণপন্থী দলে ছিলেন- পি. সুন্দরাইয়া, এ.কে.গোপালন, হরকিষেণ সিং সুরজিৎ, জ্যোতিবসু, ই.এ.এস.নাম্বুদিরিপাদ, বাসবপুন্নিয়া। আর সশস্ত্র বিপ্লবী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন-চারু মজুমদার, সুশীলত রায়চৌধুরী, নিরঞ্জন বসু, মণি গুহ, সরোজ দত্ত, অমূল্য সেন, সুনীতি কুমার ঘোষ, পরিমল দাসগুপ্ত, অসিত সেন, সৌরেন বসু, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমূখরা। এঁরা ছিলেন জঙ্গি র্যা ডিক্যাল বিপ্লবী কমিউনিস্ট, এবং মাও জে দং এর বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত। ১৯৬২ থেকে যে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম চলে আসছিল তারই বিস্ফোরণ ঘটল ১৯৬৭ সালের মে মাসে।

১৮ মার্চ, ১৯৬৭ খড়িবাড়ির রামভোলা গ্রামের দক্ষিণের মাঠে ‘তরাই কৃষক সভা’-র সম্মেলন ডাকা হল। নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও ফাঁসিদেওয়া এই তিনটি ব্লকের কয়েকহাজার কৃষক সেদিন দুপুর ২টার মধ্যে সেই মাঠে হাজির হলেন। তর্ক-বিতর্কে উদ্দাম সম্মেলন শেষে ঘোষিত হল কর্মসূচি। জোতদারদের সমস্ত জমি দখল করা হবে। গ্রাম মুক্ত করতে ঘরোয়া প্রচলিত হাতিয়ার দিয়ে এবং জোতদারদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া রাইফেল নিয়ে গণমুক্তি ফৌজের সশস্ত্রীকরণ চলবে। এর পরই অনেক জোতদার তাদের রাইফেল কৃষক সমিতিতে জমা দিয়ে দেয়। অনেক জোতদার গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। পুলিশ কোনও কোনও এলাকায় গ্রামে ঢোকার চেষ্টা করলে কৃষকদের সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে পিছু হঠতে বাধ্য হয়।

এরই ফলশ্রুতিতে প্রতিশোধস্পৃহায় মরিয়া রাষ্ট্রীয় বাহিনী, ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের আধা সামরিক বাহিনী নিয়ে নকশালবাড়ির গ্রামে, প্রান্তরে তাণ্ডব চালাতে নেমে পড়ে। তবু দয়ারাম জোত, ঘুঘুঝোরা, মেচবস্তি, কাটিয়া জোতে কৃষকরা প্রতিরোধে শামিল হলে ছোট ছোট পুলিশের দল আক্রমণে না গিয়ে কৃষকদের কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি চায়। ট্রাকে চেপে বেঙ্গাইজোত হয়ে পানিট্যাঙ্কির ফিরতি পথে এই পুলিশরা প্রসাদুজোতে রাজবংশী কৃষকনেত্রী ধনেশ্বরী দেবীর নেতৃত্বে চলা নিরস্ত্র মহিলাদের মিছিলে বিনা প্ররোচনায় গুলি চালাতে থাকে। এখানে দুজন কোলের শিশু ও একজন কিশোরসহ ১১ জন কৃষকরমণী শহিদ হন। সেই ১১জন শহীদের রক্তের শপথে বলিয়ান হয়ে ঘটে যায় কৃষক অভ্যুত্থান। তারাই নকশালবাড়ী অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ।

এই সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পর পরই নকশালবাড়ীর রাজনীতি যা পরবর্তীতে মাওপন্থী নকশাল রাজনীতির জন্ম দেয়। এ সময়েই গড়ে ওঠে ‘মাওপন্থী কমিউনিস্টদের সর্বভারতীয় কেন্দ্র’ AICCCR, এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে সালে গঠিত হয় ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’ বা C.P.I. (M-L)

এর পরের ইতিহাস খুব দ্রুতই চারু মজুমদারের রচিত ঐতিহাসিক ৮ দলিলের ভিত্তিতে নির্মাণ হতে থাকে। একের পর এক সংগ্রামী অঞ্চল গড়ে উঠতে থাকে।

পার্টি গঠনের পর কলকাতায় প্রকাশ্যে মিছিল করার কথা সিএমই বলেছিলেন, ‘শত্রুর নজর এড়িয়ে রাজনীতিকে আমরা কিভাবে জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে পারি মিছিলের তাই উদ্দেশ্য।’এ নিয়ে এরপর সরোজ দত্ত লিখলেন। সিএম বলেছিলেন, ‘দীর্ঘদিনের কোনো অন্যায়কে ন্যায়ে পরিণত করতে হলে হয়ত অনেক সময় একটু বেশিই বাঁ- দিকে চলে যাওয়া যায়। তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ এটাই ইতিহাসের নিয়ম। আর একটা জিনিস মনে হয় আত্মত্যাগের ব্যাপার। যেটা কমিউনিস্টদের অবশ্যই বড় গুণ। বোকাবুড়োর পাহাড় সরানো, আটটি ধারা ও তিনটি বৃহৎ শৃংঙ্খলার উল্লেখ এবং নিজের মধ্যে সংগ্রাম করে আত্মস্বার্থ বিসর্জন দেওয়া শোধনবাদী বুর্জেয়াদের কাছে নেহাৎই ‘বোকামো’ ও ‘ছেলেমানুষী’।

পার্টি গঠনের পর পার্টি মুখপত্র ‘দেশব্রতী’তে সে সময়কার প্রকাশিত বিবৃতিঃ

“বিপ্লবী পার্টি গড়ার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলা। এ কাজে হাত না দেওয়া পর্যন্ত বিপ্লব শুধু মুখে স্বীকার করা হোল। সুতরাং চেয়ারম্যানের ভাষায় তাঁরা হলেন কথায় বিপ্লবী (revolutionary in words)। আমাদের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে কাজে বিপ্লবীদের (revolutionary in deeds) দ্বারা।
তাই পার্টির ভেতরে যে বিপ্লবী শক্তি আছে তার উপর ভরসা করলে আমরা বিপ্লবী পার্টির বাইরে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী নওজোয়ানদের প্রতি। তবেই সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের বিপ্লবের ঘাঁটি আমরা তৈরী করতে পারবো।
কমরেডস, আমাদের দায়িত্ব অনেক। নকশালবাড়ীর ছোট্ট স্ফূলিঙ্গ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ণ এশিয়ার সংগ্রামী জনগণকে উৎসাহিত করে, উৎসাহিত করে বিশ্ব বিপ্লবের নেতা মহান চীন পার্টির নেতাদের, উৎসাহিত করে পৃথিবীর সমস্ত দেশের বিপ্লবী জনতাকে। এক পবিত্রতম আন্তর্জাতিক দায়ীত্ব আমাদের মাথায় এবং আমরা এই দায়ীত্ব পালন করবোই। মূল্য দিতে হবে অনেক, কিন্তু মূল্য দিতে ভয় পায় না বিপ্লবীরা চেয়ারম্যানের শিক্ষা: আমাদের লড়বার হিম্মত রাখতে হবে-জেতবার হিম্মত রাখতে হবে (We must dare to fight and dare to win)।“

পৃথিবীর এযাবতকালের লিখিত ইতিহাসে আর কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। আর কখনও এমন কৃষক অভ্যুত্থান বিস্ফোরিত হয়নি। আর কখনও সেই কৃষক আন্দোলনের দেখানো পথে মার্কসবাদী-লেনিনবাদ বিপ্লবের অগ্নিস্ফূরণ ঘটেনি। আর কখনও এভাবে শহুরে প্রিভিলেজড ক্লাস ডি-ক্লাসড হয়ে গ্রামে গিয়ে কৃষকের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেনি। এভাবে ইতিহাসের হাত ধরে এগুতে থাকলে দেখা যাবে পৃথিবীর ইতিহাসের অনেক নতুন উপাদান এই নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান বা ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ থেকে জন্ম নিয়েছে। ভারতবর্ষ তো বটেই, এই গোটা অঞ্চলেই সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লব-বিদ্রোহে তাই এই ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান এক আলোকবর্তিকা। এক মাইলফলক।

নকশালবাড়ির পর দেশের কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকেনি। ইতিহাসবোধ, জাতি রাষ্ট্রের অবধারণা, বিজ্ঞানচেতনা ও নৈতিকতার নতুন দৃষ্টিকোণ নতুন প্রজন্মকে মাথা উঁচু করে, যৌবনের ঔদ্ধত্যকে সম্মান জানিয়ে প্রশ্ন করতে শিখিয়ে দিয়েছিল। সমাজের নিম্নবর্গের খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামকে অসম্ভব শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার চোখে দেখা, বোঝা ও পাল্টে দেওয়ার অন্য নাম হয়ে উঠেছিল নকশালবাড়ি। সংসদীয় গণতন্ত্রের মেকি ভড়ংকে নস্যাৎ করে মানুষের বুকের ব্যথা আর মুখর অভিব্যক্তির রাজনীতির নাম নকশালবাড়ি। হাজার বছরের নিপীড়িত কৃষক প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল। নেংটি পরা কৃষক অনুভব করেছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসতে হলে জান বাজী লড়তে হবে। তারা লড়েছিলও। আজও চলছে সে লড়াই।

এবারকার ‘নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান দিবস’ পালনের প্রতিজ্ঞা হোক; নির্বাচনপন্থী, আধা নির্বাচনপন্থী, অভ্যুত্থানবাদী ফ্যাশনবাজ সংশোধনবাদীদের মুখোস খুলে দেয়া। ‘নকশালবাড়ী রাজনীতির সমর্থক’, ‘আমরাও চারু মজুমদারপন্থী’, ‘আমরা চারু মজুমদারপন্থী, তবে সেটা প্রকাশ্যে বলি না’ গোছের রঙবেরঙের মেকি নকশালপন্থীদের মুখোস খুলে নাঙ্গা করে জনগণের কাছে প্রকৃত নকশাবাড়ী রাজনীতির নির্যাস তুলে ধরা। নকশালবাড়ি সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থানের প্রকৃত শিক্ষা এবং এর তাৎপর্য তুলে ধরা এবং তারই আলোকে এই অঞ্চলের সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির দিকনির্দেশ অনুযায়ী বিপ্লবের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলা।
…………………………………………………………..
ছবিঃ পার্টি গঠনের পর বক্তব্যরত কমরেড চারু মজুমদার ও নেতৃবৃন্দ।

মনজুরুল হক
২৫ মে, ২০২০

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s